Published : 31 Jul 2026, 08:24 PM
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের ‘সংখ্যালঘু’ না ভেবে অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, “নিজেকে ছোট করবেন না। আপনাদের অধিকার আপনাদেরই নিতে হবে। চিৎকার করে বলতে হবে ‘দিস ইজ মাই রাইট’।”
শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি সংগঠন আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বক্তব্য রাখছিলেন।
বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, “আমাদের নেত্রী বলতেন, ‘আমি কখনোই আপনাদের সংখ্যালঘু মনে করি না। আপনারা এ দেশের সন্তান, এ দেশে সমান অধিকার আপনারও যা, আমারও তা।’ এই কথাটা মাথায় রাখতে হবে। আপনারা যদি অধিকারের কথা চিৎকার করে না বলেন, তাহলে পিছিয়ে থাকতে হবে।”
ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সকল ধর্মের মানুষের চমৎকার একটি সম্মিলন। হাজার বছর ধরে সব ধর্মের মানুষ এখানে বাস করছেন এবং এটাই আমাদের ভূখণ্ড। ধর্মকে কেন্দ্র করে এখানে বিভাজনের প্রশ্ন কখনোই আসা উচিত নয়।”
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, “আমরা সরকারে আসার পর এটুকু বলতে পারি- অত্যন্ত সচেতনভাবে সকল ধর্মের মানুষের অধিকার ও সম্পদ সুরক্ষার জন্য সব রকম ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করেছি।
“আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, গত দুর্গাপূজায় বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আপনাদের সঙ্গে থেকেছেন, যাতে কোনো দুর্বৃত্ত সমস্যা তৈরির সুযোগ না পায়। ইসকনের রথযাত্রা অনুষ্ঠানে আমি নিজে গিয়েছিলাম। ঠাকুরগাঁওয়ে হয়েছে, ধামরাইয়ের রথযাত্রায় আমাদের চিফ হুইপ এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সরকার সবসময়ই আপনাদের সঙ্গে থাকছে, যাতে আপনারা নিরাপদ বোধ করেন।”
তিনি বলেন, “আপনারা শুনেছেন, প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের মধ্যে একজন বিশেষ সহকারী নিযুক্ত করেছেন, আপনাদের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে কাজ করার জন্য। ইতিমধ্যে অন্যান্য সম্প্রদায় বা সমিতিগুলোর সঙ্গে আমরা অনেকবার বসেছি। আপনাদের সঙ্গে আজ হয়তো প্রথম বসছি, কিন্তু অনেকগুলো গোষ্ঠীর সঙ্গেই আমরা সবসময় আলোচনা করেছি।”
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি যাদের মনোনয়ন দিয়েছেন তাদের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী, মতুয়া সম্প্রদায়, সমতল ভূমির নৃগোষ্ঠী এবং পাহাড়িদের প্রতিনিধি থাকার কথা তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল।
“সবাইকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করার কাজ শুরু করেছি, যেটাকে আমরা আমাদের ৩১ দফায় একটি ‘রেইনবো স্টেট’ হিসেবে পরিণত করার কথা বলেছি।”
মতবিনিময় সভায় তোলা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবি তার নজরে এসেছে তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, “বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে অবশ্যই প্রতিটি দাবির ইতিবাচক সমাধানের চেষ্টা আমরা করবো। তবে একটি জিনিস মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ সকল ধর্মের মানুষের একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক দেশ।”
অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি পেছনে ফিরে তাকাতে চাই না। কারণ, বারবার অতীতচারিতা করে সামনের দিকে এগোনো যায় না। আমরা সামনের দিকে এগোতে চাই। আপনাদের সঙ্গে যেন কোনো বিভেদ সৃষ্টি না হয়, সচেতনভাবে আমরা তা দেখতে চাই।”
একটি মহল খুব সচেতনভাবে ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করতে উঠেপড়ে লেগেছে বলে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সেদিন ধর্মের নাম করে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের উপেক্ষা করেই আমরা একসাথেই লড়াইটা লড়েছিলাম এবং ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি।”
গণতান্ত্রিক চেতনার বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য যে, যে গণতান্ত্রিক চেতনাকে সামনে নিয়ে আমরা সেদিন লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, সেটা আমরা রক্ষা করতে পারিনি। সেদিন যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা সেই ভূমিকা পালন করতে পারেননি। গণতন্ত্রকে ভুলে গিয়ে তারা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা সামনে নিয়ে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালেও গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে।”
স্বাধীনতার পরের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে না পারাকে দুর্বলতা মনে করেন তিনি।
“গণতন্ত্র হলেই আমাদের পারস্পরিক অধিকার, ধর্মীয় অধিকার— সবকিছুই রক্ষা হতো। কিন্তু যেহেতু আমরা পারিনি, সে কারণেই সবসময় সেই অধিকারগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।”
মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশকে সামনে রেখেই আমরা এগিয়ে যাবো। আমরা কোনোটাকেই বাদ দিতে চাই না। আমি সবসময় বলি, যারা একাত্তরকে ভুলে যেতে চায় বা ভুলিয়ে দিতে চায়, তারা কখনোই বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না।
“বাংলাদেশে বিশ্বাস করতে হলে একাত্তরকে অবশ্যই সামনে আনতে হবে। একইসঙ্গে আমরা জুলাইকেও অস্বীকার করতে পারি না, কারণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের অসংখ্য সন্তান প্রাণ দিয়েছে এবং একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছে। আমরা কোনোটিকেই ছোট করে দেখি না।”
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “আমি সবসময় নজরুলের সেই কথাটি মনে করি— ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।’ এটাই হচ্ছে মূল কথা। আমরা একই মায়ের সন্তান, বাংলাদেশের সন্তান। আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাবো।”
বক্তব্যের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ধর্মের ভিত্তিতে যারা দেশকে বিভাজন করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা এখানে উগ্রবাদ বা মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। আমরা একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চাই।”
সম্মিলিত সনাতন পরিষদ আয়োজিত এই প্রতিনিধি সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ।