Published : 31 Dec 2025, 01:58 AM
খালেদা জিয়ার চিরপ্রস্থানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের সমাপ্তি হল। তিনি রেখে গেলেন সেই দেশকে, যে দেশের জন্য তিনি লড়ে গেছেন। তিনি রেখে গেলেন একটি রাজনৈতিক দলকে, যে দলকে তিনি প্রায় ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা–দুই নেত্রীর দ্বৈরথে বাংলাদেশের রাজনীতি এগিয়েছে চার দশকের বেশি সময়। দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে একজন রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন। অন্যজন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কাটাচ্ছেন নির্বাসিত জীবন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবরণের পর ২০১৮ সাল থেকে বিএনপির হাল ধরেছেন তার ছেলে তারেক রহমান; আর চব্বিশের অভ্যুত্থানে পরিবর্তিত বাস্তবতায় দিল্লিতে বসে আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসিনা অনলাইনে দলীয় কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
সেই অভ্যুত্থানের পরে মাঠের বাস্তবতায় নয়া রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি জোট।
প্রশ্ন হল, দুই নেত্রীর অধ্যায় পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কোন পথে যাবে।
আওয়ামী লীগহীন রাজনীতির মাঠে বিএনপির একাচ্ছত্র প্রভাবের নতুন অধ্যায় রচিত হবে? আওয়ামী লীগ কি আবার পুরনো শক্তিতে ফিরে আসার সুযোগ পাবে? নাকি আওয়ামী লীগের শূন্যস্থান জামায়াতের মাধ্যমে পূরণ হয়ে দ্বিদলীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হবে?
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তানের হাওয়ায় নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাবের যে আলাপ জোরালো হচ্ছিল, গত দেড় বছরে তা থিতিয়ে এসেছে অনেকটা।
রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং দুই নেত্রীর অধ্যায় পেরিয়ে এসে রাজনীতির ছক কেমন সজ্জা পাবে, তা বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে আরো।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এর একটি পরীক্ষা হয়ে যাবে। তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সব অংক মিলিয়ে দেবে–তেমনটা তারা মনে করতে পারছেন না।

ডাকসুর সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগের অবস্থা কখনও ফেরে না। ইতিহাস তো কখনো পিছন দিকে যায় না। আগের যে দুই দলের প্রাধান্যপূর্ণ রাজনীতি, গণঅভ্যুত্থানের পরে তার পরিবর্তন এসেছে, সেটা স্পষ্ট।”
আগের মত দুই রাজনৈতিক শিবিরের সমীকরণ দেখতে আরও সময় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া যখন ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে উঠছিলেন, মুশতাক হোসেন তখন তরুণ ছাত্রনেতা। গত সাড়ে তিন দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক বাঁকবদলের সাক্ষী তিনি।
মুশতাক বলেন, “যে দুই দলীয় ধারার একটা রাজনীতি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে ছিল, সেই ধারার পরিবর্তন হল কি না, হবে কিনা, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।
“সেটা দেখতে নির্বাচনের পরেও অপেক্ষা করতে হবে। কারণ সেই দুই দলের একদল এখন রাজনৈতিক মাঠে অনুপস্থিত; তারা পরোক্ষভাবে কাজ করছেন বা গোপনে কাজ করছেন, সরাসরি তো না।”
তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পরে যে পরিবর্তন, তারা সামনে আসতে পারছেন না। সেটা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। সেটা নির্বাচনের পরেও বলতে পারবেন না যে দুই দলীয় রাজনীতি নতুন কোনো ধারার মধ্যে প্রতিস্থাপিত হল কি না।”
রাজনীতির পরিস্থিতি বোঝার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর গণতান্ত্রিক যাত্রায় দিকে চোখ রাখার কথা বলছেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতি এখন যে অবস্থায় আছে, সামনে নির্বাচন। নির্বাচনটা যদি বানচাল না হয়, ঠিকঠাক মত হয়, একটা স্থিতি আসবে। আমাদের দেশে যদি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হত, তাহলে আজকে আমরা অন্য জায়গায় চলে যেতে পারতাম। দেখা যাক।”

খালেদা-হাসিনা দ্বৈরথ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিন দশকের বেশি সময় ধরে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই ব্যক্তি হলেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। দেশ ও দেশের বাইরেও তারা পরিচিতি ‘দুই নেত্রী’ হিসেবে।
পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে তারাই রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ঠিক করে দিয়েছেন।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনে একটা সময়ে পর্যায়ক্রমে সরকার প্রধান হয়ে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। একজন যখন সরকার প্রধান হয়েছেন, অন্যজন তখন থেকেছেন বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকায়, রাজপথে।
এক সময় তাদের বৈরী সম্পর্ককে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ হিসেবেও চিত্রিত করেছে।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা নেতৃত্বে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থান নিয়ে মুখোমুখি থেকেছে দশকের পর দশক।
২০০৪ সালের একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলায় ‘হাসিনাকে হত্যার চেষ্টার জন্য’ আওয়ামী লীগ দায়ী করে আসছে বিএনপিকে।
অন্যদিকে বিএনপিও ‘খালেদার অসুস্থতার জন্য’ হাসিনাকে দায়ী করেছে।
২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে উৎখাত হন খালেদা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়।
রাজনৈতিকভাবে সেই চাপের সময়ে খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় একের পর এক মামলা।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাকে কারাগারে পাঠায় আদালত। এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তার সাজার রায় হয়।
এর দুবছর পর কোভিড মহামারীর সময়ে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ অনেকটা আকস্মিকভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয় খালেদা জিয়াকে। শর্ত অনুযায়ী তাকে থাকতে হয় গুলশানের বাসায়, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও তার ছিল না।

