২৬ মার্চের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি

আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে ‘নিবর্তনমূলক’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিভিন্ন সংগঠনকে নিয়ে গড়ে তোলা প্ল্যাটফর্ম ‘নাগরিক সমাজ’।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 March 2021, 09:18 AM
Updated : 3 March 2021, 01:20 PM

কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে বুধবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি থেকে দাবি জানানো হয়।

জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু হওয়া নাগরিক সমাজের এই পদযাত্রা পুলিশের বাধায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আটকে যায়।

পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জাফরুল্লাহ চৌধুরী ২৬ মার্চের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের জোর দাবি জানান।

তিনি বলেন, “আপনাকে বলছি, ২৬ মার্চের আগেই এই মানবতাবিরোধী কালো আইনটি বাতিল করুন।”

আর গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা না হলে ‘কঠোর আন্দোলন’ গড়ে তোলা হবে।

ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সরকারকে সময় বেঁধে দিয়ে ওই এলাকা ত্যাগ করেন বিক্ষোভকারীরা।

পদযাত্রা আটকে দেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পুলিশের রমনা জোনের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে সীমারেখা আছে। সেই সীমারেখা আমরা তাদেরকে অবগত করেছি। তাদেরকে বলেছি, আপনাদের প্রতিবাদ যতটুকু সম্ভব আমরা এলাও করেছি এবং এখানে এসে সমাপ্ত ঘোষণা করেন।

“এই কথাতেই তারা এখানে থেমে তাদের বক্তব্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করে চলে গেছেন। তারা প্রেসক্লাব থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল পর্যন্ত এসেছেন। প্রতিটি পয়েন্টে আমাদের পুলিশ থাকার পরও তাদের কোনো বাধা দেওয়া হয়নি।”

এর আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নাগরিক সমাবেশ করে হুইল চেয়ারে বসা জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে নাগরিক সমাজের পদযাত্রা শুরু হয়।

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পাশাপাশি নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, অধ্যাপক রেহেনুমা আহমেদ, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ পদযাত্রায় অংশ নেন।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে তাদের পদযাত্রা পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়ে। তারপর সেখানেই অবস্থান নিয়ে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন।

প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ সভাপতির বক্তব্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, “আজকে আমাদের দাবি একটাই, এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে দিতে হবে। এটা সংস্কারের প্রয়োজন নাই, আমরা সংস্কার চাই না, আমরা এটা বাতিল চাই।”

এ আইনের অধীনে গ্রেপ্তার সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ারও দাবি জানান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি।

সমাবেশে জানানো হয়, ড. কামাল হোসেন অসুস্থতার কারণে নাগরিক সমাবেশে উপস্থিত থাকতে না পারলেও দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন। সেই বক্তব্যে পড়ে শোনান তার দল গণফোরামের আহবায়ক কমিটির সদস্য মোশতাক আহমেদ।

সেখানে বলা হয়, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে মুক্ত চিন্তা, বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চরমভাবে খর্ব করা হয়েছে। মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো সংশোধনের জন্য বার বার অনুরোধ করার পরও সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বরং এর অপব্যবহার বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।”

“এভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সরকারের অত্যাচার ও নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হচ্ছে। এই কালো আইনটির অপব্যবহারের চরম বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে লেখক মুশতাক আহমেদের কারা হেফাজতে মৃত্যু।”

একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদর মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করার দাবি জানান প্রবীণ আইনজীবী কামাল হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও এই নাগরিক সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান।

সেখানে বলা হয়, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ইচ্ছা মত মামলা দেওয়া হচ্ছে, মানুষ গ্রেপ্তার হচ্ছেন, নাজেহাল হচ্ছেন। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল তো গুমই হয়ে গিয়েছিলেন। সীমান্ত এলাকায় যখন তাকে দেখা গেল, তখন অসুস্থ মানুষটিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হল। জামিনের চেষ্টা হল, কাজ হল না।

“শেষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে যখন প্রতিবাদ হল, লেখালেখি হল, তখন কোনো মতে জামিন পেলেন। মুশতাক আহমেদ তো তাও পেলেন না। ছয় ছয় বার আবেদন করেছেন, গ্রাহ্য হল না, সপ্তমবার আর প্রয়োজন হল না। তিনি চিরমুক্ত হয়ে চলে গেলেন।”

