১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বাকৃবিতে এক রাতে চার হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, তদন্ত কমিটি

এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বাকৃবিতে এক রাতে চার হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, তদন্ত কমিটি
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2026, 06:57 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-বাকৃবিতে এক রাতে চার আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

রোববার মধ্যরাত পর্যন্ত আলাদায় ঘটনায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী হল, আশরাফুল হক হল ও শহীদ শামসুল হক আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। 

সোমবার বিকালে বাকৃবির ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. শহীদুল হক বলেন, সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেই হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি এবং আহতদের চিকিৎসাসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে এর মধ্যে একটি সভা হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে রাত সাড়ে ৯টায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল ও মাওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরপর প্রক্টোরিয়াল টিমের উপস্থিতিতে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনার মীমাংসা হয়। 

এর কিছুক্ষণ পর রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসিলের মোড় এলাকায় এক চায়ের দোকান থেকে আশরাফুল হক হল ও শামসুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার স্বার্থে বক্তব্য দেওয়া শিক্ষার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, রাতে আব্দুল জব্বার মোড় এলাকায় সোহরাওয়ার্দী হলের এক শিক্ষার্থীকে একা পেয়ে মাওলানা ভাসানী হলের আট থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, “আমি জব্বার মোড় দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরে। আমি জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? তখন তারা আমাকে উসকানিমূলক কথা বলতে শুরু করেন। এরপর তারা আমাকে মারধর করেন। 

“তারা এমনভাবে মারছিল যে আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বাঁচব না। কোনো রকমে সেখান থেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচি। তারা আমার চশমা ভেঙে ফেলে এবং মানিব্যাগও নিয়ে নেয়। এর আগে একটি হোটেলে খাবারের সময় হামলাকারীদের কয়েকজনক আমাকে শনাক্ত করতে দেখেছি।”

ঘটনার পর পর সোহরাওয়ার্দী হলের শিক্ষার্থীরা বিচার দাবিতে একত্র হন। হলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী মিজু আহমদ বলেন, “আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আগের দিনের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আবার এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে। 

“প্রশাসন যদি এখনই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করে, তাহলে ভবিষ্যতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল থাকবে। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।”

এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে তিনি বলেন, ওরা যা করছে সেটি অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এটার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। গত রাতে যা হয়েছে, তার জন্য উভয়পক্ষেরই দায় আছে।

অন্যদিকে একই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসিল মোড় এলাকায় শামসুল হক হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় চায়ের দোকানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। 

পরে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। উভয়পক্ষের শিক্ষার্থীরা অন্য হলের গেইট এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরও চালায়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশরাফুল হক হলের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, “আমার ব্যাচমেট ও জুনিয়রসহ সাতজন শিক্ষার্থী ফসিলের মোড় এলাকায় চায়ের দোকানে বসে থাকার থাকার সময় শামসুল হক হলের প্রায় ৪০ শিক্ষার্থী অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা আমাদের গালিগালাজ ও মারধর করে শামসুল হক হলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেন।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শামসুল হক হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, পূর্ব বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ফসিল মোড় এলাকায় হাতাহাতির পর ভুল তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। 

এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীরা শামসুল হক হলের গেইটে গিয়ে ভাঙচুর চালান বলে দাবি এই শিক্ষার্থীর।

ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শহীদুল হক বলেন, সোহরাওয়ার্দী হল ও আশরাফুল হক হলের মধ্যকার ঘটনায় একটি এবং শামসুল হক হল ও আশরাফুল হক হলের মধ্যকার ঘটনায় আরেকটি কমিটি কাজ করবে। দুই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

“ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়েও আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি। আশা করছি, আজকের মধ্যেই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে”, বলেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম বলেন, “সাম্প্রতিক ধারাবাহিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো নিয়ে উপাচার্যের নেতৃত্বে প্রোভোস্ট কাউন্সিল, প্রক্টোরিয়াল বডি ও অ্যাডভাইজরি বডির সদস্যদের উপস্থিতিতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। 

“বিভিন্ন হল থেকে পাওয়া কাগজপত্র, আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে যারা দোষী বলে প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এক সপ্তাহ আগেও প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীর বিরোধকে কেন্দ্র করে আশরাফুল হক হল ও শামসুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৩ শিক্ষার্থী আহত হন।

এ ঘটনার পর শনিবার রাতে অনলাইনে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চারজন শিক্ষার্থী আহত হন। 

এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।