Published : 17 Oct 2025, 12:40 PM
এতদিন ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের শুধু প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল; এবার তার সঙ্গে যুক্ত হল ক্ষমতাও।
প্রায় তিন যুগ পর অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসুর ভোটে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে ছাত্রশিবির। ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি, এজিএসসহ ২০টি পদে জয় পেয়েছেন শিবির সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা।
এর মধ্য দিয়ে ডাকসু, জাকসু ও চাকসুর জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনটি।
আগের তিন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মত রাজশাহীতেও শিবিরের সঙ্গে তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ক্রীড়া সম্পাদক ছাড়া আর কোনো পদে তারা জয়ের মুখ দেখেনি।
এছাড়া জিএস পদে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
বড় ধরনের গোলযোগ ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাকসু, হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন হয়। প্রায় ২৯ হাজার ভোটারের মধ্যে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর ভোট পড়ার কথা নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার পর ভোট গণনা শুরু হয়। সব প্রক্রিয়া শেষ রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন।
ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ।
তিনি পেয়েছেন ১২ হাজার ৬৮৭ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের শেখ নূর উদ্দীন আবীর পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৯৭ ভোট।
১১ হাজার ৫৩৭ ভোট পেয়ে জিএস নির্বাচিত হয়েছেন ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেলের সালাহউদ্দিন আম্মার। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজার ভোট ৫ হাজার ৭২৯।
এজিএস পদে শিবিরের এস এম সালমান সাব্বির ৬ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের জাহিন বিশ্বাস এষা পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৪১ ভোট।

শিবিরের নির্বাচিত ২০ জন হলেন—
ভিপি: মোস্তাকুর রহমান জাহিদ
এজিএস: এস এম সালমান সাব্বির
সহক্রীড়া সম্পাদক: আবু সাঈদ মুহাম্মদ নুন
সংস্কৃতি সম্পাদক: জায়িদ হাসান জোহা
সহসংস্কৃতি সম্পাদক: মো. রাকিবুল ইসলাম
মহিলা বিষয়ক সম্পাদক: সাইয়িদা হাফছা
সহমহিলা সম্পাদক: সামিয়া জাহান
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক: বি এম নাজমুছ সাকিব
সহতথ্য ও গবেষণা সম্পাদক: সিফাত আবু সালেহ
মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক: মো. মুজাহিদ ইসলাম
সহমিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক: আসাদুল্লাহ
সহবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক: মুজাহিদুল ইসলাম সাঈম
বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক: ইমরান মিয়া লস্কর
সহবিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক: মো. নয়ন হোসেন
পরিবেশ ও সমাজসেবা সম্পাদক: আব্দুল্লাহ আল মাসুদ
সহপরিবেশ ও সমাজসেবা সম্পাদক: মাসুমা ইসরাত মুমু
বাকি তিনটি পদের মধ্যে জিএস নির্বাচিত হয়েছেন ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেলের সালাহউদ্দিন আম্মার, যিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আলোচিত সমন্বয়ক ছিলেন।
ক্রীড়া সম্পাদক পদে নার্গিস খাতুন জয় পেয়েছেন ছাত্রদলের প্যানেল থেকে।
এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ তোফা। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্স ক্লাবের সহ-সভাপতি।

‘সবাইকে নিয়ে’ কাজ করার আশ্বাস
নির্বাচনে জয় লাভের পর রাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি জাহিদ বলেছেন, তিনি সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চান। যারা পরাজিত হয়েছেন, তাদের পরামর্শও নেবেন তিনি।
রাকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন তিনি।
জাহিদ বলেন, "যারা বিজয়ী হয়েছেন, তাদের এই বিজয় নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী উদযাপন করা এবং শিক্ষার্থীদের 'ম্যান্ডেড' অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানাই।
"নির্বাচনে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক। আমরা সবাই মিলে এই ক্যাম্পাসকে গড়ে তুলব।"

নবনির্বাচিত জিএস আম্মার বলেন, “শিক্ষার্থীরা আমাকে নির্বাচিত করেছে, তারা মনে করেছে আমি তাদের জন্য কাজ করতে পারব। এজন্য শিক্ষার্থীদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের যে ভাই-বোনের বিভিন্ন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে সরব ছিলেন- তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।"
ক্যাম্পাসে 'কোনো শত্রু নাই' মন্তব্য করে আম্মার বলেন, "সবাই আমাদের সহযোদ্ধা। সবাইকে নিয়ে স্বপ্নের ক্যাম্পাস গড়ব। আমাদের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সবাই একসঙ্গে কাজ করব।"
নিজের এই বিজয় আম্মার উৎসর্গ করেছেন ‘আধিপত্যবিরোধী’ লড়াইয়ে থাকা সবাইকে।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের নির্যাতিতদের আমি এই বিজয় উৎসর্গ করছি। একই সাথে আমার বাবাকে, যিনি নির্যাতিত হয়ে কারাবরণ করেছেন। আমার মাকে, যিনি আমার আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় পাশে থেকেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন।"

