১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারকে ‘দুর্বল’ পেয়ে কোনো কোনো দল পরিস্থিতি ‘ঘোলা’ করছে: তারেক রহমান

“সংবিধানে লেখা থাকলেই সবকিছু কী নিশ্চিত হয়ে যায়? হয়তো হয়ে যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাস কিন্তু তাই বলে কম-বেশি,” বলেন তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Nov 2025, 01:19 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:06 PM

অন্তবর্তীকালীন সরকারকে দুর্বল পেয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল পরিস্থিতি ঘোলা করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

পরিস্থিতি  ঘোলা না করার জন্য তিনি দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বুধবার বিকালে ঢাকায় বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।

তিনি বলেন, “জুলাই সনদে যা অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা আমরা সই করে এসেছি, বিএনপি এইসব অঙ্গীকার রক্ষা করবে, রক্ষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

“তবে কোনো রাজনৈতিক দল যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দুর্বল পেয়ে যা ইচ্ছা তাই আদায় করে নিতে চায় কিংবা জনগণের দ্বারা বিএনপির বিজয় ঠেকাতে চায় বা কোনো অপকৌশল গ্রহণ করে, সেটি মনে হয় শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের জন্যই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে বা দাঁড়াতে পারে কিনা, সে ব্যাপারে তাদের বোধহয় সতর্ক থাকা দরকার।”

২৫ দল স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একটি আদেশ জারি করতে এবং সেই আদেশের ভিত্তিতে গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে জনগণের সম্মতি নেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।

কিন্তু সেই গণভোট কবে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। বিএনপি চায় ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হোক। অন্যদিকে জামায়াতসহ আট দল নভেম্বরেই গণভোটের দাবিতে আন্দোলন করছে।

গত ৩১ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশন ওই সুপারিশ করলেও সরকার এখনো অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সুরাহা করতে পারেনি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কে জারি করবে, কবে তা জারি হবে, সেই ফয়সালাও হয়নি।

মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়া ও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দেওয়ার দাবিতে ঢাকায় সমাবেশ করেছে। 

সেদিন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, ‘আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে’ তা স্পষ্ট হবে।

তার পরদিন জামায়তসহ আট দল সরকারকে রোববার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিল।

অপরদিকে বিএনপি নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজন ও নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির পক্ষে।

দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, “রাজপথের সঙ্গীদের প্রতি, সেই সঙ্গীদের প্রতি যারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করছেন বা করার চেষ্টা করছেন, দয়া করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করবেন না।”

৭ নভেম্বর ‘সিপাহী জনতার বিপ্লব’ উপলক্ষে আলোচনা সভা আয়োজনর প্রসঙ্গ ধরে তিনি ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ জিয়াউর রহমানকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।”

এরপরই তারেকে স্লোগান ধরেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।

আলোচনা সভায় জিয়াউর রহমানের কর্মময় জীবনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

‘সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে

আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি রেখে আনুষ্ঠানিক প্রচার অভিযান শুরু করেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণা করার প্রস্তুতির কথা বলেছে কমিশন। তার আগে দলের সঙ্গে বৃহস্পতিবার থেকে সংলাপে বসছে সাংবিধানিক সংস্থাটি।

তার আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে সেই প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করেছে। এখন সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

“তারা কি একটি রাজনৈতিক দলের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করবে, নাকি দেশের গণতান্ত্রিক আমি জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনকেই অগ্রাধিকার তারা দেবে।”

তিনি বলেন, “রাজপথের আন্দোলনের সকল সঙ্গীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই… উত্তর কোরিয়ার সংবিধানে লেখা রয়েছে… ‘ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া’।

“সংবিধানে লেখা থাকলেই সবকিছু কী নিশ্চিত হয়ে যায়? হয়তো হয়ে যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাস কিন্তু তাই বলে কম-বেশি। আসলে সবার আগে প্রয়োজন রাষ্ট্র রাজনীতি সম্পর্কে মানসিকতার পরিবর্তন, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতার, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মানসিকতার, সর্বোপরি প্রয়োজন দেশপ্রেম এবং জাতীয় ঐক্য।” 

‘জাতীয় ঐক্যে বিএনপির সর্বোচ্চ ছাড়’

তারেক বলেন, “দেশ এবং জনগণের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং জনসমর্থিত দল হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার ব্যাপারে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে।