২০২০ সালে গুলশানের বাসায় ফেরার পর বেশ কয়েকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কয়েক দফা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারও হয় তার শরীরে। সে সময় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে খালেদার পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন করা হলেও সাড়া দেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় সংবাদ সম্মেলনে খালেদার হাসপাতালে যাওয়ার সমালোচনা করতেও দেখা গেছে শেখ হাসিনাকে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওই বছর ৭ অগাস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।
পরে উচ্চ আদালত তাকে দুই মামলা থেকেও খালাস দেয়। ফলে তার দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হওয়ার কালিমা ঘোচে। আওয়ামী লীগের সময়ে করা বিভিন্ন মামলা থেকে মুক্ত হন খালেদার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারাও।
এর মধ্যে চলতি বছর জানুয়ারিতে লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আসেন খালেদা জিয়া। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার।
সোমবার ছিল নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। বিএনপির অন্যান্য প্রার্থীদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার নামেও তিন আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়।
এদিকে প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে গত ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সেখানেই আছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশই এখনও আত্মগোপনে।
এর মধ্যে একের পর এক মামলার আসামি করা হয়েছে শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে শেখ হাসিনাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কারদণ্ড হয়েছে প্লট দুর্নীতির মামলাতেও।
কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করায় এবার নির্বাচনও করতে পারছে না তারা।

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতি
বড় একটা সময় বাংলাদেশে নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অথবা তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে বিএনপি ও সমমনারা দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় ওই দুই নির্বাচন হয়ে গিয়েছিল একতরফা।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবার তারা ভোটে নেই। আওয়ামী লীগের জোট শরিকরাও মাঠে নেই। তবে তাতে একতরফা ভোটের মত পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তাতে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
এর মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা সমন্বয়কদের নেতৃত্বে ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ঘর গোছানোর চেষ্টা করছে।
তবে জামায়াতের সঙ্গে তাদের নির্বাচনি জোটের ঘোষণায় এনসিপির তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কবর রচিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
বিএনপি ও জামায়াত আলাদা দুটো ‘সমঝোতা জোট’ গঠন করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছোট-বড় অনেক রাজনৈতিক দল এখন এই দুই প্রধান শক্তির বলয়ে বিভক্ত।
বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম,নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), ইসলামী ঐক্যে জোট, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এনপিপি ও গণঅধিকার পরিষদ।
বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা নেতা–কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদও দল ছেড়ে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কয়েক মাস আগে থেকেই ধর্মভিত্তিক আরো সাতটি দল নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল।
আট দলের এই জোটে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
সর্বশেষ তরুণদের দল এনসিপি, অলি আহমেদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) জামায়াতের এই জোটের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে।
উগ্র ডানপন্থার উত্থানের সম্ভাবনায় মধ্য ও উদারপন্থি অনেকে বিএনপিতে আশ্রয় খুঁজতে চাইছেন। কিন্তু এই বিএনপিই যে জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে শেকড় ছড়াতে সহায়তা দিয়ে গেছে, এমনকি সরকারেও শরিক বানিয়েছে, সে কথাও তাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে।
নতুন নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আগামী দিনগুলেতে জামায়াত প্রশ্নে কোন অবস্থান নেবে, সেটাও রাজনীতির গতিপথ ঠিক করে দিতে ভূমিকা রাখবে।
রাজনীতির বিশ্লেষক, সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মনে করেন, সামনে এখন ‘দুটো রাস্তা’ খোলা আছে।
“একটা হল যে ডানপন্থিদের সঙ্গে দেশের বাস্তবতা এবং দেশের অধিকাংশ মানুষকে একটা লড়াই, সংগ্রাম, বোঝাপড়া করে অস্থিরতার মধ্যে দেশ যাবে।
“আর এই নির্বাচন বা যত দ্রুত পারা যায় সকলের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির দুয়ার খুলে দিয়ে আওয়ামী লীগসহ দুয়ার খুলে দিয়ে দেশে গণতন্ত্র এবং পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিটাকে স্থিতিশীল করার দিকে অগ্রসর হওয়া।”