Published : 21 Jun 2023, 08:00 AM
সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নতুন জনপ্রতিনিধি বেছে নিতে ভোট দিচ্ছেন দুই নগরীর আট লাখ ৩৮ হাজারের বেশি ভোটার; জাতীয় নির্বাচনের ছয় মাস আগে এ নির্বাচনে সবার নজর ভোটের হারের দিকে।
আগের তিনটির মত এ দুই সিটি নির্বাচনেও ভোট হচ্ছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-এভিএমে। এবারও কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটের পরিস্থিতি সিসি ক্যামেরায় ঢাকা থেকে সরাসরি দেখছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, দুই নগরের ৩৪৫টি কেন্দ্রে বুধবার সকাল ৮টায় নির্ধারিত সময়েই ভোট শুরু হয়েছে, যা একটানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে।
মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদ মিলিয়ে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন সোয়া পাঁচশ প্রার্থী।
শুরুতে ভোটের লড়াইয়ে থাকা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করেছেন; আর জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন। বিএনপি না থাকায় নিরুত্তাপ ভোটে ক্ষমতাসীন দলের নৌকার প্রার্থীদের এগিয়ে যাওয়াটা শুধু আনুষ্ঠনিকতার মত।
ফলে ভরা বর্ষার মধ্যে এ নির্বাচনে ভোটারদের কেন্দ্রে নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর নির্বাচন কমিশন আশা করছে, মেয়র পদে জয়-পরাজয় নিয়ে ভোটারের তেমন আগ্রহ না থাকলেও কাউন্সিলর পদ ঘিরে কেন্দ্রে যাবেন ভোটাররা।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, “বড় একটি দল না থাকায় এবং ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হওয়ায় পাশাপাশি অনেকের অনীহা ছিল ভোটে। গাজীপুর, খুলনা, বরিশালেও ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূক কম। রাজশাহী ও সিলেট নির্বাচনেও হয়ত একই দৃশ্য থাকবে।
“নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে। সংসদের আগে এখন ইসির কাছে প্রতিটি নির্বাচনই চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকারেরর ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার পাশাপাশি তা পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলকও হয়নি। রাজশাহী ও সিলেটে একইভাবে ভালো নির্বাচন হলেও সংসদ নির্বাচনের দিকে নজর থাকছে সবার। অংশগ্রহণমূলক হলেই ভোটার উপস্থিতি বাড়বে এবং বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।”
সবশেষ তিন নির্বাচনে সিলেটে ২০১৮ সালে ৬৩%; ২০১৩ সালে ৬২% এবং ২০০৮ সালে ৭৫% ভোট পড়ে।
রাজশাহীতে ২০১৮ সালে ৭৮.৮৬%; ২০১৩ সালে ৭৬.০৯ % এবং ২০০৮ সালে ৮১.৬১% ভোট পড়ে।
পুরানো খবর:
সিলেট ও রাজশাহী: যেভাবে ভোট দেবেন ইভিএমেপুরানো খবর:
এক নজরে সিলেট ও রাজশাহী সিটি ভোট
আবুল মাল আব্দুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্স থেকে কেন্দ্রগুলোর দায়িত্বপাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে নির্বাচনী সরঞ্জাম বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
ভোট বর্জন নিয়ে মাথা ব্যথা নেই নির্বাচন কমিশনের। কমিশনের কথা, ব্যালটে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকছে। ভোটের পরিবেশ নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ রাখার পাশাপাশি অনিয়ম, গোলযোগ ঠেকাতে বরাবরের মতই আশ্বস্ত করছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান বলেন, “আমরা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করেছি এবং নির্বাচনের প্রচারে অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা করলে কোনো ধরনের ছাড় দিইনি।… আমাদের কাছে সব প্রার্থী সমান, সব দলও সমান। ভোটারদের নির্বিঘ্ন পরিবেশ তৈরিতে আমরা বদ্ধপরিকর। সকল অংশীজনের সক্রিয় এবং আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।”
তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমের কথা মাথায় রেখে ব্যাটারি, চার্জার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিতেও যেন ত্রুটি না থাকে সে বিষয়ে কারিগরি দল সক্রিয় রয়েছে।
“আচরণবিধি প্রতিপালনে স্থানীয়ভাবে বেশ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখে সিলেটে একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করা হয়েছে। আমরা সরাসরি সিসি ক্যামেরায় এ নির্বাচন ঢাকা থেকে পর্যবেক্ষণ করব। নির্বাচন পূর্ব, ভোটের দিন ও নির্বাচনোত্তর অনিয়ম, গোলযোগ ও সহিংসতা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
সিলেটে প্রার্থী যারা
মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী (আওয়ামী লীগ, নৌকা)
নজরুল ইসলাম বাবুল (জাতীয় পার্টি, লাঙ্গল)
মাহমুদুল হাসান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, হাতপাখা)
মো. জহিরুল আলম (জাকের পার্টি, গোলাপ ফুল)
মোহাম্মদ আবদুল হানিফ কুটু (স্বতন্ত্র, ঘোড়া)
মো. ছালাহ উদ্দিন রিমন (স্বতন্ত্র, ক্রিকেট ব্যাট)
মো. শাহ জাহান মিয়া (স্বতন্ত্র, বাস)
মোশতাক আহমেদ রউফ মোস্তফা (স্বতন্ত্র, হরিণ)
>> পদ: মেয়র একজন, ৪২ জন সাধারণ কাউন্সিলর, ১৪ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর
>> ভোটার: ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৩ জন।
>> ভোটকেন্দ্র: ১৯০টি, ভোটকক্ষ: ১ হাজার ৩৬৭টি।
>> রিটার্নিং অফিসার: সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের।
সিলেট
ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের বাধা সৃষ্টির জন্য ঢাকা থেকে প্রচুর লোক সিলেটে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মেয়র পদপ্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল।