“দুইয়ে দুইয়ে  যেমন চার হয়; এটিও প্রমাণিত। আমরা যদি কাগজপত্র দেখি তাহলে দেখব, বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি দফা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিএনপি অধিকাংশ পয়েন্টে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে। আমাদের বক্তব্য একদম পরিষ্কার।”

 ‘গণভোটে অর্থ ব্যয়ের চেয়ে আলু চাষীর ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ’

তারেক বলেন, “আমাদের রাজনীতি কাদের জন্য। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আমার কিছু উপলব্ধির কথা বলতে চাই। দেশে এবার এক কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। আলু উৎপাদন করে খুব সম্ভবত আলু কৃষকরা বিপাকে পড়ে গিয়েছেন। কারণ আলুর যে  উৎপাদন খরচ এবং উৎপাদিত আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখতে হবে, প্রতি কেজি আলুর পেছনে খুব সম্ভবত খরচ পড়ছে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ টাকার মতো। অথচ আলুর চাষীরা কিন্তু এখনও অর্ধেক দামেও উৎপাদিত আলু বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না। আলু চাষ করে আলু চাষীরা এবার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার মতো লোকসানের আশঙ্কা  করছেন।

‘‘অপর দিকে আমরা দেখি, দু-একটি রাজনৈতিক দলের আবদার মেটাতে গিয়ে কথিত গণভোট যদি করতে হয়, রাষ্ট্রকে আলু চাষীদের যে তিন হাজার কোটি টাকা পরিমাণে গচ্চা, এই কথিত গণভোট করতে হলে প্রায় সমপরিমাণ টাকা গচ্চা দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসানের মুখোমুখি এসব আলু চাষীদের কাছে এই সময় গণভোটের চেয়ে মনে হয় আলুর ন্যায্য মূল্য পাওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশবাসীর ভাবনার জন্য আমি প্রসঙ্গটি উপস্থাপন করলাম।”

একইভাবে পেঁয়াজের উৎপাদনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা বা যে পরিমাণ উৎপাদন হয়, আমাদের কৃষকদের কম-বেশি মোটামুটি সক্ষমতা রয়েছে, যদি তাদেরকে সহযোগিতা করা হয়।  পেঁয়াজ সংরক্ষণ সুষ্ঠূভাবে করার কোনো ব্যবস্থা সেভাবে না থাকায়, অর্থাৎ কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় আমাদেরকে প্রতিবছর পেঁয়াজের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

“আমার কাছে মনে হয়েছে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কথিত গণভোট করার চেয়ে সেই টাকায় পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ যদি স্থাপন করা হয়, সেটা বোধহয় কৃষকদের কাছে গণভোটের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।”

দেশের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, গার্মেন্ট শিল্প বন্ধে বেকার কর্মহীন শ্রমিকদের দুরাবস্থা, শিক্ষা খাতে দুরাবস্থা, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘এসব বিষয়ে এখন গণভোটের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।”

তারেক রহমান বলেন, “সর খাতে এই রকম দুরাবস্থা। আমরা দেখছি, নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল, আজকে যারা আমরা রাজপথের সঙ্গীরা বসে আছি। কেউ হয়তো রাজপথের সঙ্গী ছিল, সেরকম কিছু দলকে আমরা দেখছি বর্তমানে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি করতে চাইছে।

‘বর্তমান সংকট উদ্দেশ্যেমূলক’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,  “আজ এখানে জাতীয় নেতারা উপস্থিত আছেন, আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাতে চাই, দেশে এই যে একটা সংকট তৈরি হয়েছে, এটা একটা অপ্রয়োজনীয় সংকট। এই সংকট সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই  সংকটটা তৈরি করা হয়েছে।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন,  “বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র আমাদেরকে মোকাবেলা করতে হবে।”

এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমেদ বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংস্কার শুরু করেছিলেন, যেটা তিনি সম্পন্ন করতে পারেননি।

“তারেক রহমান সাহেব এখানে আছেন, তিনি আমাদের বক্তব্য শুনছেন। তাকে অনুরোধ করব, আপনার আব্বা, আপনার আম্মা, যেখানে শেষ করেছেন, সেখানে থেকে আপনি শুরু করুন।”

বিএনপি মহাসচিবের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ বক্তব্য রাখেন।

এছাড়া জাতীয় পার্টি(কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, গণফোরামের  সুব্রত চৌধুরী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ,লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতে ইসলামীর এহসান মাহবুব জুবায়ের , গণঅধিকার পরিষদের রাশেদ খান প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।