Published : 05 May 2026, 10:56 PM
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে কংক্রিটের উপর লোহার কাঠামো দিয়ে প্রায় ৯০০ দোতলা ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। ‘পাহাড় কেটে’ এসব ঘর তৈরির ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছে বনবিভাগ।
অপরদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এগুলো ‘অস্থায়ী’ নয়, বরং স্থায়ী বসতির ইঙ্গিত।
যদিও শরণার্থী কমিশন ও ইউএনএইচসিআর বলছে, এগুলো এখনো ‘সম্পূর্ণ অস্থায়ী কাঠামো’।
বনবিভাগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পের এক্সটেনশন ‘ই’ ব্লকে অন্তত ৮৮৮টি দোতলা এমন বসতি বা শেল্টার নির্মাণ চলছে। এরই মধ্যে প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

বনবিভাগের অভিযোগ: পাহাড় কেটে স্থাপনা
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এলাকায় পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য লোহার কাঠামোর দোতলা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি আমরা জেনেছি এবং এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি।
“এটি বনবিভাগের সংরক্ষিত জমি। কিন্তু ক্যাম্পের অভ্যন্তরের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকায় আমরা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। প্রায় কয়েকশ শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছে, ফলে খুব দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ এগোচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০-৯০০টির মত শেল্টার নির্মাণের কাজ ৮০-৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।”
আব্দুল মান্নান বলেন, “এই কাজের জন্য পাহাড় কেটে ১০ ফুটের রাস্তা করা হয়েছে। গাছ নিধনসহ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এত বড় পরিসরে কাজ হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি।”
তিনি বলেন, “এলাকাটি আগে সংরক্ষিত বনভূমি ছিল। বর্তমানে সেখানে যেভাবে ভূমি সমতল করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আপনাদের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার এবং ক্যাম্প ইনচার্জের বক্তব্যও নেওয়া উচিত।”
কমিশনার বলছেন, স্থায়ী কিছু নয়
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলছেন, এই কাঠামো নিয়ে ‘অতিরঞ্জিত’ ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২১-২২ সালের দিকে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদিত নকশার ভিত্তিতেই এই ধরনের শেল্টার তৈরি হচ্ছে।
তার ভাষায়, “লোহার কাঠামো ব্যবহার করা হলেও সেগুলো নাট-বল্টুর মাধ্যমে বসানো, যাতে সহজেই খুলে ফেলা যায়। এটি কোনো স্থায়ী স্থাপনা নয়।”
কংক্রিট ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “পুরোপুরি কংক্রিটের বেইজ নয়, মূলত ফ্লোরের মত একটি ভিত্তি দেওয়া হচ্ছে, যাতে কাঠামো মাটিতে সরাসরি বসানো না লাগে।”
পাহাড় কাটার অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে আপত্তি ওঠায় সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।

ইউএনএইচসিআরের ব্যাখ্যা
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, নতুন শেল্টারগুলো মূলত দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য ডিজাইন করা।
সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ের যোগাযোগ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, শেল্টারে এখনো বাঁশ ও প্লাস্টিক শিটই প্রধান উপকরণ, সর্বোচ্চ তিন ইঞ্চি ব্যাসের স্টিল পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পুরো কাঠামো নাট-বল্টুর মাধ্যমে যুক্ত, যাতে সহজে খুলে ফেলা যায়।
তার দাবি, “নির্মাণাধীন এসব শেল্টার কোনো স্থায়ী কাঠামো নয় এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী ধরনের অবস্থানের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। এই নকশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত।
“এটি নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্মিলিত মানবিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন। একইসঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে সম্মান জানায়, যেখানে নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বিবেচিত।”
স্থানীয়দের উদ্বেগ
একদিকে বনভূমি কাটা, সড়ক নির্মাণ এবং দুইতলা কাঠামো, যা দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী এই নির্মাণকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে মনে করছেন।
তার মতে, “শক্ত অবকাঠামো তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাসের পথ তৈরি হবে, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।”