ভোটের আগে তিনি বলেন, “তাদের সরকারি ও এমসি কলেজের হোস্টেলে রাখা হয়েছে। সিলেটের মানুষজন ভোটকেন্দ্রে আসতে চাচ্ছেন। তবে তারা চিন্তা করছেন, ভোট লাঙ্গলে দিলে শেষ পর্যন্ত যদি নৌকায় চলে যায়।”
নির্বাচনের দিন সহিংসতার আশঙ্কা করে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন লাঙ্গলের এ প্রার্থী।
“আমার আশঙ্কা, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বানচাল করার জন্য প্রতিপক্ষ এ ধরনের সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে আসছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সিলেট এমসি কলেজ ও সরকারি ডিগ্রি কলেজের ছাত্রাবাসে ২০ জুন থেকে ২২ জুন পর্যন্ত বন্ধ রাখা প্রয়োজন।”
আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী প্রচারের শেষ সময়েও কেন্দ্রে ভোটার টানতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
“প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও আধুনিক ও স্মার্ট নগরী গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সবাই নির্ধারিত সময়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং নৌকায় রায় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন তৎপরতার প্রতি আপনাদের সমর্থন জানাবেন বলেই আমাদের প্রত্যাশা।”
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৯০টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২ কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) সুদীপ দাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কেন্দ্রে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকা, কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে সহিংসতার শঙ্কা, যোগাযোগ বিড়ম্বিত কেন্দ্র, কেন্দ্রে গোলযোগের আশঙ্কাসহ নানা দিক বিবেচনা করে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাজশাহীতে প্রার্থী যারা
এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন (আওয়ামী লীগ, নৌকা)
মো. সাইফুল ইসলাম স্বপন (জাতীয় পার্টি, লাঙ্গল)
মো. মুরশিদ আলম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, হাতপাখা)
মো. লতিফ আনোয়ার (জাকের পার্টি, গোলাপ ফুল)
পদ: মেয়র একজন, ৩০ জন সাধারণ কাউন্সিলর, ১০ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর
ভোটার: ৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ জন।
ভোটকেন্দ্র: ১৫৫টি, ভোটকক্ষ: ১ হাজার ১৫৩টি।
রিটারিং অফিসার: রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন।
রাজশাহী
ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় তুলনামুলক ‘ভালো’ ভোটার উপস্থিতির আশা কম। তারপরও ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নৌকার প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।
তিনি বলেন, “কোনো রকম ভয়-ভীতি ছাড়াই আপনারা ভোট কেন্দ্রে আসুন। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রদান করবেন।… আমি মনে করি কেউ যদি নির্বাচনে অন্য কিছু করার চিন্তা করেন তাহলে তারা সফল হবে না। নির্বাচনের সুন্দর পরিবেশের ব্যত্যয় ঘটানোর অপচেষ্টা করলে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবেন। প্রয়োজনে আমাদের নেতাকর্মীরা জনগণকে নিয়ে তাদের প্রতিহত করবে।”
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, “ইভিএমে ভোট করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। ভোটের রেজাল্ট হয়েই আছে। ২১ জুন ভোটে কী ফলাফল হবে, তা এখন বলে দেওয়া যায়।”
সাইফুল ইসলাম স্বপন জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এবং রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক। এমনিতেই তার প্রচার অন্য প্রার্থীদের চেয়ে কম ছিল। এ ছাড়া দলীয় বিভেদের কারণে সব কর্মীকেও তিনি এই নির্বাচনে পাননি।
লাঙ্গল প্রতীকের এই প্রার্থী সাংবাদিকদের বলেন, “ভোট করে লাভ হবে না। কেন্দ্রের কাছে অনুমতি চেয়েছি। অনুমতি পেলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াব।”
রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, রাজশাহীতে ১৫৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৮টিই ঝুঁকিপূর্ণ। নাশকতার চেষ্টা করলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।“
বৃষ্টিরও বাগড়া থাকতে পারে
ভোটের দিন সিলেট ও রাজশাহী সিটিতে বৃষ্টির বাগড়া থাকতে পারে।
টানা কয়েকদিন ধরে তাপপ্রবাহের পর রাজশাহীতে সোমবার রাতে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবারও দিনভর মেঘলা আকাশ, অস্বস্তিকর গরম বিরাজ করছে। সিলেটে টানা কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি চলছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভরা বর্ষার এ সময়ে ভোটের দিন দুই সিটিতে এক পশলা বৃষ্টি হতে পারে। তবে বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনে ভোটারদের বেশি দুর্ভোগে পড়ার শঙ্কা তেমন নেই।
আবহাওয়াবিদ কামরুল হাসান বলেন, “বুধবার সিলেট সিটি এলাকায় সকাল থেকে বিকালে থেমে থেমে বৃষ্টি থাকতে পারে। গত কয়েকদিন ধরে বেশি বৃষ্টি হয়েছে, বুধবার সে তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে, একটানা বৃষ্টি থাকবে না। ভোটারদের দুর্ভোগে পড়তে হয় এমন একটানা বৃষ্টি হয়ত থাকবে না।”
রাজশাহী সিটি এলাকায় সকালে ও বিকালে বৃষ্টি না হলেও দুপুরে এক পশলা বৃ্ষ্টির আভাস রয়েছে।
পুরনো খবর