Published : 18 Aug 2025, 02:14 PM
বর্ষার শুরুতে হাঁটু সমান কাদা-পানি মাড়িয়ে, পানি বাড়লে ডিঙি নৌকায় যেতে হয় স্কুল দুটিতে। দোদুল্যমান সে ডিঙি প্রায়ই উল্টে গিয়ে শিশুদের বই-খাতা, ব্যাগ, জামা ভিজেছে। ভাগ্যক্রমে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি।
এভাবেই পানি পেরিয়ে স্কুলে যাচ্ছে গোপালগঞ্জ পৌর শহরের কাড়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাড়ারগাতী সার্বজনীন হরি মন্দিরের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের শতাধিক শিশু শিক্ষার্থী।
প্রাথমিক বিদ্যালয়টি কাড়ারগাতী পোদ্দারবাড়ির পাশে আর হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট্রের মন্দিরভিত্তিক উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রটি পারমানিক বাড়ির পাশে। এ ২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিশুদের বয়স ৩ বছর থেকে ১১ বছরের মধ্যে।
সম্প্রতি সরজমিনে দেখা যায়, জেলা সদরের পুলিশ লাইন্সের পরের ফিলিং স্টেশন থেকে উত্তর দিকে একটি পাকা রাস্তা পোদ্দারবাড়ি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। পুলিশ লাইন্সের ট্রাফিক পুলিশ বক্স থেকে উত্তর দিকে আরেকটি পাকা রাস্তা গেছে পরামানিক হয়ে কাড়ারগাতী সর্বজনীন হরি মন্দির পর্যন্ত। কিন্তু এর মাঝের ৩০০ মিটার অংশে কোনো রাস্তা নেই।
শুকনো মৌসুমে স্থানীয়রা ধানক্ষেতের আল দিয়ে এ অংশে চলাচল করতে পারলেও বর্ষায় শুরু হয় নানা ভোগান্তি। বর্ষায় সেখানে পানি জমে অন্তত ৪ মাস জলাবদ্ধতা থাকে।
কাড়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিরু কামরুন্নাহার বলেন, “আমার বিদ্যালয়ের ২১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এরমধ্যে ৭৬ শিক্ষার্থী পানি পেরিয়ে পারমানিক বাড়ি এলাকা থেকে স্কুলে আসে।

“এসব শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের দুর্ভোগ নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় থাকি। এছাড়া দক্ষিণ কাড়ারগাতী গ্রাম থেকে রাস্তার পানি মাড়িয়ে স্কুলে আসে অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী। এখানে নৌকাও চলে না। তাই রাস্তাগুলো নির্মাণ ও সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।”
কাড়ারগাতী মন্দিরের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক পলি বালা বলেন, “আমার এ কেন্দ্রে প্রাক প্রাথমিক শ্রেণির ৩০টি শিশু পড়াশোনা করছে। এরমধ্যে ১৪টি শিশু পানি মাড়িয়ে পোদ্দারবাড়ি এলাকা থেকে কেন্দ্রে আসে। মাত্র ৩০০ মিটার রাস্তা করে দিলে এ দুর্ভোগ থেকে শিশু, অভিভাবক ও আমরা রক্ষা পাব।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা হয় কাড়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণ পোদ্দার, দিশা টিকাদার, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রাপ্তি বিশ্বাসের সঙ্গে।
এই শিশুরা বলে, শুকনো মৌসুমে তারা জমির আইল দিয়ে হেঁটে স্কুলে যায়। কিন্তু বর্ষার শুরুতে জমির আইল তলিয়ে গেলে হাঁটু বা কোমর পানি পেরিয়ে স্কুলে যায় তারা। কিন্তু ১০ দিন হল পানি বেড়েছে। হেঁটে পার হওয়ার সুযোগ নেই।
এখন ১০ টাকা দিয়ে ডিঙি নৌকায় পার হতে হচ্ছে জানিয়ে তারা বলে, কিন্তু নৌকায় উঠলেই দুলতে থাকে। কখনো কখনো নৌকা উল্টে ডুবে যায়। তখন তাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।

শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি কির্ত্তনীয়া, রাত্রী মজুমদার বলে, কোন সময় জুতা খুলে চলাচল করতে হয়। এতে কখনো-কখনো পায়ে কাটা ঢুকে যায়। কাদার জন্য পড়ে যেতে হয়। আবার কোন সময় অর্ধেক প্যান্ট ভিজে যায়। অর্ধেক প্যান্ট শুকনো থাকে। পরে ওই আধা ভিজা প্যান্টেই ক্লাস করতে হয়। মানুষের চলাচলের জন্য পথে গর্ত হয়ে যায় । এ গর্তের মধ্যে পা পড়ে ব্যথা পাই। যাতায়াত করতে গিয়ে ব্যাগ, ড্রেস ও বই ভিজে যায়। ঝড়-বৃষ্টি হলে স্কুলে যাওয়া হয় না।
কাড়ারগাতী গ্রামের শিক্ষক পবিত্র কুমার বিশ্বাস, শুকনো রাস্তায় যেতে হলে শিক্ষার্থীদের ঘুরতে হয় ২ কিলোমিটার পথ। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ব্যস্ত ওই পথে দ্রুতগামী যানবাহন চলাচল করে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত না করে বাধ্য হয়েই এভাবে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আশা করছে শিশুরা।
ডিঙি নৌকার মাঝি অমিত রায় বলেন, “শিশুরা নৌকায় উঠার পর নৌকা দুলতে থাকে। শিশুরা নড়া-চড়া করলে নৌকা উল্টে যায়। কয়েক বার উল্টে ডুবেও গেছে। এতে শিশুরা ভিজে গেছে। কিন্তু কোনো ক্ষতি হয়নি। সাঁতার না জানা শিক্ষার্থীরা থাকলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।”
কাড়ারগাতী গ্রামের সুজন মজুমদার, রিপন বিশ্বাস বলেন, আমরা এখানে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ বসবাস করি। বর্ষাকালে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। চলাচলের জন্য এই রাস্তাটি নির্মাণ করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। আবেদন করার পরও পৌর কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি ।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. জ্যোৎস্না খাতুন বলেন, “গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন।”
গোপালগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদি হাসান বলেন, “যে স্থানে রাস্তা নির্মাণ করার দাবি করা হচ্ছে, সেখানে জমির মালিকরা জায়গা দিতে চাচ্ছে না। তাই রাস্তা তৈরি করতে বিলম্ব হচ্ছে। জায়গার বিষয়টি সমাধান হলে, দ্রুত সময়ের মধ্যে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে ।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম. রকিবুল হাসান বলেন, “রাস্তা নির্মাণের গুরুত্ব দ্রুত বিবেচনা করা হবে ।”