Published : 21 Sep 2025, 10:46 PM
ক্যাম্পাসে ‘পোষ্য কোটা’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন, ছাত্রসংগঠন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা- কর্মচারীদের নানাবিধ পদক্ষেপ-কর্মসূচির কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভোটাররা।
শনিবার দিন ও রাতের উত্তেজনার একপর্যায়ে ‘পোষ্য কোটা’ স্থগিতের ঘোষণা দেয় প্রশাসন। রোববার বিকালে সিন্ডিকেটও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে।
ব্কিালে এই সিদ্ধান্ত সংবাদ কর্মীদের জানাতে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসুদ বলেছিলেন, রাকসু নির্বাচন নির্ধারিত ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
তারপরই ‘পোষ্য কোটা’র সমর্থক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এর ঘোষণা দিয়েছেন।
এতে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে, আদৌ নির্বাচন যথাসময়ে হবে কিনা?
বিকালে সিন্ডিকেটের সভার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর জুবেরী ভবনে বৈঠক করেন বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার সমিতি এবং সাধারণ কর্মচারী ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা।
পরে অফিসার সমিতির সভাপতি মুক্তার হোসেন সংবাদিকদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এর কথা ঘোষণা করেন।
এ সময় তিনি বলেন, “রাবির ইতিহাসে সব থেকে লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে গতকাল। ছাত্র নামধারী কিছু সন্ত্রাসী উপ-উপাচার্যকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। সন্ত্রাসী বাহিনী উপ-উপাচার্যকে গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করে। এক সময় উপ-উপাচার্য সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন।
“এই ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা ‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ থাকব। রাকসু নির্বাচনের অন্তরায় হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড অফিসার সমিতি, সহায়ক সমিতি, পরিবহন সমিতি ও সাধারণ কর্মচারী ইউনিয়ন দ্বারা ঘটবে না।”
‘রাকসুতে দায়িত্ব পালনের প্রশ্নই আসে না’
রাতে জুবেরী ভবনে সভা করে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। এ সময় সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল আলিম এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমিরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, শিক্ষকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে সোমবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া শিক্ষকদের যারা লাঞ্ছিত করেছে, তাদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত, সকল প্রকার ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ থাকবে।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমীরুল ইসলাম বলেন, “শনিবার শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় দোষীদেরকে শাস্তির আওতায় না আনা পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করছি। কারণ, আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
রাকসুতে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আমীরুল ইসলাম বলেন, “রাকসু নির্বাচন নিয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। আমরা যেখানে নিরাপদবোধই করছি না সেখানে তো এমন একটি নির্বাচনে আমাদের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশন আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আগে আমরা অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে ভাবছি না।”
‘আন্দোলন নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’
এদিকে এমন শঙ্কার মাঝে রয়েছে ছাত্রসংগঠনগুলোও। তারা এই আন্দোলনকে ‘নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’ হিসেবেই দেখছেন।
ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী শেখ নুর উদ্দিন আবির বলেন, “‘পোষ্য কোটা’র দাবিতে যদি রাকসু নির্বাচনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আমরা তাদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করব। ৫ অগাস্টের পর আমরা তিন দিন সরকার চালাতে পারলে, রাকসুর মতো একটা নির্বাচনও পরিচালনা করতে পারব।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোজাহিদ ফয়সাল বলেন, “রাকসু নির্বাচনের আগ মুহূর্তে মীমাংসিত একটি ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসে রাকসু বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের আন্দোলনের কারণে রাকসু বানচালের পরিবেশ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
‘ক্যাম্পাস ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা’
বিকালে ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশন সম্মিলিত ‘রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ’ প্যানেল এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, “গতকালের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মাঝে ব্যাপক মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি অভিমুখে চলে গেছেন। সামনে পূজার ছুটি। অবস্থান ধর্মঘটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা ইত্যাদি বন্ধ থাকার কারণে আরো অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি চলে গেছেন এবং যাচ্ছেন।
“এতে আসন্ন রাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে এবং অংশগ্রহণমূলকভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে আমরা উদ্বিগ্ন। ফলে প্রায় ভোটার-শূন্য অবস্থায় এই রাকসু নির্বাচন একটি বিষফোঁড়া ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হয়ে থাকবে।”
পরে সন্ধ্যায় ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’ প্যানেলও সংবাদ সম্মেলন করেছে।
প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল বলেন, “শনিবারের ঘটনা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র। মীমাংসিত একটি ইস্যুকে এই মুহূর্তে সামনে আনার অন্য কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বাসায় চলে যাচ্ছে। এতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে আমরা শঙ্কিত। প্রশাসনকে আমরা বলবো দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করে ক্লাস-পরীক্ষা চালু করতে।”
এসব বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম বলেন, “‘পোষ্য কোটা’ পুনর্বহাল রাকসু নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয়। রাকসু নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের প্রার্থী কিংবা ভোটার- কেউ এ ইস্যুর সঙ্গে জড়িত নয়। আমি মনে করি, প্রশাসন বিষয়টি এমনভাবে সামাল দেবে যাতে নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব না পড়ে।”
আরও পড়ুন:
রাবির সিন্ডিকেটেও ‘পোষ্য কোটা’ স্থগিতের সিদ্ধান্ত, ‘রাকসু যথাসময়ে’
'পোষ্য কোটা': কর্মবিরতিতে রাবি শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী
'পোষ্য কোটা': রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ধস্তাধস্তি, উত্তেজনা
‘পোষ্য কোটা’: অবরুদ্ধ রাবির প্রোভিসি-প্রক্টর-রেজিস্ট্রার, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
'পোষ্য কোটা': মধ্যরাতে হল থেকে বেরিয়ে রাবির ছাত্রীরাও আন্দোলনে