Published : 05 Mar 2026, 06:16 PM
এক ছাদের তলায় প্রতিদিন এক হাজার রোজাদার ইফতার করছেন। একই প্লেটে চারজন পাশাপাশি বসে মিলেমিশে সেই ইফতার ভাগাভাগি করছেন।
এ চিত্র বগুড়া শহরের স্টেশন রোডে অবস্থিত বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদের।
প্রতি বছর রোজার মাসে এখানে প্রতিদিন এক হাজার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেন। ধনী-গরিব, পরিচিত বা অচেনা সবাই মিলিত হয়ে ইফতার উপভোগ করেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ২০০৮ সালে নির্মাণকাজ শেষে নামাজ এবং রোজার সময় নিয়মিত ইফতার মাহফিল আয়োজন করা হয়।
সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, জোহরের নামাজের পর থেকেই মসজিদে স্বেচ্ছাসেবীদের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবকেরা প্লেটে ইফতার সামগ্রী সাজাতে শুরু করেন আসরের নামাজের পর। প্রতি প্লেটে খেজুর, ছোলা, পেঁয়াজু, মুড়ি, বেগুনি, জিলাপি, বিরিয়ানি বা খিচুড়ি থাকে; সঙ্গে শরবত দেওয়া হয়।

ইফতারের প্রায় আধা ঘণ্টা আগে থেকেই মুসল্লিরা সারিবদ্ধভাবে বসতে শুরু করেন। সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতির সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মসজিদের খাদেম ও স্বেচ্ছাসেবকেরা সবার হাতে হাতে ইফতারির প্লেট পৌঁছে দেন। ইফতারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলতে থাকে। মাগরিবের আজান ধ্বনিত হতেই একসঙ্গে শুরু হয় ইফতার।
বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদ কমিটির সদস্য ও ফল ব্যবসায়ী মাহমুদ শরীফ বলেন, “২০০৮ সালে এ মসজিদে নামাজ আদায় শুরু হয়। ওই বছরের রমজান মাস থেকেই মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে একসঙ্গে ইফতার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
“সেই হিসাবে ১৯ বছর ধরে মসজিদে ইফতারের আয়োজন চলছে। তবে মাঝে মহামারি করোনার কারণে দুই বছর এই উদ্যোগ বন্ধ ছিল।”
তিনি বলেন, “প্রতিদিন ইফতারে দেড় মণ সুগন্ধি চাল ও এক মণ সবজি লাগে। সপ্তাহে দুদিন ১৫-২০ কেজি গরুর মাংসের বিরিয়ানি রান্না করা হয়।
“আগে ৬০০-৭০০ মানুষ ইফতার পেলেও এবার মাসজুড়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১০০০ মানুষের মধ্যে ইফতার বিতরণ করা হয়। রোজা শুরুর আগেই স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ মসজিদের তহবিলে সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেন। এ বছর তহবিলে প্রায় চার লাখ টাকা জমা হয়েছে।”

১৯ বছর ধরে সম্প্রীতির বন্ধনে এমনভাবে ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে জানিয়ে মসজিদের খাদেম মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, “১৯ বছর ধরে মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তায় একসঙ্গে ইফতারের এমন উদ্যোগ চলে আসছে।
“এতে শুধু রোজাদারদের সেবা হচ্ছে না; ধনী-গরিব একসঙ্গে ইফতারের মাধ্যমে রোজার প্রকৃত শিক্ষায় নিজের আত্মশুদ্ধি করেন। এছাড়াও এর মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধের অনন্য উদাহরণ তৈরি হচ্ছে।”
মসজিদে ইফতার করতে আসা ৬৫ বছর বয়সি রিকশাচালক মোহন সাকিদার বলেন, “রিকশা চালিয়ে যে উপার্জন হয় সেখান থেকে ভালোমানের ইফতার করতে গেলে ১০০ টাকা চলে যায়। তাই এখানে যেহেতু ইফতার পাওয়া যায় এজন্য এখানে এসেছি। তাছাড়া এখানে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ নেই।”

আজাহার মিয়া নামের আরেক রিকশাচালক বলেন, “এক প্লেটে চারজন বসে ইফতার করতে অন্য রকম ভালো লাগে। সবাই পাশাপাশি বসে ইফতার করছি।”
শহরের সেউজগারী মেসের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব বলেন, “প্রতিদিন এই মসজিদে বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করতে আসি। এখানে এক প্লেটে চার জন ভাগাভাগি করে খাওয়ার অনুভূতি অন্য রকম। এটা শুধু একসঙ্গে ইফতার নয়; পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।”
ভিক্ষুক রজব আলী বলছিলেন, “অনেকজন মিলে এখানে ইফতার করি। একলগে অনেক খাবার দিয়া ইফতার করা যায়। এজন্য আমরা এখানে প্রতিনিয়তই আসি।”
স্থানীয় চা দোকানদার হাফিজ উদ্দিন বলেন, “যাদের ইফতারি করার মতো সামর্থ্য নেই তারাও এখানে এসে ইফতার করতে পারেন। এটি একটি ভালো উদ্যোগ।”
১৯ বছর ধরে মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় এই আয়োজন চলছে বলে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “এতে শুধু রোজাদারদের সেবা নয়, ধনী-গরিব একসঙ্গে বসে ইফতারের মাধ্যমে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে।”