Published : 02 Jan 2026, 01:33 AM
দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার আগের জঞ্জাল সরিয়ে সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত আনার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল চব্বিশের আন্দোলনের পর তা কতটুকু এগোল? সামনের দিনগুলোইবা কেমন যাবে?
ঘটনাবহুল একটি বছর শেষে আরেকটি বছরের শুরুতে অর্থনীতির হিসাব নিকাশে এমন প্রশ্ন আসছে ঘুরে ফিরে।
বছর শেষের হিসাবে বসলে এক কথায় বলা যায়, প্রত্যাশার যে ফানুস ডানা মেলেছিল তা খুব বেশি উড়তে পারেনি; আবার চুপসেও যায়নি একেবারে। অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণের পর দগদগে যে ঘা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল তাতে কিছুটা প্রলেপ পড়েছে ব্যাংক খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতে নেওয়া বেশ কিছু সংস্কারের পদক্ষেপে।
এখন অপেক্ষা নির্বাচনের; সবার প্রত্যাশা ভালো একটি ভোটের পর নির্বাচিত সরকার এলে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটতে শুরু করবে। তৈরি হবে কর্মচাঞ্চল্য। ঝিমিয়ে পড়া সূচকগুলো চাঙা হতে শুরু করবে।
এতে নতুন বছরে নতুন সরকারের হাতে একটি নতুন সূচনা হবে অর্থনীতির। স্থবির হয়ে পড়া প্রবৃদ্ধির জড়তা কাটবে, বিনিয়োগে যে খরা বছর দুই ধরে চলেছে তা কেটে যাবার ক্ষেত্র তৈরি হবে। কর্মসংস্থানের স্থবিরতাও দূর হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা।

তবে অর্থনীতি সবার জন্য শুভ হবে তখনই, যখন মূল্যস্ফীতির কারণে ভুগতে থাকা সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা কমবে। প্রান্তিক আর সীমিত আয়ের মানুষের কষ্ট কমবে। মানুষের জীবনে ভিন্নতা আসবে ও ঊর্ধ্বমুখী পরিবর্তন আনবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৫ এর অর্থনীতি যেভাবে শুরু হয়েছিল জানুয়ারিতে, সেভাবে বললে এটার মধ্যে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রবণতাও আছে। আবার পুঞ্জীভূত যেসব সমস্যা ছিল, সেগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
নতুন বছর কেমন যাবে সে বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ, নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক হতে শুরু করেছেন।
“আমি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির তথ্যের মধ্যে যা দেখতে পাচ্ছি।”

সংস্কার ছাপিয়ে এখন নির্বাচনে দিশা খুঁজছে অর্থনীতি
উত্তরসূরীর রেখে যাওয়া টালমাটাল অর্থনীতির হাল আরও বেহাল হয়ে পড়ে সরকার পতনের সংঘাত ও সহিংসতার ধাক্কায়; তৈরি হয় খাদের কিনারে গড়িয়ে পড়ার মত অবস্থার।
গণ আন্দোলনে ক্ষতি বাড়লেও একই সঙ্গে আগের ঘুনে ধরা অবস্থা খোলনালচে পাল্টে ফেলার সুযোগও তৈরি করে। সংস্কারের বাতাবরণে গত ১৬ মাসে কতটা পুনরুদ্ধার হয়েছে সেই হাল? বিশেষ করে সবশেষ পঞ্জিকা বছরে অর্থনীতি বেগবান হওয়ার যে আশা ছিল তা হল কতটুকু?
অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে আশা জাগলেও প্রায় দেড় বছর পর অর্থনীতি এখনও স্থবির। মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতিতে আশার আলো দেখার কথা বলছে সরকার। তবে এক্ষেত্রে এখনও পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ। তবেই সীমিত আয়ের মানুষের মুখে ফুটবে হাসি।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্বিক বিচারে অর্থনীতির জন্য শুভ একটি বছর পেতে আরও কাজ করতে হবে, আরও অপেক্ষা করতে হবে। সংস্কারের ধারা নতুন বছরেও বজায় রাখা গেলে তা গুণগত মান তৈরি করবে অর্থনীতিতে।
তারা বলছেন, নির্বাচন আয়োজনের প্রতিবন্ধকতা হটেছে, এখন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হলেই তা বিনিয়োগের পথ সুগম করবে। অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রধান উপকরণ আস্থার সংকট কাটাবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নও হতে হবে।
একই সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ মব সন্ত্রাসের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার ইতি টানাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বলছেন, একই সঙ্গে দুষ্টচক্রের কবল থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনতে সংস্কারের হালও ধরে রাখতে হবে।

