Published : 27 May 2026, 10:31 PM
ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টিতে ভোগান্তির সঙ্গে সড়কে চলাচলকারী পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গী হয়েছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক।
মহাসড়কটির ১৮ কিলোমিটার অংশ এতটাই বেহাল যে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, গর্ত এড়াতে চালকরা ভুল লেনে চলে যাচ্ছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ কিলোমিটারের মধ্যে ১০ কিলোমিটারে কোথাও পিচ সরে ঢেউয়ের মত হয়েছে, কোথাও দেবে গেছে, আবার কোথাও খানাখন্দে ভরা। বাকি আট কিলোমিটারে ইটের সোলিং বসানো হলেও তা ভেঙে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
মহাসড়কটিতে নিয়মিত চলাচলকারী বাসচালক ইব্রাহিম শেখ বলেন, “সড়কে ইটের সোলিং ভেঙে তৈরি গর্ত, ঢেউ খেলানো পথ এবং দলাবাঁধা বিটুমিনের কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গর্ত এড়াতে গিয়ে ভুল লেনে যেতে হচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।”
মহাসড়কের আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারে নিম্নমানের বালু ও খোয়া ব্যবহার করা হয়। এ কারণে বারবার মেরামত করা হলেও তা টেকসই হচ্ছে না, কেবল অর্থের অপচয়ই হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর এলাকার বাসিন্দা অরিন্দম রাহা ও আবির হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে খুলনার জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত যাত্রা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে চুকনগর বাজার পর্যন্ত পথে ভোগান্তির পাশাপাশি ভয় ও আতঙ্কও কাজ করছে।
তাদের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারে সড়ক বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা আর ঠিকাদারদের লাগামহীন দুর্নীতি-অনিয়মে সড়ক টিকছে না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, এই মহাসড়কের কৈয়া বাজার থেকে চুকনগর বাজার পর্যন্ত অংশে বিগত সাড়ে চার বছরে ২৫১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬১ জন আহত এবং ২৬ জন নিহত হয়েছেন।
বছরভিত্তিক দুর্ঘটনার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে ৬৪টি দুর্ঘটনায় ১০৭ জন আহত ও ছয়জন নিহত হন। ২০২৩ সালে ৬৬টি দুর্ঘটনায় ১০৮ জন আহত ও চারজন নিহত হন। ২০২৪ সালে ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৪ জন আহত ও আটজন নিহত হন। ২০২৫ সালে ৫৩টি দুর্ঘটনায় ৬২ জন আহত ও সাতজন নিহত হন। আর চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০টি দুর্ঘটনায় ৩০ জন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন।
ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মহাসড়কটির জয়খালি এলাকা, গুটুদিয়া বাঁক থেকে ডুমুরিয়া বাসস্ট্যান্ডের মধ্যবর্তী অংশ, বালিয়াখালি ও টিপনার বাঁক, কাঁঠালতলা থেকে চাকুন্দিয়া এবং চুকনগর বাজার এলাকায় অধিকাংশ জায়গায় ইট ভেঙে গর্ত তৈরি হয়েছে। নিচখামার রেলক্রসিংয়ের দুপাশে অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়কটির খুলনা অংশের ৩৩ কিলোমিটার ২০১৮-২০ সালে ১৮ থেকে ৩৬ ফুট প্রশস্ত করা হয়। কিন্তু নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই গর্ত ও উঁচু-নিচু সমস্যা দেখা দেয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোজাহার এন্টারপ্রাইজ তিন বছর মেরামত করার পর সওজ নিজস্ব অর্থায়নে কাজ চালিয়ে যায়।
গত বছর বর্ষায় ১৬ কিলোমিটার সড়ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হলে হোগলাডাঙ্গা পাওয়ার গ্রিড ও রাজবাঁধ এলাকায় যথাক্রমে ৫৮ ও ৬৫ লাখ টাকায় কার্পেটিং এবং প্রায় দুই কোটি টাকায় ৮ কিলোমিটারে ইটের সোলিং বসানো হয়।
এ বিষয়ে খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমূল হক বলেন, যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবে এরই মধ্যে জিরো পয়েন্টে এক হাজার ২০০ মিটার এবং চুকনগরে এক হাজার ২৫০ মিটার আরসিসি ঢালাই শেষ হয়েছে। এ ছাড়া আট কিলোমিটার ইটের সোলিং অংশকে আরসিসি ঢালাইয়ে রূপান্তরের জন্য চারটি প্যাকেজে ১০০ কোটি টাকার টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। সিএস অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে।
বাকি ১০ কিলোমিটারের ঢেউ খেলানো ও উঁচু-নিচু অংশ মেরামতেও পরবর্তীতে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।