Published : 26 Jun 2025, 04:06 PM
নরসিংদীর রায়পুরায় আড়িয়াল খাঁ নদ খননের সাত বছর পর কৃষকের জমিতে রাখা মাটি নিলামে বিক্রি করেছে উপজেলা প্রশাসন।
সম্প্রতি নিলামে এসব মাটি কিনে নিয়েছেন ফিরোজ আল মোজাহিদ ও আক্তার মিয়া নামে দুই ব্যক্তি। তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
কৃষকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের প্রচার ছাড়াই এসব মাটি নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। অথচ এসব মাটি জমিতে থাকায় সেখানে তারা নানা ফলদ বাগান ও বাড়িঘর তৈরি করেছেন। এখন সেই মাটি বিক্রি করে দেওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন।
ফসল ও বাড়িঘর রক্ষায় ওই নিলাম বাতিলের জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসনের নিকট লিখিত আবেদন জানিয়েছেন মরজাল ইউনিয়নের চরমরজাল গ্রামের ভুক্তভোগী আট কৃষক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, “জেলা প্রশাসকের নির্দেশে নিয়ম অনুযায়ী পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রচারের পর নিলামে মাটি বিক্রি করা হয়েছে।

“নিলামের বিষয়টি কৃষকরা কেন জানতে পারলেন না বুঝতে পারছি না। পরে ভুক্তভোগী কৃষকরা দেখা করে এসব জমিতে ফসল ও ঘরবাড়ি রয়েছে বলে আমাকে জানিয়েছেন। নিলাম পাওয়া ব্যক্তিরাও নাকি অতিরিক্ত দামে মাটি বিক্রি করতে চাইছেন। কীভাবে বিষয়টি সমাধান করা যায় ভাবা হচ্ছে।”
কৃষকরা জানান, ২০১৮ সালে সরকার চরমরজাল এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদ খনন করে। খননের এসব মাটি অলিখিত চুক্তিতে জমির ভাড়া দেওয়াসহ মাটির ৪০ শতাংশ কৃষকদের দেওয়ার কথা বলে রাখা হয় নদী তীরের তাদের জমিতে।
খননের এসব মাটি রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে ব্যবহারে অগ্রাধিকারের কথা থাকলেও সেসময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ প্রভাবশালীরা প্রশাসনের চোখের সামনেই অবাধে বিক্রি করে হাতিয়ে দেন লাখ লাখ টাকা। অনেক কৃষক নিজেদের কৃষি জমির উন্নয়ন ও বাড়িঘর নির্মাণের জন্য সেসব মাটি বিক্রি না করে নিজ জমিতে রেখে দেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নদী পুন:খনন প্রকল্পের আওতায় রায়পুরা উপজেলার মরজাল ও চর আড়ালিয়া ইউনিয়নের ছয়টি স্তূপের ৫৩ লাখ সাত হাজার ২০০ ঘনফুট মাটি/বালু সরকারি সম্পদ হিসেবে নিলামে বিক্রি করা হয়। ৪ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ নিলাম অনুষ্ঠিত হয়।
নিলামের মাধ্যমে চর মরজাল উত্তরপাড়ায় কৃষকদের জমির ৪ নম্বর স্পটে/ডাইকে ফিরোজ আল মোজাহিদ ৮৮ হাজার ৪০০ ঘনফুট মাটি/বালু কিনেন ৬১ হাজার ৮৮০ টাকায় এবং ৫ নম্বর স্পটে/ডাইকে আক্তার হোসেন চার লাখ ৮৩ হাজার ঘনফুট মাটি/বালু কিনেন ৩ লাখ ৩৮ হাজার ১০০ টাকায়।

বালু বিক্রির নিলাম বাতিলের দাবি যে আটজন কৃষক প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন তাদের মধ্যে মরজাল ইউনিয়নের চরমরজাল গ্রামের খোরশেদ আলম, নূরুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান, আব্দুল হান্নান, আল মামুন, আমজাদ হোসেন রয়েছেন।
এসব ভুক্তভোগী কৃষক মঙ্গলবার বলেন, তাদের জমিতে দীর্ঘদিন পরে থাকা এসব মাটি ইচ্ছা করলে অন্যদের মত বিক্রি করে দিতে পারতেন। কিন্তু বিক্রি না করে তারা সেখানে ফসলের ক্ষেত, বাগানসহ বাড়িঘর করে বসবাস শুরু করেছেন।
এত বছর পর সরকার যদি এসব মাটি নিলামে বিক্রিই করে, তাহলে সেসব মাটি তারাই সরকারি দামে কিনে নিতে ইচ্ছুক।
তারা বলেন, সরকারের সঙ্গে অলিখিত কথা অনুযায়ী, এসব মাটির ৪০ শতাংশ তাদের পাওয়ার কথা। কিন্তু এখন তাদের না জানিয়ে নিলামে মাটি বিক্রি করায় বিপাকে পড়েছেন তারা।
কৃষকরা আরও অভিযোগ করেন, নিলামে সরকার ৭০ পয়সা ঘনফুট দরে মাটি বিক্রি হয়েছে। তারা মাটি কেনার জন্য নিলামকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে ঘনফুট প্রতি সাত থেকে আট টাকা দাম চাইছে। নিলামকারীরা বলছেন, এই দামে মাটি না কিনলে তারা অন্যত্র বিক্রি করে দেবেন।
নিলামে মাটি কিনে নেওয়া রায়পুরা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন বলেন, “আমার নামে কেনা হলেও, মূলত আমার সঙ্গে আরও অংশীদার আছেন। উন্মুক্ত নিলামে ৭০ পয়সা দরে আমরা মাটি কিনেছি। যদি কৃষকরা কিনতে চান, তাহলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে।”

অপর ক্রেতা উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি ফিরোজ আল মোজাহিদ বলেন, “সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডাকে মাটি কিনেছি। আমি স্পটে এখনও যাইনি, সেখানে ঠিক কী পরিমাণ মাটি আছে ঠিক জানি না। যদি কৃষকদের মাটি থেকে থাকে সেক্ষেত্রে বৈধভাবে যা করার তাই করব।”
সরকারের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে নিয়ম মেনে নিলাম করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নাজমুল হাসান।
এ বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধূরীর মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।