০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

‘পূর্বজন্মের পাপ’: বিএনপি নেতার ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে পুলিশ-প্রেস মিনিস্টার বাহাস

মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক লিখেছিলেন, “পূর্বজন্মে বিরাট পাপ করলে এই জনমে মানুষ বিএনপি করে।” এরপর আলোচনার সূত্রপাত।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Nov 2026, 11:11 PM

Updated : 03 Nov 2026, 11:11 PM

দল নিয়ে কুষ্টিয়ার এক বিএনপির নেতার হতাশা প্রকাশের ফেইসবুক পোস্টের পর দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার এবং কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া কৌতুহল তৈরি করেছে।

কুষ্টিয়ার খোকসা বিএনপির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক সোমবার দুপুরে এক ফেইসবুক পোস্ট দেন, যা নিয়ে এই আলোচনার সূত্রপাত।

সেখানে তিনি লেখেন, “পূর্বজন্মে বিরাট পাপ করলে এই জনমে মানুষ বিএনপি করে।”

ঘণ্টাখানেক পর ওই পোস্ট শেয়ার করে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার সাইদুর রহমান ফেইসবুকে লেখেন, মোস্তাককে গ্রেপ্তার করার জন্য নাকি পুলিশের ওপর ‘চাপ’ আছে। আর সেই চাপ দিচ্ছেন আরেক বিএনপি নেতা।

এরপর রাতে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের ফেইসবুক পেইজ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাইদুর রহমানের তোলা অভিযোগকে ‘অসত্য’ দাবি করে প্রতিবাদ জানানো হয়। পাল্টা পোস্টে এর জবাব দেন সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, সরকারের বদনাম হয়, এমন কোনো কাজ করা ‘উচিত নয়’।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাক কেন বিএনপি করাকে এখন ‘পাপ’ মনে করছেন?

এর একটি ব্যাখ্যা দিয়ে সাইদুর রহমান তার প্রথম পোস্টে লিখেছিলেন, “মোস্তাক ভাইয়ের পোস্ট দেখে খুবই বিস্মিত হয়ে ভাইকে ফোন দিলাম, ভাই জানালেন তাকে গ্রেফতারের জন্য বিএনপির নেতার পক্ষে খুলনার ডিআইজিকে একটি বিশেষ মহল থেকে নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমান কুষ্টিয়ার এসপি নাকি মোস্তাক ভাইয়ের গ্রেফতার ইস্যুতে প্রচন্ড চাপে আছেন।

“এই গ্রেফতারের নির্দেশনার কারণ জানতে চাইলে ভাই বললেন, তিনি সারের ডিলারশীপের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পাননি। পরবর্তীতে তিনি বিক্ষুদ্ধ হয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কার্যালয় ঘেরাও করেন। এটাই তার অপরাধ।

“এই অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি নাকি চরমপন্থীদের শেল্টার দিচ্ছেন। এক প্রকার বর্তমানে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। উনার একটাই বক্তব্য, দল ক্ষমতায় আসার পরেও কেন আমরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছি না! খুবই কষ্টের এবং ভারাক্রান্ত মনে কথাগুলো বলেছেন মোস্তাক ভাই।”

দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সাংবাদিক সাইদুর রহমান বলেন, “মোস্তাক ভাইয়ের সাথে কথা বলে যেটি বুঝলাম, বিগত সময় কুষ্টিয়ার রাজনীতি ছেড়ে যারা সুখে শান্তিতে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন, সেই তথাকথিত রাজনীতিকরা বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারাই সরকারের বদনাম করছেন।

“অথচ এই মোস্তাক ভাইয়েরাই ছিলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক। কতবার যে আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন লোকটি তার কোন হিসাব নেই।”

তবে তার বক্তব্য নিয়ে আপত্তি তুলে ফেইসবুকে প্রতিবাদ জানায় খুলনা জেলা পুলিশ।

সোমবার রাতে পুলিশের সেই বিবৃতিতে বলা হয়, Saidur Rahman ফেইসবুক আইডি থেকে দেওয়া ফেইসবুক পোস্টে যে চাপের কথা বলা হয়েছে, তা ‘অসত্য’।

“মাননীয় রেঞ্জ ডিআইজি, খুলনা মহোদয় ও পুলিশ সুপার, কুষ্টিয়া মহোদয়কে নিয়ে এরুপ অসত্য সংবাদ প্রচার করায় কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং উক্ত বিষয়ে মাননীয় রেঞ্জ ডিআইজি, খুলনা মহোদয় এবং পুলিশ সুপার, কুষ্টিয়া মহোদয় অবগত নন।”

