Published : 19 Apr 2026, 09:34 PM
কার্টুন ‘শেয়ার’ করায় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
একই আলোচনায় তিনি অভিযোগ তুলেছেন, সংসদে মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্ব ‘কমে যাওয়ায়’ মন্ত্রীদের জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জবাবে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, শুধু তাকে নিয়ে কার্টুন আঁকার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ তিনি করছেন।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি যদি ‘সাইবার অপপ্রচার, মানহানি বা কুরুচিপূর্ণ প্রচারণার’ সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে বিষয়টি সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব, সদস্যদের অধিকার এবং সাইবার আইনে মামলা নিয়ে আলোচনায় বিষয়টি ওঠে।
হাসনাত আবদুল্লাহ কার্যপ্রণালী বিধির ১৬৩ ধারা তুলে ধরে ‘প্রিভিলেজের প্রশ্ন’ তোলেন। তিনি বলেন, গত দুই সপ্তাহের অধিবেশনে তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন কার্যসূচিতে থাকলেও সেগুলো শুধু টেবিলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে সদস্যরা মন্ত্রীদের সম্পূরক প্রশ্ন করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, “কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য, যদি আমরা মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই না পারি, তাহলে আমরা কোথায় কথা বলব? আমাদের কথা বলার জায়গা একেবারেই সীমিত।
“আমি মনে করি এর মাধ্যমে আমার অধিকার বঞ্চিত হচ্ছি এবং আমি সম্পূরক প্রশ্ন করতে পারি না।”
একই ধরনের অভিযোগ তোলেন নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন।
তিনি বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন সেদিন তালিকায় থাকলেও তা উত্থাপনের সুযোগ হয়নি।
“আজকে যে তারকা প্রশ্ন তিন নম্বরে ছিল, সেটা যদি উত্থাপিত হত, যদি মাননীয় মন্ত্রী উত্তর দিতেন বা আমি যদি একটা প্রশ্ন করতে পারতাম, তাহলে সমস্যাগুলো আরও পরিষ্কারভাবে তোলা যেত।”
মাহবুব উদ্দিন বলেন, প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ না পেলে জনগণের সমস্যাও সরাসরি তোলা যায় না, আবার সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট হয় না।
ওই প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত আব্দুল্লাহ সাম্প্রতিক একটি গ্রেপ্তারের ঘটনার কথা তোলেন। তিনি বলেন, “আমরা কল্পনাও করতে পারিনি যে নির্বাচনের পরে কার্টুন শেয়ার দেওয়ার জন্য হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করা হবে।”
তার অভিযোগ, চিফ হুইপকে নিয়ে একটি ব্যঙ্গচিত্র বা ‘স্যাটায়ার’ শেয়ার করায় তার এক কর্মী সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশের ২৫ ধারায় মামলা করেছেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে ‘ব্ল্যাকমেইলিংয়ের’ অভিযোগে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁও এলাকার বাসা থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
পরে চিফ হুইপের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়া বিএনপি কর্মী নজরুল ইসলাম গুলশান থানায় সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশের ২৫ ও ২৭ ধারায় মামলা করেন। হাসান নাসিম ছাড়াও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয় সেখানে।
ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে হাসান নাসিমকে রোববার কারাগারে পাঠানো হয়। তার ভাই হাসান নোমান অভিযোগ করেন, সুনির্দিষ্ট ওয়ারেন্ট ছাড়াই তার ভাইকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্ন ছিল, রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র নিয়েও যদি এভাবে মামলা হয়, তাহলে সংসদ সদস্যরা এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলবেন কোথায়?