কেমন গেল ২০২৫
বছর ঘুরে ফিরে তাকালে দেখা যাবে অনেক সূচকের অবস্থাই চলনসই পর্যায়ে যেতে পারেনি এখনও। কিছু পদক্ষেপে ব্যাংক খাতের দগদগে ঘা কিছুটা শুকালেও আরও করুণ হয়েছে খেলাপি ঋণের অংশ।
বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর মন্থর প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকারি ব্যয়ের অবস্থা শোচনীয়; মাস কয়েক ধরে রপ্তানিতে ভাটা ভাবাচ্ছে সবাইকে। তবে ডলার সংকট কমেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যের স্বস্তি তৈরি হয়েছে। রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রিজার্ভ বেড়েছে।
তবে বছরের মাঝমাঝি থেকে সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব বাধা ছিল, সেগুলো দূর করা যায়নি। যে কারণে উদ্যোক্তারা অনেকটা হাত গুটিয়েই বসে আছেন। তারা শুধু চলমান ব্যবসা-বাণিজ্য সচলে সচেষ্ট; এতেও অনেকে সফল হতে পারছেন না। নতুন ব্যবসায় হাত দিচ্ছেন না অনেকে। এর ফলেই বিনিয়োগ হচ্ছে না, কর্মসংস্থান থমকে আছে।
উন্নয়ক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে ধীরতা। সরকারের তরফে বড় প্রকল্প নেওয়া ও বাস্তবায়নে অনীহার কথা বারবার বলা হলেও শেষ সময়ে এসে এক প্রকল্পই নেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার; তাতে তাদের আগের অঙ্গীকার থেকে সরে আসার বার্তা মিলেছে। এ সময় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগেও সরকারের দুর্বলতা দেখা গেছে।
বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতেও রয়েছে স্থবিরতা। উল্টো আগের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়েও বড় ধরনের চাপের মুখে থাকার তথ্য মিলেছে। তবে নিয়মিত ঋণ ও বকেয়া পরিশোধ করতে পারায় বৈদেশিক বাণিজ্যে স্বস্তি এসেছে।
এসব ছাপিয়ে বছরের মাঝপথে এসে মার্কিন শুল্ক ঝড় ও শেষ দিকে এসে বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানি নিয়ে আসা নিয়েও সমালোচনা দেখা গেছে। এ চুক্তির ক্ষেত্রে ‘অসম্ভব দ্রুততা ও অস্পষ্টতার’ সঙ্গে দেশের নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বারবার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মত দেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুনত্ব আনার বিকল্প কোনো পথ নেই। আর্থিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে, মাঝপথে থেমে গেলে চলবে না।
বছরটিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাই মিশ্র প্রতিক্রিয়াই এসেছে অর্থনীতির বিশ্লেষকদের থেকে।

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, “সামষ্টিক অর্থনৈতিকের মূল্যায়নটা মিশ্র। আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে আমাদের বেশ উন্নতি হয়েছে স্বস্তিতে আছি এখন। কিন্তু অন্য দুটাতে মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক খাতের দুর্দশার ক্ষেত্রে চেষ্টা চলছে কিন্তু ফলাফলের ক্ষেত্রে এখনো আমরা অনেক দূরে।”
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলছেন, “সংস্কার নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলা হলেও আসলে সংস্কারের কার্যক্রম সেভাবে আগায়নি। খালি আমরা জানি যেকোনগুলো সংস্কার করতে হবে কী কী জিনিস লাগবে, বিভিন্ন দিকে সেগুলো হয়তো চিহ্নিত করা গিয়েছে কিন্তু এগুলো আসলে এখনো সেরকম জোরেশোরে এগুলোকে বাস্তবায়ন করার কোনো সেই অর্থে প্রয়াস দেখিনি।”
মূল্যস্ফীতির সাতসতেরো
জুলাই আন্দোলনের ধাক্কায় সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল। পরের কয়েক মাসে নীতি সুদহার বাড়ানার মত কড়া পদক্ষেপে তা কিছুটা কমলেও নভেম্বরে এ হার ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে এক বছর পর তা দুঙ্কের ঘর থেকে নিচে নেমে এসেছে অর্থনীতিকে ভোগানোর প্রধান এ সূচকের ঊর্ধ্বমুখী রাশ টেনে ধরার পদক্ষেপে।
মূল্যস্ফীতি কমতে কমতে চলতি বছরের অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ৩৯ মাসের মধ্যে ছিল সবচেয়ে কম। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় বছরের শেষ দিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ার তথ্য মিলেছে। এক মাসের ব্যবধানে শুধু খাদ্য মূল্যস্ফীতিই বেড়েছে দশমিক ২৮ শতাংশ পয়েন্ট।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, “মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিচের দিকে, কিন্তু এখনো নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের সাথে মূল্যস্ফীতির যে সম্পর্ক সেখানে জীবনমানের অবনমন সেটা কিন্তু কিছুটা অব্যাহতই থাকছে।