পরে পুলিশের ওই বিবৃতির স্ক্রিনশট শেয়ার করে আরেক ফেইসবুক পোস্টে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন সাইদুর রহমান।

তিনি লেখেন, আগের ফেইসবুক পোস্টে তিনি যা বলেছেন, তা তার নিজের কথা নয়। মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক তাকে যা বলেছেন, সেটাই তিনি লিখেছেন।

তার ভাষ্য, “পুলিশকে হেয় করবার জন্য নয়। শুধু সঠিক তথ্য তুলে ধরেছি মাত্র। এখানে ডিআইজি মহোদয়ের কোন সম্পৃক্ততা নেই সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।”

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার সাইদুর বলেন, পুলিশের ওই বিবৃতি দেখার পর তিনি আবারও মোস্তাকের সঙ্গে কথা বলেছেন।

“উনি যে ফেসবুক পোস্ট করেছেন তার আগে এসপির সাথে দেখা করেন। এসপি অফিসে থাকাকালীন পোস্ট করেন (সিসি ক্যামেরায় সব সংরক্ষিত আছে)। মোস্তাক ভাই জানান, তিনি আমাকে যে তথ্য দিয়েছেন সেটি এসপি সাহেব তাকে বলেছেন।

“তবে এসপি সাহেব মোস্তাক ভাইয়ের সাথে ভদ্র ব্যবহার করেন। ডিআইজির নির্দেশনার কথা এসপি সাহেবই মোস্তাক ভাইকে জানান। এসপি মোস্তাক ভাইকে আরো বলেন, ‘ওই নেতার সাথে ঝামেলা মিটিয়ে নেন। আপনার বাসায় ফোর্স পাঠাতে হবে। তখন আপনার বাসায় থাকার দরকার নাই। তিনি প্রচন্ড চাপে আছেন’।"

সাইদুর রহমান লিখেছেন, “মোস্তাক ভাই আরো জানান, শুক্রবার এসপির বাসায় একজন নেতা দেখা করে তাকে গ্রেফতারের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কৌশলগত কারণে ওই নেতার নাম উল্লেখ করছি না। এদিকে, রাতে কুষ্টিয়া জেলার সম্মানীত এসপি মহোদয়ের সাথে কথা বললে তিনি মোস্তাক ভাইয়ের বক্তব্য অস্বীকার করেন। বলেন, এই ধরণের কোন ঘটনা ঘটেনি।

“দুপুর ১টার দিকে মোস্তাক ভাই পান্জাবী পরিধান করে এসপি অফিসে যান। তার মোবাইল ট্র্যাকিং কল কিন্তু এসপি অফিস মার্ক করেছে। মোস্তাক ভাই যে এসপি অফিসে যান সেটি সবাই জানেন। মোস্তাক ভাই যে এসপি অফিসে যান সেটি সিসিটিভির ফুটেজেও আছে। একইসাথে এসপির বাসায় নেতার বৈঠকও কিন্তু সিসিটিভির ফুটেজে থাকবে।”

কী নিয়ে কে চাপ দিচ্ছে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পুলিশকে চাপ দিচ্ছেন স্থানীয় একজন বিএনপি নেতা, যিনি একজন সাবেক এমপি।

“গতকাল পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম আমাকে তার দপ্তরে ডেকে নিয়ে বলেছেন, ‘বিষয়টি তার (সেই বিএনপি নেতা) সাথে ঠিকঠাক করে নেন। না হলে আপনাকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে আমার উপর চাপ আছে।’

“জবাবে আমি বলেছি, দেখুন আমি কোনো অন্যায় করিনি, সে কারণে কারো কাছে নত হয়ে সব অন্যায়কে মেনে নিতে পারব না। আপনি যেটা ভালো মনে করেন করুন। আমি আমার সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি দলের জন্য। এখন যেহেতু এখানে অবস্থান থেকে সার্বক্ষণিক রাজনীতির সাথে যুক্ত আছি, সে কারণে একটা সারের লাইসেন্স পাওয়ার আবেদন করেছিলাম। এটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে তাহলে আমি সেটা করেছি।”

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,

তার সঙ্গে এ জাতীয় কোনো কথা বা বাক্য বিনিময় হয়নি।

[এই প্রতিবেদনে ফেইসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া বক্তব্যগুলো হুবুহু প্রকাশ করা হয়েছে, কোনো বানানও সংশোধন করা হয়নি]