“এই প্রশ্নগুলো আমরা কাদেরকে করব? যদি আমাদের এই মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বটি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে এটা একটা মনোলগ সেশন হয়ে যাবে।”
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “নির্বাচনের পর শুধু একটি কার্টুন শেয়ার করার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে, এটা আমরা কখনও কল্পনা করিনি। হাসিনার আমলে সমালোচনার জন্য গ্রেপ্তার করা হত।
“এখানে একটি মিম… সেটিকে ২৫ ধারায় অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে, যে ধারা যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি বিরোধী কণ্ঠ দমন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
ডেপুটি স্পিকার জবাবে বলেন, ১৬৩ ও ১৬৪ ধারার অধীনে প্রিভিলেজের প্রশ্ন তুলতে হলে নির্ধারিত সময়ের আগে নোটিস দিতে হয়।
তবে আবুল হাসনাতের উত্থাপিত বিষয়কে তিনি ‘খুবই প্রাসঙ্গিক’ ও ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আমরাও চাই এই সংসদ প্রাণবন্ত থাকুক। প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে জবাবদিহির জায়গাটা থাকুক।”
পরে চিফ হুইপ বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব সংসদ সদস্যদের একটি অধিকার, এ কথা ‘আংশিক সঠিক’। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা নির্ধারিত থাকায় সময়ের সংকট তৈরি হয়েছে, সে কারণেই কিছু প্রশ্ন টেবিলে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সরকার জবাবদিহির মধ্যে থাকবে, সেটা আমরা চাই। আমরা আন্তরিকভাবেই চাই। কিন্তু সময়ের সমস্যার কারণে আমরা এটা করতে পারছি না বলে দুঃখিত।”
চিফ হুইপ বলেন, সংসদ যদি রাত ১০টা পর্যন্ত চালানোর বিষয়ে সদস্যরা একমত হন, তাহলে প্রশ্নোত্তর পর্বও আরও বিস্তৃতভাবে চালানো সম্ভব।
কার্টুন শেয়ারকারী ব্যক্তির গ্রেপ্তার নিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, নির্বাচন শুরুর আগেই তার, তার দল এবং শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ভুয়া আইডি থেকে ‘মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিমূলক, অসম্মানজনক এবং কুরুচিপূর্ণ’ প্রচারের অভিযোগ তিনি বিভিন্ন জায়গায় লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
“আমি অনেকগুলো চিঠি দিয়েছি, জিডি করেছি, তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়।”
নুরুল ইসলাম মনির ভাষ্য, তিনি নির্বাচন কমিশন, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকেও এ নিয়ে অভিযোগ দিয়েছেন।
“গতকাল পত্রিকায় দেখলাম, আমাকে নিয়ে করা একটি কার্টুনের কারণে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
এরপর তিনি সংসদে বলেন, “আমি আপনার সামনে, মাননীয় স্পিকার, দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্টভাবে বলতে চাই, যদি আমাকে নিয়ে করা একটি কার্টুনের কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।”
তবে তিনি এও বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি আসলে ওইসব সাইবার অপপ্রচারকারীদেরই একজন কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন।
চিফ হুইপ বলেন, “ওই ব্যক্তি সাইবার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কি না, আমি জানি না। যদি তিনি সত্যিই সেই ব্যক্তি হন যাকে আমি চিনি, এবং যদি তিনি জড়িত থাকেন, তাহলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের স্বার্থেই কারও বিরুদ্ধে মানহানি ও অশালীন মন্তব্য সহ্য করা যায় না।”
তিনি বলেন, সাইবার তদন্তে দেখা গেছে, হাসান নামে একজন ব্যক্তি জনশক্তি রপ্তানি, মানি লন্ডারিং ও অন্য কিছু কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, যদিও এসব তথ্য কতটা নির্ভুল তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।
চিফ হুইপের ভাষায়, “যদি এই ব্যক্তি সত্যিই এ ধরনের সাইবার কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে সরকারের গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত। সত্য হলে তা আইনের মধ্যে পড়ে, আর সত্য না হলে আমার ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই।”
পরে তিনি আরও বলতে শুরু করলে ডেপুটি স্পিকার নামাজের বিরতির কথা বলে তাকে থামান।
তখন চিফ হুইপ বলেন, ভুয়া আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী, তার স্ত্রী ও মেয়েকেও নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। সরকার, বিরোধী দল এবং দেশের স্বার্থে এসব বিষয় ‘গভীরভাবে’ তদন্ত করা জরুরি।