Published : 07 Dec 2025, 07:55 PM
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, কিছু মানুষ ও গোষ্ঠীর তরফে ইদানিং বিভিন্ন জায়গায় কিংবা সোশাল মিডিয়ায় বলতে শোনা যায় ‘অমুককে দেখলাম (ক্ষমতায়), তমুককে দেখলাম, এবার অমুককে দেখুন’। এই যাদের কথা বলা হচ্ছে ‘তাদেরকে দেশের মানুষ একাত্তর সালেই দেখেছে’।
রোববার বিকালে বিএনপির ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
দিনব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠানের সমাপনীতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তারেক রহমান ‘সামনের দিনগুলো ভালো নয়, অনেক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে’ বলেও মন্তব্য করেন। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি সবাইকে সর্তক থাকার আহ্বান জানান।
কোনো দল বা কারও নাম না নিয়ে ‘অমুককে দেখলাম‘, ‘এবার অমুককে দেখুন’ এমন প্রচারণার প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘কিছু কিছু মানুষ বা কোনো কোনো গোষ্ঠী ইদানিং বলতে শুনেছি বা বিভিন্ন জায়গায় কেউ কেউ সোশাল মিডিয়ায় বলে যে, অমুককে দেখলাম, তমুককে দেখলাম, এবার অমুককে দেখুন।
“যাদের কথা বলে অমুককে দেখুন। তাদেরকেতো দেশের মানুষ একাত্তর সালে দেখেছে। ১৯৭১ সালে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে কীভাবে লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। ঠিক যেভাবে পতিত স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার আগে হাজারো হাজারো মানুষকে হত্যা করেছিল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য।”
তারেক বলেন, “এই যাদেরকে কেউ কেউ বলে যে একবার দেখুন না এদেরকে। তাদেরকে দেশের মানুষ একাত্তর সালেই দেখেছে। তারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শুধু হত্যাই করেনি, তাদের সহকর্মীরা কীভাবে মা-বোনদের ইজ্জত পর্যন্ত লুট করেছিল। এই কথাটি আমাদেরকে মনে রাখতে হবে।”
‘তোমাদেরকে ঘরে ঘরে যেতে হবে’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘আমরা শুনেছি একটি রাজনৈতিক দলের কিছু ব্যক্তি বা বেশ কিছু (নেতাকর্মী) বিভিন্ন জিনিসের টিকিট বিক্রি করে বেড়াচ্ছে, বিভিন্ন জিনিসের কনফার্মেশন দিয়ে বেড়াচ্ছে।
‘‘এখন আমি যতটুকু বুঝি, অনেক মুরুব্বি ব্যক্তি আছেন, বুজুর্গ ব্যক্তি আছেন ধর্মীয় বিষয়। আমি একজন সাধারণ নরমাল একজন মুসলমান হিসেবে আমি যতটুকু বুঝি, যা আমার না। আমি যদি তা দেবার কথা বলি। অর্থাৎ যেটি আমার না সেটির কমিটমেন্ট যদি করি তাহলে আমি তার সাথে পাল্লা দেখছি। অর্থাৎ দোজখ-বেহেশত দুনিয়ার সবকিছুর মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ, যেটার কথা একমাত্র আল্লাহ তালাই বলতে পারে। সেখানে যদি আমি কিছু বলতে চাই আমার নরমাল দৃষ্টিকোণ থেকে আমি বুঝি যে সেটি হচ্ছে শিরিক। এটি হচ্ছে শিরিকের পর্যায়ে পড়ে।”
তিনি বলেন, ‘‘তোমাদেরকে (ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের) ঘরে ঘরে যেতে হবে এবং বলতে হবে যারা এইসব কথা বলে তারা শিরিক করছে। আপনি যদি তাদের কথা শুনেন আপনিও শিরিকের পর্যায়ে পড়ে যাবেন।
‘‘যার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তালার সেটি একমাত্র আল্লাহর অধিকার। কে কোথায় যাবে? কার ইহকালে কী হবে, পরকালে কী হবে তার অধিকার একমাত্র ডিসাইড করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। কাজেই যারা এসব কথা বলে তারা ঈমানে শিরিক করছে। একজন মুসলমান হিসেবে আমি সেটাই বুঝি। এই কথাগুলো তোমাদেরকে পৌঁছে দিতে হবে।”
রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা কর্মসূচি’ শীর্ষক এ আয়োজনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। সকালে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকম ‘ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন জায়গায়’ হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন, ‘‘আমি গত ৫ অগাস্টের পর থেকে বলে আসছি যে, আমাদের সামনের সময়গুলো কিন্তু খুব ভালো নয়, সামনে অনেক কঠিন সময়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
‘‘বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে।”
তিনি বলেন, ‘‘এই ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পারে এই দেশের জনগণ এবং এই ষড়যন্ত্র জনগণকে সাথে নিয়ে রুখে দিতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এই ষড়যন্ত্র, এই ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে- গণতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্র।
‘‘আমরা যদি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, যেকোনো মূল্যে জনগণের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে অবশ্যই অনেক ষড়যন্ত্রকে আমরা রুখে দিতে পারব।”
তবে ষড়যন্ত্রকে রুখে সম্ভব হলেও সামনে অনেক কঠিন সময় বলে তার শঙ্কার কথা দীর্ঘ বক্তৃতায় তুলে ধরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

‘দুর্নীতি-আইনশৃঙ্খলা: বিএনপির প্রথম অগ্রাধিকার’
দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমান বলেন, ‘‘দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা এই দুইটি বিষয় আমাদের অ্যাড্রেস করতে হবে। যেকোনো মূল্যে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে, যেকোনেরা মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরতে হবে।
“সেজন্য সরকার গঠনের সুযোগ পাওয়ার সাথে সাথে সর্বপ্রথমে আমাদেরকে নজর দিতে হবে, সর্বপ্রথমে আমাদেরকে ব্যবস্থা করতে হবে দুর্নীতির লাগাম কীভাবে আমরা টেনে ধরব? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম কীভাবে আমরা টেনে ধরব? যদি আমরা দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলার লাগাম টেনে ধরতে না পারি তাহলে আমরা যে পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করেছি মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে, নারী সমাজকে ক্ষমতায়ন করা, দেশের কৃষি ব্যবস্থা প্রত্যেকটি পরিকল্পনা আমাদের বাধাগ্রস্থ হবে, স্লো হয়ে যাবে।”
এ দুই সমস্যার সমাধান না হলে পুরো জাতি সংকটের মধ্যে পড়বে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, একমাত্র বিএনপিই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরতে পারবে। কারণ আমরা অতীতে করেছি, ভবিষ্যতে আমরা সুযোগ পেলে এই কাজটি করে দেখাতে পারব ইনশাল্লাহ।”
বেকার সমস্যা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়, কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে বিএনপির পরিকল্পনাসমূহে তুলে ধরেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
‘কিছু দল ফ্যাসিস্টদের সুরেই গান গাইছে’
তারেক রহমান বলেন, ‘‘কেউ কেউ বলে থাকে পলাতক স্বৈরাচার যেভাবে বিএনপি সম্পর্কে যেসব মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াত, আমরা ইদানিং লক্ষ্য করছি কিছু কিছু ব্যক্তি বা দল ঠিক একই সুরে গান গাইছে বা একই সুরে কতগুলো কথা বলার চেষ্টা করছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাদেরওতো দুইজন ব্যক্তি আমাদের সাথে সেই সময় সরকারে ছিল। এই দুজন ব্যক্তি পৃথিবীতে আর নেই, দু‘জনই সিনিয়র মানুষ, দু‘জনই সিনিয়র রাজনীতিবিদ ছিলেন। তারা গত হয়েছেন। কাজেই যে মানুষ নেই তাদের সম্পর্কে অবশ্যই খারাপ কথা বলা উচিত নয়।
‘‘তাদের প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান রেখেই বলতে চাই, সেই দুইজন ব্যক্তির বিএনপি সরকারে শেষ দিন পর্যন্ত থাকা যৌক্তিকভাবে দুইটি জিনিস প্রমাণ করে দেয়- এক. তারা অবশ্যই পূর্ণ কনফিডেন্স ছিল খালেদা জিয়ার উপরে। যে খালেদা জিয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। সেজন্যই তারা শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। এখন তাদের দলের অন্য যে যত বড় বড় কথা বলুক না কেন খালেদা জিয়া শেষ দিন পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং দুর্নীতির অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এই আত্মবিশ্বাস তাদের মধ্যে ছিল, তারা দেখেছিল সেই সরকারের সেজন্যই তারা শেষ দিন পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সাথে তারা ছিলেন। আমরা অন্য কিছু বলতে চাই না।”
তিনি বলেন, ‘‘তাদের দলের কেউ কেউ বলে থাকে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু অভিযোগ পাওয়া যায় না। আজকে যখন নিরপেক্ষ আদালত বসেছে। স্বৈরাচারের সময় আমরা দেখেছি কীভাবে আদালতকে প্রভাবিত করা হত। কিন্তু স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার পরে মোটামুটি আমরা বলতে পারি যে আদালত এখন নিরপেক্ষ, নিরপেক্ষতা আমরা আশা করি। এই সেই নিরপেক্ষ আদালত থেকে আমরা দেখেছি, কারো বিরুদ্ধেই কোনো জিনিস প্রমাণিত হয়নি।
‘‘এটি ছিল প্রপাগান্ডা। আমাদেরকে আজকে এই উপসংহারে আসতে হবে যে একমাত্র বিএনপি পেরেছিল দেশকে দুর্নীতি থেকে বের করে নিয়ে আসতে। ইনশাল্লাহ আগামী দিনেও বিএনপি পারবে।”
দীর্ঘ বক্তৃতায় তারেক রহমান দেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের করা প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আজ সারাদিন আমরা যেগুলো আলোচনা করেছি, সেগুলো যদি আমরা করতে পারি তাহলেই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা সম্ভব। আগামীতে দেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে আমরা দেশ গড়ব।
‘‘বিএনপি বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরও বানাতে চায় না, মালয়েশিয়াও বানাতে চায় না, কানাডাও বানাতে চায় না, যুক্তরাষ্ট্র বানাতে চায় না। আমরা চাই একটি স্বাবলম্বী বাংলাদেশ।“
দেশ গড়তে বিএনপির নেওয়া পরিকল্পনা সফল করতে তিনি ছাত্রদলকে মানুষের দৌড় গোড়ায় যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘অনেক সময় লাগবে, কষ্ট হবে। অনেক কঠিন, অনেক শত্রু আছে যারা আমাদেরকে বাধা দেবে কিন্তু এই দেশের মানুষকে কেউ বাধা দিয়ে দাবিয়ে রাখতে পারেনি।”
‘দেশ গড়া পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের সঞ্চালনায় সমাপনী অনুষ্ঠানে বিএনপির জিয়া উদ্দিন হায়দার, আবদুল মজিদ, আমিনুল হক, মীর শাহে আলম, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বক্তব্য রাখেন।
পরে অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আলোচকরা।