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “বললে কী অন্যায় হবে মুশতাক হলেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের প্রথম শহীদ? ঘটনা সেরকমই। আশা করব এটাই শেষ কথা। ভরসা হচ্ছে প্রতিবাদ।”

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, “মুশতাক আহমেদের এই অকালে চলে যাওয়া পর্যাপ্ত যুক্তি এবং প্রমাণ কী জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অবিলম্বে বাতিল করা দরকার। তার প্রাণত্যাগের ঘটনায় দ্রুত স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার তো আমরা চাইবই, সেই সঙ্গে ভীতিপ্রদ এ আইনটি প্রত্যাহার চাইব অবিলম্বে।”

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা- এটা আমাদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। যে অধিকার আইন করেও খর্ব করা যায় না। দুর্ভাগ্যবশত আজকে স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তী উদযাপন করতে গিয়ে এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করছি। এর চেয়ে লজ্জার কিছু আর হতে পারে। না। কারা হেফাজতে মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।”

অবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে সরকারের ‘শুভবুদ্ধির উদয় হবে’ বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।  

পরিবেশ আইনজীবী সমিতি-বেলার নির্বাহী পরিচালন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, এ আইনটি মানুষের স্বাধীনতা, আমাদের স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি।

“একজন মানুষ কথা বলল, সেই কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়ত ৫ হাজার লোক দেখল। ১৮ কোটি মানুষের দেশে এই ৫ হাজার লোকের দেখা নিয়ে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে যায়- এতো ঠুনকো ভাবমূর্তি কেনো হল- সেটা একটু ভেবে দেখেন। যদি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনতার চেতনাকে স্বাধীনতাকে সম্মুন্নত রাখতে হয়, তাহলে এই আইনটা বাতিল করে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল বিশেষজ্ঞদের সাথে বসে একটা আইন করেন।”

দুই বছর আগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে কাটানোর কথা তুলে ধরে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, “আমি যখন আদালতে দাঁড়াই, তখন আমি আদালতে প্রকাশ্যে বলি আমার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। আইনগতভাবে তখন জজের প্রয়োজন রয়েছে সেটার তদন্ত করার। সেটা না করে আমাদের রিমান্ডে পাঠানো হয়, সেখান থেকে চুরি করে আমাকে জেলে পাঠানো হয়। আমার পাঁচবার বেল প্রত্যাখান করে চাপের মুখে ছাড়তে হয়।

“মুশতাকের ক্ষেত্রে সেটাও হয়নি। সেটা হয়নি এই কারণে আজকে আপনারা যে ভূমিকা রাখছেন, সেটা আমরা মুশতাকের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ রাখেননি। এতোগুলো লেখক, যাদের প্রত্যেকের দাঁড়িয়ে কথা বলা দরকার ছিল, তারা সেটা করেননি, এতগুলো কার্টুনিস্ট, যারা এতোদিন প্রতিবাদী কার্টুন করে গেছেন, তারা কিশোরের জন্য প্রতিবাদী কার্টুন করেননি এবং আমাদের সাংবাদিক মহলের মধ্যেও অনেকে গা বাঁচিয়ে চলেছেন। সেই জায়গা থেকে আমাদের সরে যেতে হবে।”

লেখক রেহনুমা আহমেদ বলেন, “আজকে লেখক মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যু হওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা আবার লেখক হওয়ার অর্থ কী, লেখক কাকে বলে- এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। লেখক হওয়ার অর্থ হচ্ছে অধিক সততা এবং সাহস। কতজন লেখক আছেন বাংলাদেশে, যাদের বুদ্ধির সাথে সাহস আছে। আজকে আমরা মুশতাক আহমেদের হত্যার মাধ্যমে জানতে পারছি যে, সেই লেখকের সংখ্যা অতি কম।”

সমাবেশের এক পর্যায়ে হাই কোর্টে কার্টুনিস্ট কিশোরের জামিন পাওয়ার খবর এলে উপস্থিত সকলে করতালি দেন।

অন্যদের মধ্যে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, শহীদুল্লাহ কায়সার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণসংহতি জোনায়েদ সাকি, আবুল হাসান রুবেল, ভাসানী অনুসারী পরিষদের শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব নঈম জাহাঙ্গীর, রাষ্ট্রচিন্তার হাসান কা্ইয়ুম, দিদারুল আলম ভুঁইয়া, রাখাল রাহা, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর, ছাত্র অধিকার পরিষদের রাশেদ খান, ফারুক হাসান, লেখক অরূপ রায়, সংস্কৃতি কর্মী বিথী ঘোষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক