১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সাদাপাথর থেকে রাংপানি, থামছে না পাথর-বালু লুট

সিলেটের ‘সাদাপাথর ও জাফলংয়ের’ পর এবার ‘রাংপানি’ পর্যটনকেন্দ্রে চলছে পাথর লুট।

সাদাপাথর থেকে রাংপানি, থামছে না পাথর-বালু লুট
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ‘রাংপানি’ পর্যটনকেন্দ্র।

বাপ্পা মৈত্র

সিলেট প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Aug 2025, 11:52 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:36 PM

সমালোচনার মুখে প্রশাসন যখন সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ‘সাদাপাথর ও জাফলংয়ের’ লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে উদ্যোগী হয়েছে, ঠিক তখনি জৈন্তাপুর উপজেলার ‘রাংপানি’ পর্যটনকেন্দ্রে চলছে পাথর লুট।

উপজেলার শ্রীপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘জল-নুড়ি-পাথর’ জমে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এই পর্যটনকেন্দ্র অসাধুদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, লুটেরাদের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অসৎ’ লোকজনও জড়িত। 

রাংপানিতে পাথর লুট চলছে গত কয়েক বছর ধরেই।তবে গত বছরের ৫ অগাস্টের পর থেকে বেড়েছে লুটপাট। বর্তমানে সীমান্তের ওপারে গিয়ে শ্রমিকেরা পাথর তুলে নিয়ে আসছেন। রাজনৈতিক নেতাদের মদদেই এ লুটপাট চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। 

তরুণ সংবাদকর্মী রুমান আহমেদ রোববার রাংপানি পর্যটনকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, “আমরা গিয়ে দেখি আট থেকে দশটি বারকি নৌকা দিয়ে পাথর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। টিলা কেটে বড়-বড় গর্ত করে পাথর তুলে, সেগুলো হ্যামার দিয়ে ভেঙে টুকরো-টুকরো করে বারকি নৌকা দিয়ে পরিবহন করা হয়। 

“আর পাথর নিয়ে যাওয়া শ্রমিকেরা নজর রাখেন স্পটে কে আসছে আর কে যাচ্ছে। শ্রমিকরা তাদের পাথর লুটের ছবি-ভিডিও করতে দেখলে আক্রমণ করতে তেড়ে আসে।”

স্থানীয়রা বলছেন, রাংপানির পাথর আগে আওয়ামী লীগ নেতাদের মদদে লুট করা হত। আর এখন লুটপাট হচ্ছে বিএনপি ও যুবদলের কয়েক নেতার নেতৃত্বে। তারা প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা তোলেন। প্রতি ট্রিপে এক বারকি নৌকা থেকে ৮০০ টাকা, আর ট্রাক থেকে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়।

একটি বারকি নৌকায় ৬০ থেকে ৮০ থেকে ফুট পাথর নেওয়া যায়। একটি নৌকা প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশটি ট্রিপ দিতে পারে। কেউ-কেউ দিনে চারটি ট্রিপও দেয়।

 এই পাথর লুট করে নিয়ে রাখা হয় রাংপানি ক্যাপ্টেন রশিদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের পেছনে। আর সেখান থেকে ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে চলে যায় পাথর।

জৈন্তাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল আহাদ, ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও শ্রীপুর পাথর কোয়ারির সাধারণ সম্পাদক দিলদার হোসেন, জৈন্তাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন, জৈন্তাপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি আমির নূরুল ইসলাম এই লুটপাটে নেতৃত্বে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে জৈন্তাপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি আমির নূরুল ইসলাম বলেন, “সংগঠনকে বিতর্কিত করতে এটি করা হচ্ছে । ২০১৭ সাল থেকে শ্রীপুর এলাকায় পাথর ব্যবসার সঙ্গে আমি জড়িত না। এটা কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবে না, আমি চ্যালেঞ্জ করলাম। 

“এটা মূলত আমার সংগঠনকে ভাইরাল করার জন্য করা হচ্ছে। রাংপানি নদীতে যে লুটপাট হচ্ছে, এই জায়গাটি বাংলাদেশের সীমান্ত পিলার থেকে ২০০ গজ ভেতরে, এটি ভারতের অংশ।”

জৈন্তাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন বলেন, “আমার জীবনেরও আমি ঘাটের ব্যবসায় যাইনি। ঘাটের ব্যবসা যারা করে তাদের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। নির্বাচন করার কারণে আমার নাম বলতেছে। আমি সামনেও নির্বাচন করব। আমি এলসির ব্যবসা করি। কোনো দিন ঘাটে যাইনি।”

জৈন্তাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল আহাদ বলেন, “শ্রীপুর থেকে পাঁচটি জায়গায় মাল যায়। রাংপানি ঘাটসহ কোনো ঘাটে আমি জড়িত না। রাংপানি ঘাটের সভাপতি এটি জানে। 

“গত বছরের ৫ অগাস্টের পর কিছু লোক শ্রীপুর-রাংপানি এলাকায় চাঁদাবাজি করতে চেয়েছিল; আমি তাদের বাধা দিয়েছি। তারাই আমার নাম বলতেছে। এই চক্রই আমার নাম বলতেছে।”

জৈন্তাপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও শ্রীপুর পাথর কোয়ারির সাধারণ সম্পাদক দিলদার হোসেন বলেন, “শ্রীপুর পাথর কোয়ারি বন্ধ রয়েছে, এটির ইজারা নেই। আমার এরিয়াতে কোনো পাথর ওঠে না। আমি এগুলোর সঙ্গে জড়িত না। 

“আসামপাড়া শংকরের ঘাট, আদর্শগ্রাম বালুরসাইট, ৪ নম্বর বাংলাবাজার সাইটের ব্যবসায়ী সমিতি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জানে পাথর কোথাও থেকে আসতেছে তাদের ঘাটে। তাদের কাছে জানতে পারেন।”

জৈন্তাপুর উপজেলার ৪ নম্বর বাংলাবাজার ঘাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও জৈন্তাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিক আহমদ বলেন, “আমাদের ঘাট ছয় ধরে বন্ধ আছে। আমার সভাপতির মেয়াদ শেষ, আমি অনেক দিন ধরে ঘাটে যাইনি। 

“এখন যদি কেউ পাথর আনে আমি জানি না। কেউ চুরি করে পাথর এনে রাখতে পারে, শুনেছি পাথর চুরি হচ্ছে। আমি কালেকশন ব্যবসা বাদ দিয়ে দিয়েছি।” 

আসামপাড়া শংকরের ঘাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল জাব্বার বলেন, “আসামপাড়া শংকরের ঘাটে বালু রয়েছে। এই ঘাটে কোনো পাথর নেই। আপনি এসে দেখতে পারেন। ৫ অগাস্টের পর থেকে ঘাটে যাই না আমি। 

“মামলা খেয়ে জেল খেটে বের হয়েছি, এখন বাড়ি থেকে বের হই না। ঘাট কীভাবে চালাব। বর্তমানে আমরা বাড়ি থেকে বের হতে পারি না।”

আদর্শগ্রাম বালুরসাইট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মানিক চৌধুরী বলেন, “আমি সমিতিতে নেই। আমার কমিটির মোয়াদ শেষ। আগামী মাসে সমিতির নির্বাচন হবে। আমি এলসির ব্যবসা করি। গত বছর থেকে পাথর কোয়ারিতে কোনও ব্যবসা করি না।”

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রীপুর পাথর কোয়ারি সামিতির সদস্য হলেন- মহর, জসিম। তাদের সবাই কোয়ারি মেম্বার ডাকে। তারাই ঘাটটি চালাচ্ছেন। শ্রীপুর ঘাটের লাইনম্যান ফয়সল। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আহাদ, জসিম ও মহর মেম্বার। আর আদর্শগ্রাম বালুরসাইট চালাচ্ছেন লাইনম্যান আল-আমিন, শাহজাহান সম্রাট, নজরুল, কাসাদ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা বলেন, “প্রশাসন যদি সাদাপাথরের লুট বন্ধে কঠোর হত, তাহলে রাংপানিসহ অন্য স্পটগুলোতে এমন হত না। সিলেটের প্রতিটি পর্যটন স্পটে লুটপাট হচ্ছে। রাংপানিসহ অন্য স্পটগুলোর বালু-পাথর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রশাসন কঠোর না হলে এ রকম লুটপাট বন্ধ হবে না।” 

সদ্য যোগদান করা সিলেট জেলা প্রশাসকের কাছে পর্যটন স্পটগুলো রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান এই পরিবেশ কর্মী।

জৈন্তাপুর থানার ওসি আবুল বাশার মোহাম্মদ বদরুজ্জামান বলছেন, পুলিশের নামে চাঁদা তোলার বিষয়টি তার জানা নেই। 

আর জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জর্জ মিত্র চাকমা বলেন, “প্রশাসনের নামে অনেকেই ফায়দা নিতে চাচ্ছে। যারা এগুলো করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা পাথর উত্তোলনে একাধিকবার অভিযান করেছি, অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

রাংপানির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু পর লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে অভিযান চালানোর কথা বলছে স্থানীয় প্রশাসন।  

জৈন্তাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারজানা আক্তার লাবনী বলছেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ২৮ হাজার ঘনফুট বালু এবং ২০ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে। 

এর আগে সোমবার সকালে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযানে ৩৫ ট্রাক বালু এবং নয় হাজার ৫০০ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয় বলে জানান তিনি। 

ফারজানা আক্তার বলেন, “জনগণের সচেতনতা ছাড়া এসব বন্ধ করা সম্ভব নয়। এসব বন্ধ করতে সবার অংশগ্রহণ জরুরি। তবে ক্র্যাশার মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

জব্দ করা পাথর রাংপানি নদীতে পুনঃস্থাপন করা হবে বলে জানান সহকারী কমিশনার।