জজ আদালতেও জামিন মেলেনি ফখরুলের

গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের পরদিন থেকেই মির্জা ফখরুল কারাগারে।

আদালত প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Nov 2023, 09:35 AM
Updated : 22 Nov 2023, 09:35 AM

প্রধান বিচারপতির বাসভবনে ভাঙচুরের মামলায় কারাগারে থাকা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জজ আদালতেও জামিন পাননি।

বুধবার দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক ফয়সল আতিক বিন কাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

এদিন বেলা ২টা ৪০ মিনিটে ফখরুলের জামিন শুনানি শুরু হয়; চলে ৩টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত। শুনানির জন্য ফখরুলকে এদিন আদালতে আনা হয়নি। গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের পরদিন থেকেই তিনি কারাগারে আছেন।

ফখরুলের পক্ষে জামিন শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার, মো. আসাদুজ্জামান ও বদরুদ্দোজা বাদল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আবু এবং প্রসিকিউশন পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. মুত্তাকিন।

জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘সরকার পতনের’ এক দফা দাবিতে ২৮ অক্টোবর সমাবেশ ডেকেছিল বিএনপি। ২০ শর্তে তাদের সমাবেশের অনুমতি দেয় পুলিশ।

সেদিন দুপুরের আগে নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ শুরুর পর কাছেই কাকরাইল মোড়ে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। শান্তিনগর, নয়াপল্টন, বিজয়নগর, ফকিরাপুল, আরামবাগ এবং দৈনিক বাংলা মোড় এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়।

সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ হাসপাতালে ঢুকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়, ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ করা হয় আরো ডজনখানেক যানবাহন। হামলা করা হয় প্রধান বিচারপতির বাসভবনে।

দৈনিক বাংলা মোড়ে পুলিশ কনস্টেবল আমিরুল ইসলাম পারভেজকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সংঘাতে প্রাণ যায় যুবদলের মুগদা থানার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা শামীম মোল্লার।

সংঘর্ষের মধ্যে পণ্ড হওয়া সমাবেশ থেকেই পরদিন সারাদেশে হরতালের ডাক দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২৯ অক্টোবর সেই হরতালের সকালে গুলশানের বাসা থেকে ফখরুলকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

সেদিন রাতে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে ভাঙচুরের ঘটনায় রমনা থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ফখরুলকে আদালতে তোলা হয়। শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম শফি উদ্দিন জামিন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, সেদিন মহাসমাবেশে আসা বিএনপি নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা, লোহার রড, ইট পাটকেল ও ককটেলসহ বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্রেসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে ‘বেআইনি সমাবেশ ঘটিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান’ দেয় এবং মিছিল করতে থাকে। ওই সময় তারা বৈশাখী পরিবহনের বাসসহ একাধিক বাস, পিকআপ ভাঙচুর করে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি করে।

মিছিলকারীরা বিএনপির ‘শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নির্দেশে পরিকল্পিতভাবে’ রাস্তায় জনসাধারণ ও যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যানবাহনের ক্ষতিসাধন, জনমনে আতঙ্ক, ত্রাস সৃষ্টি করে পুলিশের সরকারি কাজে বাধা দেয় এবং হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুলিশ সদস্যদের আহত করে।

তারা প্রধানবিচারপতির সরকারি বাসভবনের পূর্ব পাশের গেইট ভেঙে অনধিকার প্রবেশ করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। নামফলকসহ ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধন করে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।

শুনানিতে যা হল

ফখরুলের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান শুনানিতে বলেন, “প্রসিকিউশন নিশ্চয় একটি পুস্তক পড়েছেন, সেটি বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। সেখানে তিনি বলেছেন, তাকে বিনাদোষে ডিবি অফিসে বসিয়ে রাখা হয়। উনার আইনজীবীর সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তান আমলের মত পলিটিক্যাল পরসিকিউশন ভয়ঙ্কর অবস্থা ধারণ করেছে।”

এ আইনজীবী বলেন, “এ মামলায় ১২টি ধারা রয়েছে, তার মধ্যে ৭টি বেইলেবল আর চারটি ননবেইলেবল। এই চারটির কোনো একটিতে যদি মির্জা ফখরুল পড়েন, তবে আমি তার পক্ষে জামিন আবেদন উইথড্র করব।”

মামলার ঘটনার সময়, মামলা দায়েরের সময়, জব্দ করা জিনিসপত্রের ‘অসঙ্গতি’ তুলে ধরে আসাদুজ্জামান বলেন, “মামলাসহ সব কিছু আগে থেকে রেডি করা ছিল।”

আসামির আরেক আইনজীবী মাসুদ আহমেদ শুনানিতে বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। কথিত ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের কাউকে এ মামলায় সাক্ষী করা হয়নি, যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের ঢাকায় কোনো ঠিকানা নাই।

“মির্জা ফখরুল অসুস্থ, ৮১ বছর বয়স, হার্টে চারটা ব্লক আছে। এছাড়া যে বাড়িতে আক্রমণের কথা বলা হচ্ছে, সেটি একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। সেখানে কেউ বাস করেন না। তাকে জামিন দেওয়া হোক।”

এরপর আইনজীবী বদরুদ্দোজা বাদল শুনানি করেন। তিনি বলেন, “প্রধান বিচারপতির বাসায় হামলার মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে, যাতে তিনি জুডিশিয়ারিতে কোনো সহানুভূতি না পান।”

অন্যদিকে ফখরুলের জামিনের বিরোধিতা করেন মহানগর পিপি আব্দুল্লাহ আবু। তিনি বলেন, “আসামি হওয়ার জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন হয় না, নির্দেশনা বা ওই কাজের জন্য প্ররোচিত করলেও তিনি মামলার আসামি হবেন।”

মাসুদ আহমেদের যুক্তি খণ্ডন করে রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, “ওটি পরিত্যক্ত বাড়ি নয়। প্রধান বিচারপতি হয়ত সেসময় বাড়িতে ছিলেন না।”

প্রায় ৪০ মিনিট দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারক ফয়সল আতিক বিন কাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।পরে পেশকার ফয়েজ আলম সবাইকে জামিন নামঞ্জুরের আদেশ পড়ে শোনান।

এরপর বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ফখরুলের মুক্তিচেয়ে আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেন।