২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

পাটগ্রামে নদীতে ড্রেজারের ক্ষত, হুমকিতে প্রকৃতি-জীবন

“যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের মদদপুষ্ট হয়ে ওই পাথর আর বালু খেকোরা কাজ করে।”

বিডিনিউজ২৪

ফরহাদ আলম সুমন. লালমনিরহাট প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Mar 2025, 09:22 AM

Updated : 26 Aug 2026, 12:01 PM

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর বুক চিরে পাথর ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। 

উপজেলার ধরলা, সানিয়াজান ও সিংগীমারী নদীতে নির্বিচারে চলছে বালু-পাথর উত্তোলন। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী সরকারি বিধি উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অবকাঠামো, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে।

পাটগ্রাম ইউনিয়ান পরিষদের চেয়ারম্যান (ইউএনও) জিল্লুর রহমান সম্প্রতি মাইকিং করে ড্রেজার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যদের যোগসাজশে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না।

নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা বলছেন, বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলেও তাতে কোনো ফল মিলছে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি বন্ধের জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পাটগ্রামের ধরলা পাড়ের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী আজিজুল ইসলাম বলছিলেন, “পাথর আর বালু তুলতে-তুলতে নদীটারে একবারেই শেষ করে দিছে নদী খেকোরা। যারা বালু তোলে তারা এতটাই শক্তিশালী যে, এদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারে না।

“আর প্রশাসনও অনেকটাই বিরক্ত তাদের ওপর। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে বড়জোর একদিন পাথর-বালু তোলা বন্ধ থাকে। পরদিন থেকে আবার শুরু হয়।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার পাথর ও বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন কেনো বন্ধ হচ্ছে না, সে বিষয়ে তার কাছ থেকে কোনো সদুত্তর মেলেনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর মূল প্রবাহিত অংশে বিশাল পাইপের সাহায্যে পানি, পাথর ও বালু একসঙ্গে তোলা হয়। এরপর নৌকায় তুলে পাথরগুলো আলাদা করা হয়। আর বালু নদীর পাড়ে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়। এতে নদীর গতিপথ আটকে যাচ্ছে। এক সময় যেখানে ছিল গভীর নদী, সেখানে এখন বালুর পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে।

নদী গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় নদী তীরবর্তী ফসলি জমি, রেললাইন, সড়ক ও ঘরবাড়ি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই অবৈধ উত্তোলনের ফলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে; বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ।

পাটগ্রাম আদর্শ কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ শহর উদ্দিন বলেন, “ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে পাথর তোলায় মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হচ্ছে।

“এটি শুধু নদীর জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে; তেমনি কৃষিজমির ঊর্বরতা কমে যাচ্ছে।"

তিনি বলেন, “স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে ড্রেজার মেশিন বন্ধ করে দিলেও কয়েকদিন পরই তা আবার চালু হয়।”  

সানিয়াজান এলাকার মুদি দোকানদার অহেদুল হাসান বলছিলেন, “পাথর আর বালু খেকোদের অত্যাচারে নদীটাই শেষ। কিন্তু তাদের নাম বলা যাবে না। নাম বললে এলাকায় কেউ টিকতে পারবে না।

“শুধু এটুকু বলতে পারি, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের মদদপুষ্ট হয়ে ওই পাথর আর বালু খেকোরা কাজ করে।” 

পাটগ্রাম উপজেলার এবি সফিউল আলম লাবু বলেন, “প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশ বিদদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো সম্ভব নয়।”

জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন “ড্রেজার মেশিনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রকল্প হাতে নিচ্ছি যাতে নদীগুলো পুনরুদ্ধার করা যায়। তবে এ কাজে জনগণের সহায়তা প্রয়োজন।”