Published : 23 Aug 2025, 08:16 PM
কক্সবাজারের চকরিয়া থানা হাজতে যুবক নিহতের ঘটনায় এবার ওসিকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, এর আগে এ ঘটনায় থানার তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। শনিবার ওসি শফিকুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “তৌহিদুল আনোয়ারকে চকরিয়া থানার নতুন ওসির দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শফিকুল ইসলামকে কক্সবাজার পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ করা হয়েছে।”
শুক্রবার সকালে চকরিয়া থানা হাজত থেকে দুর্জয় চৌধুরী নামে এক যুবককে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরিবার হত্যার অভিযোগ করলেও পুলিশের দাবি, দুর্জয় আত্মহত্যা করেছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় জনগণের ক্ষোভের মধ্যে শুক্রবার দুপুরে থানার এএসআই মোহাম্মদ হানিফ মিয়া, কনস্টেবল মহি উদ্দিন ও ইশরাক হোসেনকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
দুর্জয় চাকরিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দু পাড়ার কমল চৌধুরীর ছেলে। চকরিয়া সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্বে ছিলেন দুর্জয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে দুর্জয়ের বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক তাকে থানায় হস্তান্তর করেন। তার বিরুদ্ধে দুই লাখ ৮৩ হাজার টাকা জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মামলা করেন।
ভোরে চকরিয়া থানা হাজতের ভেতরে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ পরিবারের
পুলিশের দাবি করা আত্মহত্যাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন দুর্জয় চৌধুরীর বাবা কমল চৌধুরী।
শনিবার সকালে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে কমল চৌধুরী বলেন, “কোনো মামলা বা ওয়ারেন্ট ছাড়া আমার ছেলেকে থানায় রাখা হয়েছে।”
তিনি এ ঘটনার জন্য স্কুলের দুজন শিক্ষককে দায়ী করে বলেন, “আমার ছেলের ব্যাগ ও ল্যাপটপ খুঁজে পাচ্ছি না। হয়তো ল্যাপটপে থাকা কোনো তথ্যের কারণেই প্রাণ হারিয়েছে দুর্জয়।”
তিনি বলেন, “গতকাল আমাদের ব্রেন ওয়াশ করার জন্য তিনজন পুলিশকে প্রত্যাহার করা হয়। যদি তারা জড়িত না থাকতো কেন তাদেরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে? ওইদিন রাতের সিসিটিভি ফুটেজও গায়েব করেছে পুলিশ। পুলিশের গাফিলতির কারণেই আমি ছেলে হারিয়েছি। আমি বিচার চাই।”
দুর্জয়ের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত বা সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল না জানিয়ে কমল চৌধুরী বলেন, “সকালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আমাকে ফোন করে বলেন, আমার ছেলে টাকা জালিয়াতি করেছে। আমি তখন প্রধান শিক্ষিকাকে বলেছি, যত টাকা জালিয়াতি হয়েছে, সব টাকা আমি পরিশোধ করে দেব। দরকার পড়লে ওর চাকরি চলে যাক তবু আপনারা আমার ছেলেকে কিছু করবেন না। ও অপমান সহ্য করতে পারে না।
“আমাকে যদি এখানে দা-ছুরি দিয়ে জবাইও করে দেওয়া হয় তবু আমি মানব না এটা আত্মহত্যা।”
থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় ছেলের শেষ অবস্থানের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “দুর্জয়ের হাত দুটো জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলেছিল, মাথা ছিল উপরের দিকে। মাটি থেকে দুই ইঞ্চি উপরে থেকে কেউ কিভাবে আত্মহত্যা করতে পারে? এটি অবশ্যই একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।”
কমল চৌধুরীর এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, “হাজতের যে স্থানে দুর্জয় আত্মহত্যা করেছে ওই জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা কাভার করে না। তবে তিনি যে হাজতে ছিলেন সেটার দরজা খোলা ছিল, কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন। তাই করিডোরে পায়চারী করার কিছু ফুটেজ পাওয়া গেছে।”
জসীম উদ্দিন বলেন, “দুর্জয় একটা কাগজ আর কলম চেয়ে নিয়েছিলেন। পরে তার প্যান্টের পকেটে সেই কাগজ পাওয়া গেছে, সেখানে তিনি আবেগের কিছু কথা লিখেছেন। সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং তার একটা ল্যাপটপ আছে, ওখানে কিছু তথ্য আছে বলেও লিখে গেছেন। আমরা সেটাও খুঁজছি।”
পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, “ওই রাতে আমাদের চকরিয়া থানার ওসিসহ বেশ কয়েকজন ডাকাত ধরার অভিযানে গিয়েছিলেন। তাই যখন ঘটনা ঘটে তারা বাইরে ছিলেন। তবে অভিযানে দুজন লোক ধরা হয়। তাদের যখন হাজতে নেওয়া হলো, তখন দুর্জয়কে ঝুলন্ত পাওয়া যায়।
“তাও আমাদের কোনো গাফিলতি আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি কাজ করছে।”
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ ছাড়া বাইরে থেকে কেউ ঢুকে হত্যা করেছে এমন কিছু সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যায়নি।
শুক্রবার ভোরে ২৭ বছরের ওই যুবক দুর্জয় চৌধুরীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয় চকরিয়া থানার হাজত থেকে। একজন নির্বাহী হাকিম লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল করেন বলে জানায় পুলিশ।
আরও পড়ুন:
হেফাজতে যুবকের মৃত্যু: বিক্ষোভের মধ্যে চকরিয়ার ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
চকরিয়া থানার হাজতে যুবকের ঝুলন্ত লাশ, পুলিশের দাবি 'আত্মহত্যা'