Published : 20 Aug 2025, 01:19 PM
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মারধরের শিকার রিকশাচালক আজিজুর রহমানকে দেখে আশা জাগছে কারাবন্দি জুনাইদ আহমেদ পলকের মনে।
ডজনখানেক মামলার আসামি সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলক বলেছেন, “এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। যার প্রমাণ আজিজুর রহমান।”
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার মোহাম্মদপুরে হোসেন নামে এক ট্রাক চালক নিহতের মামলায় বুধবার গ্রেপ্তার দেখানো হয় পলককে। আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের সামনে তিনি জোরে জোরে ওই কথা বলেন।
হোসেন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই আক্তারুজ্জামান এ মামলায় পলককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করলে আদালত বুধবার শুনানির দিন রেখেছিল। সে অনুযায়ী এদিন তাকে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করা হয়।
মাথায় হেলমেট, হাতে হাতকড়া, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীকে এজলাসে তোলা হয়। কাঠগড়ায় নিয়ে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট খুলে ফেললে তার কোমরে লাম্বার সাপোর্ট বেল্ট (কোমরের ব্যথা কমানোর বেল্ট) দেখা যায়।
শুনানি শুরুর আগে এজলাসে দাঁড়িয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন পলক। অনেককে সালামও দেন।
ঢাকার মহানগর হাকিম এম মিজবাহ উর রহমান এজলাসে বসেন সকাল সাড়ে ১০টায়। এরপর শুনানি শুরু হয়। এসময় কাঠগড়ার একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়ান পলক।
শুনানির সময় তিনি বিচারকের কাছে জানতে চান, তিনি এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি কি না? বিচারক তাকে বরেন, “সন্ধিগ্ধ”। পলক তখন বলেন, “ওহ সন্ধিগ্ধ।”
পরে তিনি বিচারকের কাছে ঘটনার তারিখ ও সময় জানতে চান। তাকে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনায় এ মামলা।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, “গতবছর ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরে ট্রাক ড্রাইভার হোসেন নিহত হন। আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এজন্য তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করছি।”
এ সময় পলক বলেন, “উনি (তদন্ত কর্মকর্তা) কি ৩ জুলাইয়ের কথা বললেন।”
তাকে জানানো হয়, ৩ জুলাই না, ঘটনা ১৯ জুলাইয়ের। পলক ঘটনার সময় জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর এলাকায় গুলিতে মারা যান ট্রাক চালক হোসেন। এ ঘটনায় তার মা রিনা বেগম ৩১ অগাস্ট মামলা দায়ের করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন শুনানিতে বলেন, “এটা একটা হত্যা মামলা। তদন্তে নাম আসায় তাকে (পলককে) গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। আন্দোলন চলাকালে ইন্টারনেট বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের ওপর ক্রাকডাউন চালানো হয়। অনেককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের গণকবরে সমাহিত করা হয়। হত্যার সাথে পলক সরাসরি সম্পৃক্ত।”
পরে বিচারক এ মামলায় পলককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।
১০টা ৫০ মিনিটের দিকে পলককে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তিনি বলেন, “এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। যার প্রমাণ আজিজুর রহমান।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ৫০তম বার্ষিকীতে শুক্রবার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে তার বাড়ির সামনে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মারধর ও হেনস্তার শিকার হন কয়েকজন।
তাদের মধ্যে রিকশাচালক আজিজুর রহমান বেলা ১১টার দিকে রিকশা চালিয়ে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ৩২ নম্বরে যান। ফুলের তোড়ার ওপর কাগজে লেখা ছিল ‘১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস’।
তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিকর্মীরা রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়েন। একজন লাফ দিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে ফুলের তোড়াটি কেড়ে নেন। চলে মারধর, ভাঙচুর করা হয় তার রিকশাটিও। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই রিকশাচালক।
আজিজুর রহমান সেদিন সাংবাদিকদের বলেন, তিনি যাত্রাবাড়ী থেকে এসেছেন। চারশ টাকা দিয়ে ফুলের তোড়াটি কিনেছেন।
“আমার অনেক কষ্টের টাকা, আমি দুই বছর ঢাকা শহরে রিকশা চালাই। শুধু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি জন্যি এহানে আইছি।”
পরে আজিজুর রহমানকে পুলিশ আটক করে এবং এক বছর আগের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার আদালতে তোলে। পরদিন তাকে জামিন দেয় আদালত।
নতুন মামলায় গ্রেপ্তার আতিক, রিমান্ডে কিরণ
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানার ব্যবসায়ী ইশতিয়াক মাহমুদ হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামকে।
আর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণকে এ মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
ঢাকার মহানগর হাকিম এম মিজবাহ উর রহমান বুধবার শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন।
এদিন পলকের সঙ্গেই আদালতে হাজির করা হয় আতিক ও কিরণকে। প্রথমে পলককে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেয় আদালত। এরপর আতিক ও কিরণের মামলায় শুনানি শুরু হয়।
কিরণকে সাত দিনের রিমান্ডে চেয়ে গত ৪ জুন আবেদন করেছিল পুলিশ। বুধবার সে বিষয়ে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন।
তিনি বলেন, “(২০২৪ সালের) ১৮ জুলাই সারা বাংলাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা করা হয়। ছাত্রদের ডাকে সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। ওইদিন মুগ্ধ, ফাইয়াজসহ ৪৮ জনকে হত্যা করা হয়। এই কিরণ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সাথে নিয়ে উত্তরা এলাকায় হামলা চালায়। নিজে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করে।
“এই আসামি সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ট সহযোগী। তাকে রিমান্ডে নিলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটিত হবে। তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করছি।”
অন্যদিকে কিরণের পক্ষে আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন।
তিনি বলেন, “গত ৪ জুন রিমান্ড আবেদন। ১১৭ দিন পর শুনানি হচ্ছে। তাহলে দেখেন রিমান্ডের যৌক্তিকতা বা গুরুত্বটা কেমন। আমি (কিরণ) এ ঘটনার সাথে জড়িত না। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হওয়াটায় আমার (কিরণের) জন্য কাল হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ। তার রিমান্ড বাতিল করে জামিনের প্রার্থনা করছি।”
উত্তরা পূর্ব থানার প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আতিকুর রহমান এ সময় বলেন, “এ আসামিকে আদালতে হাজির করতে ছয় বার প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়। অনিবার্য কারণে তাকে আদালতে আনা হয়নি। জেল সুপারকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। আজ আদালতে হাজির করা হয়েছে।”
পরে আদালত কিরণকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিকজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন এবং আতিককে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, আন্দোলন চলাকালে গতবছর ১৮ জুলাই ইশতিয়াক মাহমুদ নামে এক ব্যবসায়ী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে যোগ দেন। আজমপুর নওয়াব হাবিবুল্লাহ হাই স্কুলের সামনে তার পেটে গুলি লাগে। পরে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
সুস্থ হয়ে গতবছর ২৯ অক্টোবর এ মামলা করেন ইশতিয়াক মাহমুদ। মামলায় পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ ১২৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।