০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা শুরু: বিশ্বসাহিত্য ও প্রকাশনার মঞ্চে বাংলাদেশ

মেলার ৭৮তম আসর ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা অঙ্গন।

ফাতেমা রহমান রুমা, জার্মানি থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Oct 2026, 02:19 PM

Updated : 08 Oct 2026, 02:19 PM

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লেখক, প্রকাশক, অনুবাদক, সাংবাদিক ও সাহিত্যপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক বইমেলা ফ্রাঙ্কফুর্টের বুখমেসে ২০২৬-এর ৭৮তম আসর ঘিরে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা অঙ্গন।

বুধবার শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এ আয়োজন চলবে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। বই প্রদর্শন ও বিক্রির পাশাপাশি অনুবাদস্বত্ব, কপিরাইট, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা চুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যতের প্রকাশনা শিল্প নিয়ে নানা আলোচনা ও মতবিনিময়ে সরব হয়ে উঠেছে মেলার প্রাঙ্গণ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য সংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও প্রকাশনা শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্রে। প্রতিবছর এই মেলাকে ঘিরে সম্পন্ন হয় অসংখ্য কপিরাইট ও অনুবাদস্বত্বের চুক্তি, গড়ে ওঠে নতুন প্রকাশনা অংশীদারত্ব এবং বিস্তৃত হয় বিভিন্ন দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পারস্পরিক যোগাযোগ।

এবারের মেলায় গেস্ট অব অনার হিসেবে রয়েছে চেকিয়া বা চেক প্রজাতন্ত্র । ‘চেকিয়া – অ্যা কান্ট্রি অন দ্য কোস্ট’ প্রতিপাদ্যে দেশটি তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভিন্ন এক নান্দনিক ভাবনায় বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে। সমুদ্রবিহীন চেকিয়াকে সাহিত্যিক কল্পনার মাধ্যমে ‘সমুদ্রতীরের দেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দেশটির প্যাভিলিয়নে প্রায় ৭৫ জন লেখকের অংশগ্রহণের পাশাপাশি কবিতা, কমিকস, ইলাস্ট্রেশন এবং শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে রয়েছে নানা আয়োজন।

এবারের মেলায় বই ও সাহিত্যের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে অনুবাদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ, নারীর অংশগ্রহণ এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়। মেলার বিভিন্ন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সেমিনার, আলোচনা, মতবিনিময় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এই বৈশ্বিক আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছে বাংলাদেশও। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টল এবার পরিচালনা করছে বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাস। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচিত বইগুলো মেলায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রকাশনা অঙ্গনে দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ফ্রাঙ্কফুর্টের মতো আন্তর্জাতিক বইমেলায় দেশের প্রকাশকদের সরাসরি অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রকাশকদের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলে বাংলা বইয়ের কপিরাইট ও অনুবাদস্বত্ব আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্যকর্ম বাংলায় অনুবাদের সুযোগও বাড়বে।

অঙ্কুর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মেজবাহ উদ্দিন আহমদ ১৯৮৬ সাল থেকে নিয়মিত ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশ নিচ্ছেন। তিনি জানান, প্রায় চার দশকের এই মেলার সঙ্গে তার পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে। তিনি মূলত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখকদের বইয়ের কপিরাইট ক্রয় এবং পছন্দের বই সংগ্রহের জন্য প্রতিবছর এ মেলায় আসেন।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক জানান, বাংলাদেশি প্রকাশকদের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশগ্রহণের ইতিহাস কয়েক দশকের। ২০১৩ সালে পাঞ্জেরীর পক্ষ থেকে প্রথমবার মেলায় অংশ নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকাশকদের যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে প্রকাশকদের নিজস্ব অর্থায়নে অংশগ্রহণের পর ধীরে ধীরে সরকারি সহযোগিতাও যুক্ত হয়।

কামরুল হাসান শায়কের মতে, “আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের সহযোগিতা ও প্রকাশকদের পেশাগত অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটলে বাংলা প্রকাশনা শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।”

বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বী জানান, এবারের অংশগ্রহণ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কিছুটা ভিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ন্যাশনাল বুক সেন্টারের পরিবর্তে বাংলাদেশ দূতাবাস এবার মেলার স্টল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিত বইগুলো সেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং মেলা চলাকালে দূতাবাসের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।

কবি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী সজল আহমেদ জানান, ২০১৯ সাল থেকে তারা নিয়মিত ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশ নিচ্ছেন। তার মতে, “বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি বিদেশি সাহিত্যও বাংলায় অনূদিত হওয়া প্রয়োজন। কপিরাইট ক্রয়-বিক্রয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা এ ধরনের উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে।”

জার্মানিতে বসবাসরত লেখক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের অভিজ্ঞতাও বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। ২০০৩ সালে জার্মানিতে আসা এই লেখকের প্রথম উপন্যাস ‘স্বর্ণ কন্যাদের কথা’ জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বইটি পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার পর তিনি শিশুতোষ সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার প্রাঙ্গণে তাই এবারের আলোচনায় শুধু নতুন বই বা প্রকাশনা নয়, গুরুত্ব পাচ্ছে ভাষান্তর, কপিরাইট ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বৃহত্তর পরিসর। বাংলাদেশের প্রকাশকদের অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, প্রয়োজন আরও পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ধারাবাহিক অংশগ্রহণের।