বিএনপি ও মিত্র দলগুলোর নেতারা বলছেন, এটা আন্দোলনের ‘কৌশল’।
Published : 22 Dec 2022, 11:59 PM
ভোটের আগে জোট গড়া কিংবা আন্দোলনের জন্য জোট গড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই দেখা যায়; তবে এবার ভোটের আগে আন্দোলনে নামা বিএনপি হাঁটছে ভিন্ন পথে।
তারা জোট ভেঙেছে, যুগপৎ কর্মসূচিই তাদের এবারের কৌশল বলে দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। আর জোট ভেঙে গেলেও অন্য দলগুলোর নেতারা বিএনপিকেই ‘মুরুব্বি’ মানছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইন ফ্যাক্ট, এখন ২০ দলীয় জোট ওইভাবে নাই। এখন আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলা।”
নজরুল ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই জোটের ১২টি দল বৃহস্পতিবারই নতুন জোটের ঘোষণা দেয়, যেখানে বিএনপি নেই।
বিএনপির শরিকরা এল ‘১২ দলীয় জোট’ নিয়ে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনও দেখা গেছে নানা সময়ে। এইচ এম এরশাদের পতনে তিন জোট এক হওয়ার আগে আট দল, সাত দল ও পাঁচ দল যুগপৎ আন্দোলনই চালিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলনেও যুগপৎ কর্মসূচিতে এসেছিল অন্যান্য দল।
এরপর আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি গঠন করে চারদলীয় জোট, সেই জোটের পরিসর বেড়ে ২০১২ সালে ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। তবে ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে ২০ দলীয় জোটকে নিষ্ক্রিয় রেখে বিএনপি কামাল হোসেনকে নেতা মেনে গড়ে তোলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
নির্বাচনের হারের পর সেই জোট থিতিয়ে গেলেও ২০ দলীয় জোটও আর পুনরুজ্জীবিত হয়নি। তা নিয়ে শরিক দলগুলোর নেতাদের অভিযোগের তীর ছিল বড় দল বিএনপির দিকেই।
জোট অকার্যকর রাখার অভিযোগ মাথায় নিয়েই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটাতে যুগপৎ আন্দোলনের জন্য মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এই বছরের মাঝামাঝি থেকে সংলাপ শুরু করে বিএনপি।
এরপর সরকার পতনের ১০ দফা এবং ২৭ দফা কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করে যুগপৎ আন্দোলনের কথাই বলছিলেন বিএনপি নেতারা।
তার পরপরই বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিএনপির জোট শরিক ১২টি দলের নেতারা নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এই জোটে বিএনপি নেই।
তবে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকবেন বলেই জানিয়েছেন ১২ দলের নেতারা।
১২ দলীয় জোটের ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, “এদেশের সর্ববৃহৎ বিরোধী দল বিএনপির সাথে আমাদের যে ঐক্য, যে সমঝোতা, যে হৃদয়ের বন্ধন, তা অটুট থাকবে যেমন আগে ছিল, এখনও তেমনি আছে।”
যুগপৎ আন্দোলনকে একটি কৌশল হিসেবে দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমরা আরও বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার জন্য প্রকৃত প্রস্তাবে দেশের সব কয়টি রাজনৈতিক দল, যারা এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরোধী, তাদেরকে এক কাফেলায় শামিল করার জন্য একটু ভিন্ন পথ এবং কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।”
কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, “বিএনপি আমাদের প্রধান মুরুব্বি। তাদের কাছ থেকে আমাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, পরিকপক্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের ঘোষিত ১০ দফা এবং ২৭ দফার সমর্থনে আমাদের এই প্রচেষ্টা।”
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে বরাবরই ডানপন্থি দলগুলোর আধিক্য ছিল। সাত দল থেকে ২০ দল বরাবরই তাই দেখা গেছে। নবগঠিত ১২ দলীয় জোটে রয়েছে- জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), কল্যাণ পার্টি, লেবার পার্টি, জাতীয় দল, বাংলাদেশ এলডিপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক দল-জাগপা (তাসমিয়া প্রধান), এনডিপি, এলডিপি (সেলিম), মুসলিম লীগ, জমিয়াতে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক পার্টি এবং সাম্যবাদী দল (একাংশ)।
এই জোট গঠন নিয়ে বিএনপি নেতা নজরুল বলেন, “এই আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য যে যেভাবে পারেন চেষ্টা করছেন। অনেকে যারা একা একা মনে হয়, তারা হয়ত চিন্তা করছেন যে এভাবে করলে তারা ভালো কিছু করতে পারবেন।”
ঢাকার সমাবেশ থেকে বিএনপি দিল ১০ দফা
বিএনপির ২৭ দফা রূপরেখা: টানা দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয়
গত নির্বাচনের আগে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থিদের দিকে বিএনপির ঝোঁক লক্ষ্য করা গেছে, এখন যুগপৎ আন্দোলনে বাম দলগুলোকেও চাইছে তারা। দৃশ্যত সেই কারণে নিজেদের জোটভুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে নীরব রয়েছে তারা।
বিএনপির সঙ্গে সংলাপের পর সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে মাঠে সরব হয়েছে বাম ও গণতান্ত্রিক দলগুলোর একটি মোর্চা ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। যেখানে বাম গণতান্ত্রিক জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া গণসংহতি আন্দোলন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে রয়েছে আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
বিএনপি নেতা নজরুল বলেন, “বাম ও গণতান্ত্রিক দলগুলো নিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ হয়েছে। এখন এনারা ১২ দলীয় জোট করেছেন। আবার শুনেছি, সাত দলের আরেকটা জোট হয়ত হবে।
“এসব জোট ও রাজনৈতিক ভাগাভাগির উদ্দেশ্য ‘এই ফ্যাসিস্ট অনির্বাচিত অবৈধ’ সরকারের পতন ঘটিয়ে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এসব দাবির ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য হওয়ার পরেই যুগপৎ আন্দোলন শক্তিশালী করতে এই চেষ্টা বলুন বা উদ্যোগ বলুন এর অংশ হিসেবে এসব (নতুন মোর্চা) হচ্ছে হয়ত।”
বিএনপি নেতারা বলছেন, ১০ দফা দাবিকে ভিত্তি করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করতেই ‘একক জোট’ নয়, বরং ‘বহু জোট’ নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে ‘যুগপৎ আন্দোলন’ গড়ে তুলতে চান তারা।
গত ৮ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এখন আর কোনো জোট নয়। আমরা যুগপৎ আন্দোলনে আছি।”
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা জানান, তারা ১৪ দফা দাবি তুললেও বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকবেন। বিএনপির ১০ দফার সঙ্গে তাদের রয়েছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাসহ দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তনের মতো দাবি।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারবিরোধী যে কোনো দল ও জোট এই যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত হতে পারে, কোনো বাধা নেই। আমরা মনে করি, যে নতুন জোট এই আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে তাতে আন্দোলন আরও বেগবান হবে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এখন যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে কাজ করছি। এর বাইরে ভিন্ন কোনো চিন্তা আমাদের নেই।”