১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মেশিনের যুগে ঝালকাঠিতে টিকে আছে হাতে ভাজা মুড়ির ঐতিহ্য

“কোনো ধরনের রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান ছাড়াই সনাতন পদ্ধতিতে মাটির চুলায় এসব গ্রামে মুড়ি ভাজা হয়।”

বিডিনিউজ২৪

আরিফ সরদার, ঝালকাঠি প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Mar 2026, 02:14 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:06 PM

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অধিকাংশ মুড়ি মেশিনে তৈরি হলেও গ্রামবাংলার অনেক এলাকায় এখনও পুরনো পদ্ধতিতে হাতে মুড়ি ভাজার ঐতিহ্য টিকে আছে।

ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে চুলার আগুনে বড় কড়াইয়ে বালু গরম করে তার মধ্যে চাল ঢেলে মুড়ি ভাজা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতিতে তৈরি মুড়ি তুলনামূলক মচমচে ও সুস্বাদু হওয়ায় অনেক ক্রেতাই এ মুড়ির খোঁজ করেন।

মুড়ির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত নলছিটি উপজেলা। জেলার বিভিন্ন স্থানে মুড়ি ভাজার ঐতিহ্য থাকলেও এ উপজেলার দপদপিয়া, নাচনমহল ও কুলকাঠি ইউনিয়নের অন্তত দশটি গ্রামের মানুষ বংশপরম্পরায় এ পেশার সঙ্গে জড়িত। ৩৫ থেকে ৪০ বছর ধরে তারা মুড়ি ভেজে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

তাদেরই একজন কুলকাঠি ইউনিয়নের মলিনা রানী দাস। তিনি বলছেন, সময় ও শ্রম বেশি লাগলেও ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা এখনও হাতে মুড়ি ভাজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

হাতে ভাজা মুড়ি তৈরিতে কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই, নাচনমহালের কুড়ালিয়া, দপদপিয়া ইউনিয়নের তীমিরকাঠি গ্রাম উল্লেখযোগ্য।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রোজাকে কেন্দ্র করে এসব গ্রামে মুড়ি ভাজার কাজ চলে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। এসব গ্রামের অনেক পরিবার সারা বছর মুড়ি ভাজার কাজ করলেও এ সময়টায় তাদের ব্যাস্ততা বাড়ে।

সরই, কুড়ালিয়া ও তীমিরকাঠি গ্রাম ঘরে দেখা গেছে, দূর-দূরান্ত থেকে সাধারণ গৃহস্থ ও মুড়ি ব্যবসায়ীরা চাল নিয়ে এসে এখানকার কারিগরদের দিয়ে মুড়ি ভেজে নিচ্ছেন।

চাল নিয়ে এলে খরচ কেমন পড়ে এমন প্রশ্নে মলিনা রানী বলেন, কেউ চাল নিয়ে এলে মুড়ি ভেজে দিতে কেজি প্রতি ২০ টাকা নেওয়া হয়। আর নিজেদের চালসহ মুড়ি ভেজে দিলে কেজি প্রতি প্রায় ১১০ টাকা দাম রাখা হয়।

স্থানীয়দের মতে, হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ ও গন্ধ মেশিনে তৈরি মুড়ির তুলনায় আলাদা। বিশেষ করে সকালের নাস্তা, বিকেলের আড্ডা কিংবা অতিথি আপ্যায়নে এই মুড়ির চাহিদা এখনো রয়েছে।

ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিষমুক্ত হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনের সঙ্গে ঝালকাঠি জেলায় প্রায় ৫০টি পরিবার বংশ পরম্পরায় জড়িত রয়েছে।

এই পেশার মাধ্যমে গ্রামীণ সংস্কৃতি রক্ষা পাচ্ছে এবং অনেক পরিবার জীবিকার উৎস পাচ্ছে বলে জানান কুলকাঠি ইউনিয়নের যাদব দাস।

৪০ বছর ধরে মুড়ি ভাজা পেশায় কাজ করা এ ব্যক্তি বলেন, যদি সরকারি কোনো সহয়তা দেওয়া হয় তাহলে তারা এই ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিতে পারবে; না নাহলে এটিকে টিকিয়ে রাখতে কষ্ট হবে।

সরই গ্রামে মুড়ি সংগ্রহ করতে মালিপুর থেকে আসা ক্রেতা আনিচ তালুকদার বলছিলেন, “কোনো ধরনের রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান ছাড়াই সনাতন পদ্ধতিতে মাটির চুলায় এসব গ্রামে মুড়ি ভাজা হয়।

“তাই স্বাদ ও স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনায় এখানকার মুড়ির চাহিদা দিন দিন আশপাশের জেলাগুলোতেও বাড়ছে।”

ঝালকাঠি বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক আল আমীন বলেন, ঝালকাঠির এই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যকে টিকিয়ে রাখা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের জীবনমান উন্নয়নে সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।