“আর যেহেতু নতুন কর্মসংস্থান, নতুন বিনিয়োগ এবং আমাদের বেসরকারি খাতের ঋণ হালনাগাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের যেসব লক্ষ্য ছিল সেগুলো কিন্তু আমরা অর্জন করতে এখনো পারিনি। ফলে শোভন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়াও এসব মানুষের ওপর চাপটা বেশি।”
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন খুবই সীমিত।”
ট্রাম্পের শুল্ক ঝড়ে রপ্তানি নামছে, ভয় বাড়ছে
অভ্যুত্থান পরবর্তী টানাপোড়নের মধ্যেও প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা গেছিল রপ্তানি আয়ে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্পূরক শুল্ক ঝড় বইয়ে দিয়েছে এ খাতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তিমূলক অবস্থানে এলেও এর সার্বিক রেশ পড়েছে বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ইউরোপের অর্থনীতি অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রিতে যেমন বেগ পেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে, তেমনি সবচেয়ে বড় রপ্তানির গন্তব্য ইউরোপের বাজারেও জায়গা ধরে রাখা কঠিন হয়ে গেছে।
এতে করে চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যে ঢুকে গেছে। সবশেষ নভেম্বরে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
এখন নির্বাচনকে ঘিরেই ঘুরে দাঁড়ানোর ছক কষছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজেএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “চার মাস রপ্তানি নামছে- এটা ভালো না। ডিসেম্বরে খুব বেশি ভালো হবে বলে মনে করি না। আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল এই অর্থবছর শেষ হয়ে যাওয়ার পর যেটা আগামী বছরের জুনে শেষ হবে, আমাদের টার্গেটে আমরা পৌঁছাইতে পারব বলে মনে হয় না।
“কারণ একটা নির্বাচন আছে। প্রতি নির্বাচনের সময় বায়াররা একটু সন্দিহান থাকে। কিছু অর্ডার প্লেস কম করবে। ট্যারিফের কারণে কিছু হইলো সক্ষমতা কমে গেছে, সেই কারণে আমাদের ডিক্লাইনিং ট্রেন্ড।”
অর্থনীতির বিশ্লেষক রাজ্জাক এটাকে চিন্তার বিষয় হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।

ঘুরে ফিরে আলোচনায় সেই ব্যাংক খাত
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে থেকেই দুর্দশার মধ্যে থাকা ব্যাংক খাতের করুণ থেকে করুণতর চিত্র অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে।
লুটপাটের শিকার হওয়া ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা বছরজুড়েই কাটেনি। ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা অর্থ তুলতে পারেননি গ্রাহকরা। শেষমেষ শরীয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংককে একত্রিত করে একটি ব্যাংক করা হয়েছে। সেটি গ্রাহকদের অল্প কিছু করে টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বড় অঙ্কের অর্থ পেতে অন্যদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে এ পদক্ষেপকে মন্দের ভালো হিসেবে দেখছেন অনেকেই; একেবারে না পাওয়ার চেয়ে কিছু পাওয়া যাচ্ছে- সেই বিচারে।
এগুলোর বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিয়েও টাকা দেওয়ার অবস্থা তৈরি হয়নি আরও অনেক ব্যাংকের। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তাদের তারল্য সংকট কাটেনি। এগুলোর নিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। কবে এগুলো গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিয়ে আস্থা ফিরে পাবে সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও।
তবে ডলার সংকট কেটেছে ব্যাংকগুলোতে। আমদানির পরিমাণ কমায় ব্যাংকগুলোতে ডলারের চাহিদাও কমেছে। তবে বছরজুড়ে ব্যাংক খাতে ভুগিয়েছে খেলাপি ঋণ। বাড়তে বাড়তে তা ছয় লাখ কোটি ছাড়িয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন এসে বলছে, ২০ কোটি টাকার ওপরে থাকা সব ঋণই যাচাই করা হবে।
বছরের শেষ দিকে এসে আমানতের সুদহার কিছুটা কমলেও কমছে না ঋণের সুদহার। এতে বেসরকারি খাতে ঋণের মন্দা কোনোভাবেই কাটছে না, যা প্রভাব ফেলেছে বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থানে। অর্থনীতি স্বাভাবিক ছন্দে না আসায় ঘুরে ফিরে তা চাপ বাড়াচ্ছে ব্যাংক খাতেই।
ব্যাংকগুলো থেকে যে অর্থ পাচার হয়েছে সেগুলো ফেরাতে সরকার জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও মামলা, সম্পদ জব্দ করা এখনও দৃশ্যমান কিছু হয়নি। বিদেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফেরানোর পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়াতেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, আর্থিক খাতের আতঙ্ক যেটা ছিল সেটা নাই। দুর্দশা কাটানোর জন্য কিছু আইন হয়েছে বছরজুড়ে। যেগুলো দরকার ছিল।
“(তবে) দুর্দশাটা রয়ে গেছে। এটা অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যে এটা থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন কারণ- সমস্যাটা অনেক ব্যাপক এবং গভীর। কিন্তু যেটা বাস্তবতা সেটা তো বলতেই হবে যে দুর্দশা এখনো রয়ে গেছে।”
সরকারি ব্যয় বেগবান হয়নি
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ হয়ে থাকে। উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি অর্থনীতিকে গতিশীল করার শক্তি যোগায়। প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তবে চেষ্টার পরও গতি ফেরেনি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে খরচ হয়েছে বরাদ্দের পৌনে ১২ শতাংশ অর্থ। এ হার রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে যাওয়া গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়েও কম। এটি যেমন শতাংশের বিচারে, তেমনি অর্থ খরচের দিক থেকেও।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যেমন চাঞ্চল্য নেই, তেমনি রাজস্ব আদায়েও ভাটা দেখা গেছে। এ সময় প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল তা থেকে ঘাটতি প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা।

