সুন্দরবনে কুমিরের পেটে যাওয়া সুব্রতের ঘরে এল ছেলে সন্তান
“আমি চাই আমার সন্তান লেখাপড়া শিখুক। সে যেন বাবা-দাদার ঝুঁকিপূর্ণ জীবন না দেখে এবং তাদের পেশা অনুসরণ না করে।”
সুন্দরবনের করমজল খালে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারানো বনজীবী সুব্রত মণ্ডলের ঘর আলো করে এসেছে নবজাতক।
ঈদের আগের দিন ২০ মার্চ খুলনার একটি হাসপাতালে সুব্রতের স্ত্রী মুন্নী খাঁ ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে বাবার এই সন্তান আগমনে সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা ছিল, তিনি আজ আর বেঁচে নেই।
৩২ বছর বয়সী সুব্রত গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে ফেরার পথে করমজল খালে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান।
সন্তানের জন্মের পর ২৩ মার্চ মুন্নী ছেলেকে নিয়ে নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়ি ফিরে গেছেন। মুন্নীর নানিবাড়ি দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকায়। স্বামী মৃত্যুর পর থেকে নানির বাড়িতেই থাকছেন তিনি।
মুন্নী বলছিলেন, “গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সুব্রত সকাল বেলা ঘর থেকে বের হয়। ঘরে টাকার টানাটানি ও অসুস্থতা থাকলেও বনে কাঁকড়া ধরতে যেতেই হয়েছিল তাকে। সুব্রতদের বাড়ি থেকে সুন্দরবনের করমজল খালের দূরত্ব খুব বেশি নয়, দুই কিলোমিটারের মতো।
“ফেরার পথে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় কুমির আক্রমণ করে। প্রায় সাত ঘণ্টা পর করমজল খালের গজালমারী এলাকা থেকে সুব্রতর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।”
মুন্নী তখন চার মাসের অন্তঃসত্তা ছিলেন। ঈদের আগের দিন প্রসব ব্যথা শুরু হলে তাকে মোংলায় এবং পরে খুলনায় নেওয়া হয়। বর্তমানে মা ও নবজাতক সুস্থ রয়েছেন।
কান্না জড়িত কন্ঠে মুন্নী বলেন, “সাত বছরের অপেক্ষার পর ঘরে সন্তান এল। কিন্তু বাবা হওয়ার আনন্দের এই সংবাদ যার সবচেয়ে আগে শোনার কথা, তিনি তখন আর নেই। আমার ছেলেটাও ওর বাবার মুখটা দেখতে পেল না। তবে আমার শাশুড়ি বামনী মণ্ডল এসে সন্তানকে দেখে গেছেন।
“সুব্রতের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে ওর নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রেখেছি শুভজিৎ।”
তিনি বলেন, “আমাদের ভালোবেসেই বিয়ে হয়েছিল। দুই ধর্মের পরিবার হওয়ায় প্রথম দিকে কেউ সহজে মেনে নেয়নি। তবে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। কিন্তু সুব্রতের মৃত্যুর পর অনেক কষ্টের মধ্যে জীবন কাটছে। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা আমার সন্তান ও স্বামীর রেখে যাওয়া ঋণ।”
মুন্নী খাঁর জীবন যেন এক বিষাদে ভরা। যখন তার বয়স মাত্র আট মাস, তখনই বাবা তাকে ও তার মাকে ফেলে চলে যান। পরে বাবার মৃত্যুর সংবাদ আসে। এরপর মা আবার সংসার পাতেন অন্য কোথাও। মা-বাবার ছায়া হারিয়ে মুন্নীর আশ্রয় হয় নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর কাছে।
মুন্নী বলছিলেন, পূর্ব ঢাংমারী এলাকায় ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালান অপর্ণা পাটোয়ারী। সেই দোকানের সামান্য আয় দিয়েই নানি তাকে আগলে রেখে বড় করেছেন। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরালেও মুন্নী স্বপ্ন দেখেছিলেন সুব্রতের হাত ধরে এক টুকরো সুখের। কিন্তু ভালোবাসার সেই মানুষটিও সুন্দরবনের গহীন খালের নোনা জলে হারিয়ে গেলেন।
মুন্নী বলেন, “আমার শ্বশুরও ছোটবেলা থেকেই জঙ্গল করতেন। তিনি বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পর আমার স্বামীও জঙ্গলে যেতেন। সুব্রতের ছোট তিন ভাইয়ের একজন বিদেশে থাকলেও বাকি দু’জন জঙ্গলেই কাজ করেন।”
“আমি চাই আমার সন্তান লেখাপড়া শিখুক। সে যেন বাবা-দাদার ঝুঁকিপূর্ণ জীবন না দেখে এবং তাদের পেশা অনুসরণ না করে।”
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুব্রত মণ্ডল সুন্দরবনে বৈধভাবে কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়েছিলেন। তার পরিবারকে সরকারি সহায়তার তিন লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, বৈধ পাস পারমিট ছাড়া কেউ যদি সুন্দরবনে প্রবেশ করেন এবং কোনো দুর্ঘটনার শিকার হন, তবে তিনি বা তাঁর পরিবার সরকারি এই আর্থিক সহায়তা পাবেন না।"
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে মোট ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা রয়েছে, যার মধ্যে ১৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার জলভাগ। এখানে পুরুষরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাছ ও কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা সংগ্রহ এবং মধু আহরণের কাজে নিয়োজিত থাকেন। নারীরা ও শিশুরা কাঠ সংগ্রহ এবং চিংড়ির পোনা ধরার কাজে ব্যস্ত থাকেন।
সুন্দরবনের প্রায় অর্ধেকের বেশি এলাকা বর্তমানে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে জেলেদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগের মাধ্যমে বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরার অংশ নিয়ে গঠিত হচ্ছে পশ্চিম সুন্দরবন, আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে গঠিত হচ্ছে পূর্ব সুন্দরবন।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সুরক্ষা বিষয়ক নাগরিক সংগঠন, বাংলাদেশ সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের মিডিয়া সমন্বয়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট বলেন, “সুন্দরবন-লাগোয়া গ্রামগুলোর পুরুষরা বংশপরম্পরা সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু আহরণের কাজ করেন। আর নারী ও শিশুরা ব্যস্ত থাকেন কাঠ সংগ্রহ ও চিংড়ির পোনা ধরার কাজে।
“প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই কাজ আঁকড়ে ধরে আছেন। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা সংকট আর ঝুঁকি বনজীবীদের জীবন ও জীবিকার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।”
দাকোপের বাণীশান্তা ইউনিয়নের ঢাংমারী এলাকার বনজীবী সুরেশ রপ্তান বলেন, বনের মধ্যে মৌচাকের দেখা মিলছে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কম। আর সাম্প্রতিক সময়ে বনে প্রবেশ, গোলপাতা আহরণ ও নদী-খালে মাছ-কাঁকড়া ধরতে বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের উৎকোচ বাণিজ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। সঙ্গে রয়েছে বনদস্যু ও বাঘ কুমিরের ঝুঁকি। এ সব কারণে কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যাচ্ছেন।
