তিস্তা বিপদসীমার উপর, শতশত ঘরবাড়ি বিলীন
ভারী বৃষ্টি আর উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
প্লাবনে নীলফামারীর দুই উপজেলার হাজার হাজার বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে কয়েকশ পরিবারের ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা।
ডালিয়া পয়েন্টে রোববার তিস্তা নদী বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার নয় ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রাম। এসব এলাকার ১০ সহস্রাধিক বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতশত ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেতু, কালভার্ট ও রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আফতাব উদ্দিন সরকার ও জেলা প্রশাসক মো. জাকীর হোসেন ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর জানান, নদীর উজানে ভারতে টানা ভারী বর্ষণ অবাহ্যত থাকায় রোববার ভোরে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর উঠেছিল। পরে ৭ সেন্টিমিটিার কমে ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এর আগে গত ২২ জুন তিস্তা বিপদসীমার ৩০ সেণ্টিমিটার এবং ২৫ জুন ২০ সেণ্টিমিটার উপর উঠেছিল বলে জানান তিনি।
পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান বলেন, শনিবার রাত থেকে নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। রোববার সকাল ৭টার দিকে ইউনিয়নের চরগ্রাম ঝাড়সিংগেশ্বর, পশ্চিম ছাতনাই, বারোবিশা গ্রামে পানি ঢোকে।
এতে ওই তিন গ্রামের অন্তত এক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে বলে তিনি জানান।
খগাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, কিসামত ছাতনাই ও দোহলপাড়া গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, ছাতুনামা ও ফরেস্টের চরের প্রায় সাত শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারের অধিকাংশ বাড়ি হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
খালিশা চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, পশ্চিম বাইশপুকুর, পূর্ব বাইশপুকুর, সতিঘাট ও ছোটখাতা গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবারের বাড়িতে পানি উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তার ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চারটি ওয়ার্ড।
নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়া আর স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বালুর বাঁধ ধসে পড়ায় ইউনিয়নের ১, ২, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে।
স্থানীয়রা জানান, এই চারটি ওয়ার্ডের চরখড়িবাড়ি, পূর্বখড়িবাড়ি, টাপুরচর, ঝিঞ্জিরপাড়া ও মেহেরটারী, একতার বাজার গ্রামে প্রায় একমাস ধরে চলছে নদী ভাঙন।
টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন বলেন, এখন পর্যন্ত ইউনিয়নের ২৮১টি পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এছাড়া চরখড়িবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবনের অর্ধেক করে, চারটি ছোট বড় সেতু, টেপাখড়িবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের আধাপাকা ভবনও নদীর ভাঙনে তলিয়ে গেছে বলে তিনি জানান।
“দুই বছর আগে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়। বর্তমানে ইউনিয়নের চড়খড়িবাড়ি গ্রামে উপড় দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছে।”
গত বছর ওই গ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে এক হাজার মিটার একটি বালুর বাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু চলতি বছরের ২২ জুন নদীর পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপড় দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর সেই বাঁধটি ধসে গেছে বলে জানান চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম।
তিনি জানান, বাঁধটি বিধ্বস্ত হওয়ায় মাসখানের থেকে এই চারটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে। একমাসে চারটি ওয়ার্ডের ২৮১টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
“ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে চারটি ওয়ার্ডের চার শতাধিক পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখনও এক হাজার আটশ পরিবার পানিবন্দি হয়ে রয়েছে।”
এদিকে ওইস্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৩৪০ মিটার দীর্ঘ একটি বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে দুই হাজার মিটারের বাঁধ প্রয়োজন সেখানে এই ছোট বাঁধ কোনো কাজে আসবে না।
টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ি গ্রামের দুই হাজার মিটার বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আবেদন করেছেন।
বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চরখড়িবাড়ি গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৪০ মিটার স্থায়ী একটি বাঁধ নির্মাণের দরপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।
ডিমলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তা নাঈমা তাবাসুম হক জানান, এ পর্যন্ত মোট ২৮১ জন ক্ষতিগ্রস্তর তালিকা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ এলে বিতরণ করা হবে।
এর আগে ভাঙন কবলিত এলাকায় সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্বতদের মাঝে ১২ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৩৬ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
সংসদ সদস্য তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে শাড়ি, লুঙ্গি ও টাকা বিতরণ করেছেন বলেও তিনি জানান।
জেলা প্রশাসক মো. জাকীর হোসন বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ত্রাণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবাসহ সকল সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা হয়েছে।
নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নে চরখড়িবাড়ি গ্রামের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বালির বাঁধটি ভেঙে ব্যপক ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি ম্বীকার করেন।
