Published : 06 Nov 2025, 01:51 AM
বলা হয়, সুন্দরী গাছের আধিক্যের কারণেই পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যটি ‘সুন্দরবন’ নামে পরিচিত পেয়েছে। কিন্তু বনের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি এক ধরনের ‘পরগাছা’র অস্বাভাবিক বিস্তারে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সেই সুন্দরী গাছ।
বনজীবী ও বন কর্মকর্তারা বলছেন, আগে থেকেই সুন্দরী গাছের ‘আগা মরা’ রোগ আছে। সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ায় চারা না টেকায় বনে নতুন গাছও জন্মাছে কম। তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে লতা-জাতীয় একশ্রেণির ‘পরগাছা’র অস্বাভাবিক উপদ্রবে সুন্দরী গাছের অস্তিত্ব চরম হুমকিতে পড়েছে।
বনবিভাগ বলছে, এই পরজীবী ধীরে ধীরে সুন্দরী গাছের শ্বাসরোধ করছে। এরা মূল গাছের রস শোষণ করে বাঁচে। ফলে ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়; পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যায় এবং এক পর্যায়ে গাছ মরে দাঁড়িয়ে থাকে।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, পূর্ব বনবিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছ, বিশেষ করে বয়স্ক গাছে পরগাছা বাসা বেঁধেছে।
“আগে শাখা-প্রশাখায় সীমাবদ্ধ থাকা পরগাছা এখন গাছের মূল অংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে গাছ দুর্বল হয়ে একসময় শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।”
তবে এ নিয়ে কোনো গবেষণা না থাকায় কীভাবে সুন্দরী গাছ বাঁচানো যাবে, তা বলতে পারছে না বনবিভাগ। বিষয়টি এখন বন কর্মকর্তাসহ সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট সবার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সুন্দরবনে ভেষজ, গুল্ম, লতা, ফার্নসহ বিভিন্ন প্রজাতির পরগাছা আছে, যা তারা শনাক্ত করেছেন। তবে ঠিক কোন কোন পরগাছা সুন্দরী গাছের ক্ষতির কারণ তা এখনো শনাক্ত হয়নি।

বঙ্গোপসাগরের প্রান্ত ছুঁয়ে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় অবস্থিত।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ শ্বাসমূলীয় বনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ৫১৭ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো বনের ৬৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে এ বনে বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, ঘাস ও পরগাছাসহ ১৮৪ প্রজাতির উদ্ভিদ চিহ্নিত হয়েছে।
বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন। আর সবচেয়ে বেশি সুন্দরীগাছ আছে বনের পূর্বাঞ্চলে।
সুন্দরবন ঘেরা খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের তেঁতুলতলার চর এলাকার বাসিন্দা ইসলাম সানা বলেন, ৪০ বছর ধরে সুন্দরবন ঘিরে জীবিকা তার। তবে সম্প্রতি সুন্দরবনের বেশ কিছু পরিবর্তন তার চোখে পড়ছে।
“পাঁচ-ছয় বছর আগেও যেখানে সুন্দরীগাছের ঘন জঙ্গল ছিল, এখন সেসব জায়গা প্রায় ফাঁকা। বহু সুন্দরী গাছ শুকিয়ে গেছে।”
বাগেরহাটের শরণখোলার বাসিন্দা শাহজাহান আকন বলেন, “৩০-৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করছি। আগে বনের যেসব জায়গায় ঘন জঙ্গল দেখতাম, সেসব জায়গা এখন ফাঁকা।
“মে মাসের শুরুতেই ফুল আসে সুন্দরী গাছে। তখন সুন্দরীর ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় গোটা সুন্দরবন। কিন্তু বনের অনেক সুন্দরী গাছ শুকিয়ে গেছে, মৌমাছিও সেসব জায়গায় চাক বানাচ্ছে না।”
বনজীবীরা বলছেন, মাটির ক্ষয়রোধ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূল রক্ষা এবং প্রাণীর প্রজননে সুন্দরী গাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরীর শেকড়ে আশ্রয় নেয় ছোট মাছ ও চিংড়ি, গাছে বাসা বাঁধে পাখি, আর এ গাছের আড়ালেই বাঁচে বনের হরিণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

