Published : 24 May 2026, 10:28 AM
পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধাবস্থার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কুয়েতের কোরবানির পশুর হাটে। আন্তর্জাতিক রুটে অস্থিরতা ও পণ্য পরিবহনে নানাবিধ জটিলতার কারণে দেশটিতে এবার চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পশু আমদানি করা সম্ভব হয়নি।
আমদানির এ ঘাটতির ফলে বাজারের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পশুর দামের ওপর। কুয়েতের ক্যাব্দ এলাকায় গরু বিক্রি করতে আসা প্রবাসী রহিম উদ্দিন বাজারের এ তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বাগমারা গ্রামের এ বাসিন্দা লক্ষ্য করেছেন যে, বাজারে পশুর সরবরাহ কম থাকলেও মূলত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রবাসীরাই তাদের ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এই চড়া দামের বাজারেও কোরবানি দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে পশুর সংকট ও আকাশছোঁয়া দামের কারণে হাটের সেই চেনা কোলাহল এবার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
বাজারের এ প্রতিকূল পরিস্থিতির চিত্র আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসে কুয়েতে সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করা প্রবীণ প্রবাসী আবু সাইদ কুতুবউদ্দিনের কথায়। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার টিবি হাসপাতাল রোডের এ বাসিন্দা বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “ঈদের মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও বাজারে এখন পর্যন্ত ক্রেতাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশ কম।”
“চড়া দামের কারণে মানুষ হাটে এলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অধিকাংশ ক্রেতাই এখন মূলত বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পশুর দাম ও তাদের সাধ্যের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকেরই প্রত্যাশা, যদি দাম কিছুটা কমে তবেই তারা পশু কিনবেন, অন্যথায় ঈদের ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করার পরিকল্পনা করছেন।”

পশুর এ মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ প্রবাসীদের পকেটে যে বড় ধরনের টান দিচ্ছে, তা আক্ষেপের সঙ্গে তুলে ধরেছেন ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা ও কুয়েতের ‘বিগ বাজার’ দোকানের স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী বাহার উদ্দিন। প্রায় দুই যুগ ধরে কুয়েতের বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এ ব্যবসায়ী জানান, বর্তমান বাজারে পশুর যে দাম হাঁকানো হচ্ছে, তাতে মধ্যবিত্ত বা নিম্নআয়ের সাধারণ প্রবাসীদের পক্ষে এককভাবে একটি গরু কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে হাটে একেকটি গরুর সর্বনিম্ন দামই শুরু হচ্ছে ৪০০ কুয়েতি দিনার থেকে, যা পশুর মান ও আকারভেদে দেড় হাজার কুয়েতি দিনার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকছে। শুধু গরুই নয়, প্রবাসীদের কোরবানির অন্যতম প্রধান মাধ্যম দুম্বার দামও গতবারের তুলনায় এবার অনেক বেশি।
এ পরিস্থিতিতে সামর্থ্যবানরা চড়া দামেই পশু কিনলেও সাধারণ প্রবাসীদের বাজেট ও বাজারের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
আমদানি সংকটের কারণে তৈরি হওয়া এ অস্থিতিশীলতাকে ‘বাজারে আগুন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সিলেটের ছাতক উপজেলার বাসিন্দা আকতার হোসেন। কুয়েতে প্রায় দুই যুগ কাটানো, পেশায় সোফা ব্যবসায়ী এ বাংলাদেশি জানান, বাজারের বর্তমান শোচনীয় অবস্থার কারণে সাধারণ ক্রেতারা হাটে গিয়ে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
তবে তিনি প্রবাসীদের জীবনের অন্য একটি বাস্তব দিকও তুলে ধরেন। তার মতে, অনেক প্রবাসী এখন প্রবাসে অর্থ ব্যয় না করে দেশের বাড়িতে পরিবারের কাছে কোরবানির টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন, ফলে প্রবাসে নিজেদের আলাদাভাবে কোরবানির প্রয়োজন বোধ করছেন না।

আকতার হোসেন আরও যোগ করেন, এবার প্রবাসীদের সংকট যেন চতুর্মুখী; একদিকে চড়া দামের কারণে বিমানের টিকিট কাটতে না পেরে অনেকে দেশে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে মন ভালো করতে পশুর হাটে এসেও আকাশচুম্বী দামের ধাক্কায় তাদের মনে কোনো শান্তি নেই।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ প্রবাসীদের জন্য মানসিক ও আর্থিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার থেকে দূরে থাকার এ যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জের বাসিন্দা লিটন আহমেদ। প্রায় দেড় যুগ ধরে কুয়েতের মাহবুলা এলাকায় বসবাস করা এ প্রবাসী তার বর্তমান পারিবারিক পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
তিনি জানান, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানের পরিবর্তিত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে চাইলেও তিনি তাদের আর কুয়েতে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না, আবার কর্মক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতায় নিজেও দেশে যেতে পারছেন না।
এমন এক নিঃসঙ্গ ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও ধর্মীয় রীতিনীতি ও মানসিক প্রশান্তির জন্য লিটন আহমেদ কুয়েতেই কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে বাজারের লাগামহীন পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে তিনি আরও কিছুটা সময় নিয়ে দামের সামঞ্জস্য বুঝে একটি গরু কিংবা দুম্বা কেনার অপেক্ষায় আছেন।