নির্বাচন ঘিরে ছক
নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বছরজুড়েই বিনিয়োগ খড়া দেখা গেছে। বিদেশি বিনিয়োগের ধারায় যেমন ছেদ পড়েছে, তেমনি স্থানীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারণ আর নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কম দেখা গেছে উদ্যোক্তাদের। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সময় নেন তারা। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন নিয়ে কাটতে শুরু করেছে অনিশ্চয়তা।
বছরের শেষ দিকে এসে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়ায় নির্বাচনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর আশা অর্থনীতির বিশ্লেষকদের। কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতার কণ্ঠেও তেমন আভাস মিলেছে।
তবে এটি তখনই সম্ভব হবে যখন সামনের নির্বাচনটা ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হবে বলেন তারা। আগামী বছর ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কোন দিকে যাবে সেটির দিশা মিলবে এ নির্বাচনের পরই, বলছেন তারা।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ বলেন, “আমার মনে হয় ২০২৬ সাল হবে ডিফাইনিং মোমেন্ট। মাহেন্দ্রক্ষণ যেটাকে বলে। ওইটা তো হবে ফেব্রুয়ারি। আজ থেকে ৫০ বছর পরে আপনার নাতিপুতিরা যখন ইতিহাস পড়বে সেই ইতিহাসে ২০২৬ এর একটা অধ্যায় থাকবে এটা নিশ্চিত থাকতে পারেন।
“ওটা কি ভালো অধ্যায় থাকবে না কি অন্ধকারের অধ্যায় থাকবে না কি আলোর অধ্যায় থাকবে সেটা নির্বাচন কী রকম হয় (সেটির ওপর)।”
তার মতে, একটা ভালো, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলেতো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। কিন্তু এরপরও বিনিয়োগ আসলে কতটা গতি ফিরে পাবে তা নির্ভর করবে নতুন সরকার কী কর্মসূচি নেয় সেটির ওপর।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ভালো নির্বাচন করা গেলে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে। নির্বাচন ঘিরে ক্রেতারাও চিন্তা করছে, সবাই চিন্তা করছে।
তবে একটা ভালো নির্বাচনের পরও এলডিসি গ্রাজুয়েশন ঘিরে রপ্তানি আয়ে শঙ্কা জাগতে পারে বলে মনে করেন সিপিডির মোস্তাফিজুর।
এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “রপ্তানি টানা কমছে, নেগেটিভ। সো এগুলোও কিন্তু কিছুটা অশনিসংকেত। সো এটার সঙ্গে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন মিলালেতো আরও একটা আশঙ্কাজনক অবস্থার দিকে আমরা যাব।”
সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচন আর এরপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে পাওয়া কতটা সহজ হবে সেই বিষয়টা, বলেন অর্থনীতির বিশ্লেষক রাজ্জাক।