লবণাক্ততায় বাড়ছে রোগ-বালাই
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, আগে থেকেই সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের ‘আগা মরা’ রোগ আছে। তবে লবণাক্ততা বাড়ায় সুন্দরী গাছের ‘আগা মরা’ রোগ ও পরগাছার উপদ্রব বেড়েছে।
“যেসব সুন্দরী গাছ এর মধ্যে ‘আগা মরা’ রোগে আক্রান্ত, তাদের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়েই পরগাছা ছড়িয়ে পড়ছে। যেখানে লবণাক্ততা বেশি, কিংবা জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল কম; এমন প্রতিকূল পরিবেশে গাছগুলো সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে।”
অধ্যাপক ওয়াসিউল বলেন, “সাধারণত শীত মৌসুমে এসব পরগাছা ফুল ও ফল দেয়। তার আগে এদের সরিয়ে ফেলতে পারলে বংশবিস্তার রোধ করা সম্ভব। পাখিরা এদের বীজ এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছড়িয়ে দেয়।”
এ শিক্ষক সতর্ক করে বলেন, সুন্দরীসহ ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কমে গেলে পুরো সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম নাহিদ বলেন, “সমন্বিত প্রভাবেই সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের রোগ বাড়ছে। রোগের কারণ বিশ্লেষণে গবেষণাও চলছে।
বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বনের অধিক লবণাক্ত এলাকায় বয়স্ক সুন্দরী গাছের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। সেইসঙ্গে কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরী, পশুরসহ কয়েকটি গাছের চারা গজানোর হার কমেছে। অন্যদিকে বনের লবণাক্ত স্থান ভেদে গেওয়া, বলা গাছ নামে স্থানীয়ভাবে পরিচিত বৃক্ষ বাড়ছে।

গবেষকরা বলছেন, সাধারণভাবে উপকূলীয় এলাকার নদীতে লবণাক্ততা থাকার কথা দুই থেকে পাঁচ পিপিটি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমায় অনেক আগে থেকেই সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার সেই মাত্রা ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পলিমাটি।
পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ায় চারা না টেকায় বনে নতুন গাছও জন্মাছে কম। আবার সুন্দরীগাছের উচ্চতা বেশি এবং ডালপালা কম হওয়ায় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সুন্দরবনে গাছের পরিমাণ এবং বনের ঘনত্ব কমছে।
লবণাক্ততা ও বনের নদী-খালের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় গাছ পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে গাছ ছোট ও রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। একপর্যায়ে দুর্বল গাছে পরগাছা জন্ম নিচ্ছে এবং দ্রুত গাছের মৃত্যু ঘটছে।
লবণপানির আগ্রাসন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মিঠাপানির বাদাবন তার বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। বাড়ছে লবণপানির আগ্রাসন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বনের মধ্যে জোয়ারের লবণাক্ত পানির চাপ বেড়েছে। সেই সঙ্গে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে গেছে।
“এর ফলে বনের মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। এর প্রভাবে বনের গাছের রোগ-বালাই বাড়ছে। শুকিয়ে গাছ মারা যাচ্ছে। এতে গাছের পরিমাণ এবং বনের ঘনত্ব কমছে।”
অধ্যাপক হারুন বলেন, সুন্দরবনের গাছের রোগ-বালাইয়ের কারণ, বর্তমান অবস্থা এবং প্রতিকারের উপায় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “সুন্দরী গাছ মূলত মিঠা ও ঈষৎ লবণপানিতে ভালোভাবে বাঁচতে পারে। কিন্তু উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে আসায় সুন্দরবনের সামগ্রিক লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। বিশেষ করে বনের সাতক্ষীরা ও খুলনা অংশে।”
সুন্দরবন অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, একই সঙ্গে বন, জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয়ে প্রাকৃতিক বন-সুন্দরবন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মিঠা পানির উৎস কমে গেছে।

“বনের বেশকিছু খাল পলিমাটি জমে ভরাট এবং বিভিন্ন এলাকায় চর জেগেছে। ফলে বনে এখন লবণ পানির আধিক্যই বেশি। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরীসহ বিভিন্ন গাছ নানা রোগে মারা যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা সেভাবে কার্যকর নেই।
জলবায়ু সচেতনতা এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের মিডিয়া সমন্বয়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট মনে করেন, উজানের নদীগুলো দিয়ে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে পারলে বন পুনরুজ্জীবিত হবে। এক্ষেত্রে পশুর ও বলেশ্বর নদের মাধ্যমে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানো কার্যকর পদক্ষেপ। পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষায় প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এগোতে হবে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এ বনের ভূমিকা অপরিসীম। এ বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
সুন্দরবনের ‘পরগাছা’র উপদ্রবের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এর প্রতিকার এবং সুন্দরীগাছ রক্ষায় দ্রুত এই পরজীবী উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
“এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসফাক আহমদকে সুন্দরবন ঘুরিয়ে ওই ‘পরগাছা’ দেখানো হয়েছে। উনারা এর শ্রেণি চিহ্নিত করেছেন। শিগগির এ বিষয়ে গবেষণার কাজ শুরু হবে।”