Published : 04 Jun 2026, 06:15 PM
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী কালিবাড়ী চামড়ার সাপ্তাহিক হাটে সারাবছর কেনাবেচা হলেও স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবছর কোরবানির ঈদের পর তিন থেকে চারটি হাট ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে বেশি জমজমাট থাকে।
এবারও ঈদের পর প্রথম হাটের দিন বুধবার কাকডাকা ভোরেই হাটের মাঠ ভরে গিয়েছিল চামড়ার স্তূপে। সংখ্যায় কম হলেও রাজধানী থেকে বেশকিছু ট্যানারির প্রতিনিধিরাও এসেছিলেন। তারপরও হাটে যেন প্রাণ ছিল না।
ট্যানারির প্রতিনিধিরা চামড়া ক্রয় করার চেয়ে বাজার দর বোঝার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন বেশি। যারা কিনছিলেন তারাও কম দামে কিনছেন এমন অভিযোগে হাট জুড়ে ছিল বিক্রেতাদের হা-হুতাশ আর ক্ষোভ।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গিজাবাড়ী গ্রামের গোলাপ চাঁন (৫০)। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, “এবার বাজার ফিরবে মনে করে অনেক আশা নিয়ে ধারদেনা করে ৫০০-৬০০ টাকা দরে ৭০০ পিস গরুর চামড়া কিনেছিলাম।
“এরপর চামড়ায় লেগে থাকা মাংস তোলা, ধোয়া, লবণ দেওয়া ও পরিবহনসহ চামড়া প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ২৫০টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে ৮০০ টাকা। অথচ সেই চামড়ার দাম বলা হচ্ছে ৬০০ টাকা। তাতে চামড়া প্রতি ২০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্যকে টার্গেট করেই চামড়া কিনেছি, কিন্তু সেই দামের ধারেকাছেও বিক্রি করতে পারছি না।”
একই অভিযোগ হাটে চামড়া নিয়ে আসা প্রায় সব ব্যবসায়ীরই। তারা বলেন চামড়া কিনে টানা কয়েক বছর ধরে তারা ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছেন। এ বছর ঘুরে দাঁড়াবে এই শিল্প-এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন তারা। কিন্তু এবারও স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে তাঁদের।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আমবাড়ী থেকে আসা ব্যবসায়ী সুবাস চন্দ্র বলেন, “সরকার এ বছর প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর নির্ধারণ করেছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। ওই টার্গেটে চামড়া কিনেছি। কিন্ত হাটে চামড়া কেনা হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে।”
ঠাকুরগাঁও থেকে ১৮০টি চামড়া হাটে বিক্রি করতে নিয়ে আসা প্রান্তিক ব্যবসায়ী দবির উদ্দিন বলেন, “প্রতিটি চামড়ায় দেড়শো থেকে ২০০ টাকার লোকসান নিশ্চিত। চামড়া বাড়িতে ফিরিয়ে নিলেও আরও খরচ-তাই বিক্রি না করে উপায় নেই।”

ছাগলের চামড়ার অবস্থা আরও করুণ জানিয়ে তিনি বলেন, “ছাগলের চামড়া প্রতিপিস মাত্র দুই থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ৯০টি ছাগলের চামড়া একত্রে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। যা রীতিমতো মূল্যহীনতার নামান্তর।”
রংপুরের মীরবাগ থেকে আসা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, “২০১৯ সালের আগে এ হাটে চামড়ার ন্যায্য দাম পাওয়া যেত। কিন্তু সেই বছর হঠাৎ যে দরপতন শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে।”
পলাশবাড়ী উপজেলার ঢোলভাঙ্গা এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ের মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্যে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের আশ্বস্ত করেছেন। আপনারা যে দামে চামড়া কিনবেন, সেই চামড়া তার চেয়ে কম দামে আপনাদের আমরা কিনে দেব। এই কারণে ট্যানারি মালিকরা সরেজমিনে হাটে এসেও চামড়া কিনছেন না।”
তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্যানারির স্থানীয় প্রতিনিধি ও চামড়া ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান।
সাভার হেমায়েতপুরের আরকে লেদার কমপ্লেক্স ট্যানারির এ ক্রয় প্রতিনিধি বলেন, “চামড়ার ‘এ’ থেকে ‘এইচ’ পর্যন্ত মোট আটটি গ্রেড রয়েছে। সবচেয়ে ভালো ‘এ’ ক্যাটাগরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ৬০ টাকা দরেই ক্রয় করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী গ্রেডের চামড়াগুলো কম দাম।

“নিম্নমানের গ্রেডের চামড়াগুলো ২০ থেকে ৩০ টাকা বর্গফুটের চেয়ে বেশি দরে ক্রয়ের সুযোগ নেই”, বলেন তিনি।
এদিকে হাট ইজারাদারের প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার সব মিলিয়ে চামড়ার আমদানি গত ঈদের তুলনায় কম। বাজার দর সংকট আঁচ করে অনেক ব্যবসায়ী এবার হাটমুখী হননি। এই প্রবণতা হাটের অস্তিত্বের জন্যও শঙ্কার।”
কালিবাড়ী হাট চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিনু মণ্ডল বলেন, “ঈদ-উল-আযহার পরের বুধবার থেকে তিন-চারটি হাটে এখানে ব্যাপক চামড়া আমদানি হয়ে থাকে। কাক ডাকা ভোর থেকে শুরু করে ক্রয় বিক্রয় চলে রাত পর্যন্ত।
“এবার ক্রেতারা মূলত বাজার যাচাই করছেন। আশা করছি আগামী বুধবারের হাটে ঢাকা থেকে তুলনামূলক আরও বেশি ক্রেতা চামড়া কিনতে আসবেন। পাশাপাশি চামড়ার দামও কিছুটা বৃদ্ধি পাবে।”