দর্শনার্থী খরায় প্রাণ পাচ্ছে না বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর

জাদুঘরটির উদ্বোধন হয় ২০১৫ সালের ৮ জুন ।

সাইদ মেমনবরিশাল প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Sept 2022, 05:02 AM
Updated : 9 Sept 2022, 05:02 AM

মুসলিম যুগের শিলালিপি, গুপ্ত যুগের পোড়ামাটির নিদর্শন, প্রস্তর নির্মিত পাল যুগের বুদ্ধমূর্তি, গ্রামোফোন কৃষ্ণমূর্তিসহ নানা মূল্যবান ও আকর্ষণীয় পুরাকীর্তি রয়েছে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাদুঘরে দর্শনার্থীদের পদচারণা নেই। স্কুল, কলেজ শিক্ষার্থীদের আনাগোনাও খুবই সীমিত।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছে, জাদুঘরটি সমৃদ্ধ হলেও এর জনপ্রিয়তা, সক্রিয়তা ও প্রচার না পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগে কোনো কার্যালয় নেই। এটি খুলনার বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। যার কারণে এর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ বিঘ্নিত হচ্ছে।

জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, বৃহত্তর বরিশালের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার লক্ষ্যে নগরীর ফজলুল হক অ্যাভিনিউ সড়কে এতিহ্যবাহী কালেক্টরেট ভবনে গড়ে তোলা হয় বিভাগীয় জাদুঘর। খোদ ভবনটিই একটি পুরাকীর্তি। ১৮২১ সালে এটি নির্মিত হয়েছিল, ১৯৮৪ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ২০০৪ সালে ভবনটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণ শেষে এই ভবনেই স্থাপন করা হয় জাদুঘর। যার উদ্বোধন হয় ২০১৫ সালের ৮ জুন ।

“সাত বছর পূর্বে জাদুঘরের দ্বার উমুক্ত হলেও তেমন কোনো দর্শনার্থী আসে না; গড়ে দৈনিক ২০/২৫ জন দর্শনার্থী আসে।” বলেন তিনি।

দর্শনার্থী না থাকার কারণ জানতে চাইলে হাসানুজ্জামান বলেন, “জাদুঘরের জন্য যে এরিয়া প্রয়োজন, সেই এরিয়া নেই। শুধু জাদুঘর থাকলেই হবে না। সঙ্গে বিস্তৃত এলাকা, গাছপালা, পুকুর ও নিরিবিলি বসার স্থান থাকলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তো। শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখার জন্যই আর দর্শনার্থীরা আসেন না। খোলামেলা পরিবেশ পেলে এসে ঘোরাফেরা করতো, ফাঁকে জাদুঘরে প্রবেশ করতো।

“তাছাড়া প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগে কোনো কার্যালয় নেই। খুলনার বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে এর উন্নয়ন, সম্প্রসারণ হয় না। যার কারণে জাদুঘরটি উপেক্ষিত রয়েছে।”

জাদুঘরে প্রবেশ পথে দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তির একটি পান সিগারেটের দোকান রয়েছে। জাদুঘরে তেমন কোন লোকজন আসে না, তাই দোকানে তেমন কোনো বেচাকেনা নেই বলে এ দোকানির ভাষ্য।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেলোয়ার বলেন, “এখানে যে জাদুঘর আছে, সেটা অনেকে জানেই না। এ নিয়ে কোনো প্রচার প্রচারণাও নেই। প্রচার প্রচারণা চালানো হলে হয়তো জাদুঘরটি জমে যেতো।”

জাদুঘরের পরিচারক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, “জাদুঘরে প্রবেশ করতে হলে ১০ টাকা ও ৫ টাকা করে টিকেট কাটতে হয়। স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫ টাকা ও অন্যদের কাছ থেকে ১০টাকা নেওয়া হয়। আগে তো দর্শনার্থীই আসতো না। এখন একটু একটু আসতে শুরু করেছে।”

রোববার জাদুঘর বন্ধ থাকে। সোমবার বেলা ২টার পর খোলা হয়। এছাড়া সপ্তাহে সাতদিন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৯ থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে বলে জানান তিনি।

তবে বুধবার বিকাল ৩টা থেকে বন্ধের আগ মুহূর্ত বিকাল পৌনে ৫টা পর্যন্ত জাদুঘর ঘুরে মাত্র একজন দর্শনার্থীর দেখা মিলেছিলো।