মতিহারের রাজনীতি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত বামপন্থি ছাত্রসংগনগুলোর ব্যাপক প্রভাব ছিল ক্যাম্পাজুড়ে।
রাকসুর ইতিহাস বলছে, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রীর মত সংগঠনের নেতারা সেখানে শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আশির দশক পর্যন্ত বামপন্থিদের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে সেখানে রাজনীতি করেছে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগও। বরং সেই তুলনায় তখন পিছিয়ে ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। নব্বইয়ের দশকে শেষ নির্বাচনে তারা গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে জয় পেয়েছিল।
আর ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রভাব তখন শুরু হলেও তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। ক্ষমতার স্বাদ কখনও পাননি।
কিন্তু এই ২০২৫ সালের শেষে এসে পরিস্থিতি প্রায় পুরোটাই পাল্টে গেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই বামপন্থিদের সাংগঠনিক শক্তিতে ক্ষয় ধরেছে; তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা বহু ভাগে বিভাজিত হয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনে তাদের সরব উপস্থিতি থাকলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষার পথ ধরে তাদের হাঁটা এখন অনেকটা কঠিনই ছিল।
আর ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর ‘প্রতাপশালী’ ছাত্রলীগ তো ক্যাম্পাস ছেড়েই পালিয়েছে। ফলে এই নির্বাচনে তাদের প্রসঙ্গিকতাও নেই।
ফলে এবার নির্বাচনে যে এগারটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তার মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যেই দলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ভেবেছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে ভোটের হিসাবে দুই সংগঠনের ব্যাবধান স্পষ্ট।
|
রাকসুর নেতৃত্বে ছিলেন যারা |
||
|
১. ভিপি: মুহা. মনিরুজ্জামান মিয়া জিএস: আবদুর রাজ্জাক খান |
১৯৫৬-৫৭ |
ছাত্র ইউনিয়ন |
|
২. আবুল কালাম চৌধুরী আব্দুল জব্বার খান |
১৯৫৭-৫৮ |
ছাত্র ইউনিয়ন |
|
৩. শেখ মুহা. রুস্তম আলী মুহা. বজলুল করিম |
১৯৬২-৬৩ |
অগ্রগামী |
|
৪. সৈয়দ মযহারুল হক বাকী মুহা. আব্দুর রউফ |
১৯৬৩-৬৪ |
ছাত্রলীগ |
|
৫. মুহা. আব্দুর রাজ্জাক বায়েজিদ আহমেদ |
১৯৬৪-৬৫ |
ছাত্র ইউনিয়ন |
|
৬. আবু সাইদ সরদার আমজাদ হোসেন |
১৯৬৫-৬৬ |
ছাত্রলীগ |
|
৭. বায়েজিদ আহমেদ আব্দুস সাত্তার |
১৯৬৬-৬৭ |
ছাত্র ইউনিয়ন |
|
৮. এ এফ এম জামিরুল ইসলাম মুহা. আব্দুর রহমান |
১৯৬৭-৬৮ |
ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ |
|
৯. মুহা. আবদুর রহমান জালাল উদ্দিন সেলিম |
১৯৬৮-৬৯ |
ছাত্রলীগ |
|
১০. মীর শওকত আলী আব্দুস সামাদ |
১৯৬৯-৭০ |
ছাত্রলীগ |
|
১১. মুহা. হায়দার আলী আহম্মদ হোসেন |
১৯৭২-৭৩ |
ছাত্র ইউনিয়ন |
|
১২. নুরুল ইসলাম ঠান্ডু শামসুল হক টুকু |
১৯৭৩-৭৪ |
ছাত্রলীগ |
|
১৩. ফজলুর রহমান পটল রফিকুল ইসলাম |
১৯৭৪-৭৫ |
ছাত্রলীগ ছাত্রলীগ (জাসদ) |
|
১৪. ফজলে হোসেন বাদশা জাহাঙ্গীর কবির রানা |
১৯৮০-৮১ |
ছাত্র মৈত্রী ছাত্রলীগ |
|
১৫. রাগীব আহসান মুন্না রুহুল কুদ্দুস বাবু |
১৯৮৮-৮৯ |
ছাত্র মৈত্রী ছাত্রলীগ (জাসদ) |
|
১৬. রিজভী আহমেদ রুহুল কুদ্দুস বাবু |
১৯৮৯-৯০ |
ছাত্রদল ছাত্রলীগ (জাসদ) |

ভোট-নির্ঘণ্ট
১৯৭৩ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুসারে, প্রতি বছর রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ৭২ বছরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে মোটেই ১৬ বার।
এর মধ্যে প্রথম দুইবার ভোট হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন (রাসু) নামে; বাকি ১৪ বার হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নামে।
এখন পর্যন্ত যে ১৬ বার ছাত্র সংসদ গঠন হয়েছে, তার মধ্যে ১০ বারই হয়েছে পাকিস্তান আমলে। স্বাধীন দেশে ৫৫ বছরে সপ্তমবারের মত ভোট দিয়েছেন মতিহারের শিক্ষার্থীরা।
মোট ভোটার ছিলেন ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১১ হাজার ৩০৫। আর পুরুষ ভোটার ১৭ হাজার ৫৯৬ জন।
রাকসুর ২৩টি পদে মোট প্রার্থী ছিলেন ২৪৭। এছাড়া হল সংসদ এবং সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনও হয়েছে একই দিনে।
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা দিয়েছেন সাবিকুন্নাহার লিপি, মুবদিউর রহমান মুমু এবং আলোকচিত্রী মাহমুদ জামান অভি]
পুরনো খবর