Published : 29 Dec 2025, 03:57 PM
আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘একপাক্ষিক ও একতরফা’ এবং গণভোটকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ।
কারাবন্দি হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন দলটি সোমবার এক সংবাদ বিজপ্তিতে বলেছে, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ও নির্বাচনমুখী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা মনে করে, একটি ‘অনির্বাচিত অসাংবিধানিক’ সরকারের চেয়ে একটি নির্বাচিত সাংবিধানিক সরকার যে কোনো বিবেচনায় শ্রেয়।
“সেই বিবেচনা থেকেই জাসদ অতীতে কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া সকল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। জাসদ একটি নির্বাচনমুখী দল হয়েও আসন্ন অসাংবিধানিক গণভোট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে একপাক্ষিক, একতরফা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী ইনুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হওয়া ইনুকে কয়েকটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের মতো কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও পালাবদলের পর জাসদ আর রাজনীতির মাঠে নামতে পারেনি।
দলটির দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘সুস্পষ্টভাবেই’ নিরপেক্ষ নয় বলে দাবি করা হয়েছে।
জাসদ বলছে, “এই সরকার নিরপেক্ষ অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বদলে একটি অসাংবিধানিক গণভোট ও একপাক্ষিক, একতরফা সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছে। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা বাস্তবায়নে অসাংবিধানিক গণভোট ও একপাক্ষিক একতরফা সংসদ নির্বাচনের প্রহসন করছে।
“তাই জাসদ অসাংবিধানিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে একপাক্ষিক একতরফা নির্বাচন বর্জন করছে।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিন রেখে যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে সে অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনের জাসদের তরফে নির্বাচন বর্জনের এই ঘোষণা এল।
দলটি কেন নির্বাচন বর্জন করছে? তার ব্যাখ্যায় জাসদ বলেছে, সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যেদিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই দিনই তারা বিবৃতি দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছিল। দ্রুততম সময়ে সকল দলের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সাংবিধানিক সরকারের হাতে দেশের শাসনভার ন্যাস্ত করার আহবান জানিয়েছিল জাসদ।
জাসদ বলেছে, অতীতের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর মতো ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বদলে অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক ‘ফন্দিফিকির, তালবাহানা’ করে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘ মেয়াদি করছে।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দেশের ‘বিভাজিত’ রাজনীতির একটি পক্ষের সাথে ‘হাত মিলিয়ে’ সরকার আরেক পক্ষের উপর ‘চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ’ করছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।
“মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে মীমাংসিত বিষয়গুলো অমীমাংসিত ও অস্বীকার করা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্মারক, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলা, সঙ্গীত ও নাট্যায়োজনে বাধা প্রদান করা, বাঙালি ও আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি—লোকসংস্কৃতি এমনকি ইসলামের শান্তিবাদী, সহিষ্ণুতাবাদী, সমন্বয়বাদী, সুফিবাদী, মরমীবাদী ধারার উপর একের পর আঘাত হানার মত জঘন্য অপরাধে মদদ দিতে থাকে।
“জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বদলে মব উসকে দিয়ে দেশকে মবের মুল্লুকে পরিণত করে। নিম্ম আদালত থেকে উচ্চ আদালত, প্রশাসন, গণমাধ্যম, শিক্ষাঙ্গণ এবং পাড়া, মহল্লা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাটে মববাজি আর খুন, গুম, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে দেশে নরক গুলজার পরিস্থিতি তৈরি করে।”
আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাসদ দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের দলনিরপেক্ষ, নিরপেক্ষ রাখার বদলে দেশে বিভাজিত রাজনীতির একটি পক্ষকে প্রকাশ্যে মদদ দেওয়ার পাশাপাশি ‘কিংস পার্টিও’ গড়ে তোলে।
“অন্য পক্ষকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও শত্রু বানিয়ে তাদের উপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে কোনো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে হরেদরে ঢালাও মিথ্যা মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তার করে।”
বিজ্ঞপ্তিতে জাসদ বলেছে, “সমগ্র দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশঙ্কার সাথে মিলিয়ে জাসদও মনে করে, এই অসাংবিধানিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে এই একপাক্ষিক, একতরফা নির্বাচন দেশে সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক শাসন ও শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা তো রাখবেই না, বরং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাসবাদী, মববাদী রাজনীতিকে উৎসাহিত করে দেশে অশান্তি তৈরি করার অপরাজনীতি এবং এগুলোর হোতা অপশক্তিগুলিকে বৈধতা দেবে।”