উজিরপুর উপজেলার পল্লী চিকিৎসক দীলিপ নামের ওই দর্শনার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একটা কাজে বরিশাল এসেছি। দশ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে জাদুঘর ঢুকে পড়লাম। বরিশালে জাদুঘর আছে, সেটা জানতাম। কিন্তু কোথায়, সেটা জানতাম না। পরে লোকজনের কাছে খোঁজ নিয়ে এসেছি।“

দিলিপের মতে, জাদুঘর নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা না করার কারণে আড়ালে পড়ে আছে। জাদুঘরে দর্শনার্থী বাড়ানোর জন্য আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশিষ্টজনদের নিয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে অনুষ্ঠান করতে হবে। তাহলে মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়বে।

জাদুঘরের পরিবেশ ‘তেমন ভালো লাগেনি’ মন্তব্য করে বলেন, “সব কিছুতে একটা জাঁকজমক থাকতে হয়। এখানে সব কিছু কেমন জানি। ব্যাপক আলোকসজ্জা করাসহ ভবনের রঙ করে আধুনিক সাজ দিতে হবে।”

জাদুঘর ঘুরে দেখা গেছে, প্রাচীন অনেক পূরাকীর্তিতে ভরপুর রয়েছে নয়টি গ্যালারি। ১২/১৩ শতকের শিবলিঙ্গ, ১৪/১৫ শতকের শিবলিঙ্গ ও গৌরিপত্র, একাদশ/দ্বাদশ শতকের তৈরি পেঁচার উপর বসে থাকা লক্ষ্মীমূর্তি। ১১/১২ শতকের একটিসহ বেশ কয়েকটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে এ জাদুঘরে। রয়েছে প্রাচীন দেব-দেবির মূর্তি অলংকৃত ইট, বিভিন্ন প্রাচীন মুদ্রা, পাথরের তৈরি তৈষজ পত্রসহ ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী শতাধিক পুরাকীর্তির নিদর্শন।

সহকারী কাস্টোডিয়ান হাসানুজ্জামান বলেন, পুরোনো কালেক্টরেট ভবন ঔপনিবেশিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের স্মারক। এটি বাংলাদেশে নির্মিত প্রথম প্রশাসনিক ভবনও। জাদুঘরে ভবনটির ইতিহাস, স্থাপত্য শৈলীর বিবরণ, আলোকচিত্র ও নির্মাণ উপকরণসহ বিভিন্ন ধরনের নিদর্শন উপস্থাপন করা হয়েছে। দোতালায় সজ্জিত নয়টি গ্যালারিতে ফারসি হরফে উৎকীর্ণ মুসলিম যুগের শিলালিপি, গুপ্ত যুগের পোড়ামাটির নিদর্শন, প্রস্তর নির্মিত পাল যুগের বুদ্ধমূর্তি, পদ্মখচিত সুলতানি যুগের পোড়ামাটির ফলকচিত্র, মাটির সামগ্রী, তৈজসপত্র, গ্রামোফোন, আসবাব, শিবলিঙ্গ, কৃষ্ণমূর্তি, হরগৌরি মূর্তি, মহাদেব মূর্তি, ব্রোঞ্জের বদনা, পাথরের মালাসহ অনেক মূল্যবান ও আকর্ষণীয় নিদর্শন প্রদর্শনের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া রয়েছে বরিশাল বিভাগের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিচিতি। বরিশাল বিভাগের কীর্তিমানদের তথ্য ও আলোকচিত্র। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও শিল্পকলায় উপস্থাপন করা হয়েছে বরিশালের গৌরবময় সমৃদ্ধ ইতিহাস। এসব থেকে বরিশালের গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লোকজ ও শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

পুরাকীর্তিতে সমৃদ্ধ এ জাদুঘরের দর্শনার্থী খরা কাটাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে হাসানুজ্জামান বলেন, জাদুঘরের স্কুল, কলেজ শিক্ষার্থীদের আনাগোনা কম। প্রচার-প্রচারণার অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কবে দিয়েছেন সেটি মনে করতে পারেননি তিনি।

প্রয়োজনে আবারও নতুন করে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

“আগে জাদুঘরে প্রবেশের একটি পথ ছিলো। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধান সড়কের পাশে আরেকটি প্রবেশ পথ করার পর দর্শনার্থী বেড়েছে। গত ৮ মাসে জাদুঘরে ৫ হাজার ৯৪৭ জন দর্শনার্থী এসেছিলো।” বলেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক