Published : 03 Nov 2025, 11:43 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ঘোষণা করা ১০টিতে এবার প্রথম ছয়জন নতুন মুখকে দেখা যাবে ধানের শীষের প্রতীকে লড়তে, যাদের মধ্যে পিতার উত্তরসূরী হিসেবে দলের টিকেট পাচ্ছেন দুইজন।
সোমবার বিএনপির প্রকাশ করা প্রথম পর্যায়ের প্রার্থী তালিকায় চট্টগ্রাম জেলার চারটি আসনে ২০১৮ সালের প্রার্থীদের ওপরই ভরসা রেখেছে দলটি।
আর জোটের শরিক ও দলীয় বিরোধের জেরে ছয়টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়নি। এরমধ্যে একটি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার পর সংবাদ সম্মেলনে তা আবার ফাঁকা রাখার কথা বলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা ২৩৭ জনের তালিকায় দেখা যায়, ২০১৮ সালের প্রার্থীদের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম-১, চট্টগ্রাম-১২ ও চট্টগ্রাম-১৩ আসনে দলের প্রার্থী অপরিবর্তিত আছে। আর চট্টগ্রাম-১০ আসনে অতীতে অন্য আসন থেকে নির্বাচন করে জিতে আসা সাবেক এক সংসদ সদস্যের ওপর ভরসা রেখেছে বিএনপি।
আর ফাঁকা রাখা ছয় আসনের মধ্যে অন্তত তিনটিতে দলের একাধিক শক্তিশালী নেতা আগ্রহী আছেন। তাছাড়া পরে জোটের শরিকদের হিসাব নিকাশের বিবেচনায়ও দুটি আসন খালি রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপির রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।
এরমধ্যে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ), চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) ও চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে দলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী।
অপরদিকে বরাবর আলোচনায় থাকা চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি না হলেও এটিতে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
এছাড়া চট্টগ্রাম -১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া আংশিক) এবং চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) এই দুই আসনে ভবিষ্যতে জোট গঠনের চিন্তা থেকেই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি বলে ধারণা করছেন স্থানীয় নেতা ও সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাকি ছয় আসনের দলের প্রার্থী দ্রুত ঘোষণা করা হবে।এছাড়া জোটগতভাবে নির্বাচনের বিষয়ও রয়েছে। সেকারণে সব আসনের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি।
প্রার্থি নির্বাচনে কোনো ধরনের জটিলতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে জোটগতভাবে ছেড়ে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০১৮ সালেও এই দুটি আসন জোটসঙ্গীদের ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। চট্টগ্রাম-১৪ আসনটিতে ২০১৮ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে এলডিপির নেতা অলি আহমদ এবং চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আ ন ম শামসুল ইসলাম ধানের শীষ নিয়ে ভোটে লড়েছিলেন।
চার পুরনোয় ভরসা
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ১২টিতে ছিল বিএনপির প্রার্থী। এছাড়া দুটি আসনে জোটসঙ্গী এলডিপির, একটিতে জামায়াতে ইসলামীর এবং একটিতে কল্যাণ পার্টির প্রার্থী ছিল।
চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার খ্যাত চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিন। ২০১৮ সালেও তিনি এই আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ফেব্রুয়ারির আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য এবারও দলের মনোনয়ন পেয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলা পটিয়া নিয়েই চট্টগ্রাম-১২ আসন। এখানে ২০১৮ সালে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন ব্যবসায়ী নেতা এনামুল হক এনাম। পটিয়া উপজেলা বিএনপির এই আহ্বায়ককে এবারও প্রার্থী করা হয়েছে।
কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের নগরীর উপকণ্ঠের চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনটি। এখানে ২০১৮ সালে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন সারোয়ার জামাল নিজাম। সাবেক এই সংসদ সদস্যের ওপর এবারও ভরসা রেখেছে বিএনপি।
নগরীর কেন্দ্রস্থলের আরেক আসন চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলি, হালিশহর ও খুলশী)। এখানে ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মারা যান। এ আসনে আসন্ন নির্বাচনে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেকমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে বিএনপি। অতীতে চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-১০ ও চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
প্রথম যারা
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আজিম উল্লাহ বাহার। এবারও বাহারসহ পাঁচজন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। সোমবার ঘোষিত তালিকা অনুসারে এবার দলের মনোনয়ন পেয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার আলমগীর।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনটি পরিচিত শিল্পাঞ্চল হিসেবে। এখানে ২০১৮ সালে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। বিএনপির চেয়ারপার্সনের এই উপদেষ্টাকে বাদ দিয়ে প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করেছে উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাউদ্দিনের।
২০১৮ সালে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনটি জোটসঙ্গী কল্যাণ পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। সেসময় কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম সেখানে প্রার্থী ছিলেন।
এবার এই আসনে দলের মনোনয়ন চান বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এসএম ফজলুল হক, সাবেক হুইপ ও সংসদ সদস্য সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা এবং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। দল বেছে নিয়েছে মীর হেলালকে। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের পুত্র।
নদী-পাহাড় ঘেরা চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে ২০১৮ সালে প্রার্থী ছিলেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে এলডিপির মো. নুরুল আলম। এই আসনটিতে আগে একাধিকবার নির্বাচন করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এবার বিএনপি রাঙ্গুনিয়াতে তার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে দলের প্রার্থী করেছে। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনটি নগরীর কিছু এলাকা ও বোয়ালখালী উপজেলা মিলে। ২০১৮ সালে এখানে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সেসময় নগর বিএনপির সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ান। এবার চট্টগ্রাম-৮ আসনে নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে ২০১৮ সালে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। প্রয়াত এই নেতার ছেলে এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা এবার দলের প্রার্থী।
আসন ফাঁকা ছয়টি
নগরীর প্রাণকেন্দ্রে কোতোয়ালী-বাকলিয়া অঞ্চল নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৯ আসন। চট্টগ্রামের এই আসনটিতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০১৮ সালে প্রথমবারের মত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণকরা হয়।
সেবার এই আসনে প্রার্থী ছিলেন বিএনপির নগর সভাপতি শাহাদাত হোসেন। ধানের শীষের প্রার্থী কারাগারে থেকেই নির্বাচন করেছিলেন সেবার। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র তিনি। তিনিসহ মোট ৫ জন এই আসনে আসন্ন নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী।
এই আসনে ডা. শাহাদাত, নগর বিএনপি নেতা আবুল হাশেম বক্কর, আবু সুফিয়ান, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা সামশুল আলম এবং আহমদুল আলম চৌধুরী রাসেল মনোনয়ন প্রত্যাশী।
তবে সোমবার প্রার্থীদের নাম ঘোষণার সময় চট্টগ্রাম-৯ আসনে আবু সুফিয়ানের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে ফাঁকা রাখার কথা বলেন মির্জা ফখরুল। প্রকাশিত তালিকায় এই আসনে কোন প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দর ও দুটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসন। এই আসনে ২০১৮ সালে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি এবারও এই আসনে আগ্রহী ছিলেন। তবে চট্টগ্রাম-১১ আসনে সোমবার প্রার্থী হিসেবে কারো নাম ঘোষণা করেনি বিএনপি। এখানে প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে এবং জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাঈদ আল নোমান দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনটি মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। এই আসনে ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন একাধিকবারের সাবেক সাংসদ মোস্তফা কামাল পাশা। এবার তিনিসহ সাতজন মনোয়ন প্রত্যাশী। কিন্তু এই আসনে প্রার্থী হিসেবে কারো নাম ঘোষণা করা হয়নি।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনটিতে ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন জসীম উদ্দীন সিকদার। এবারও তিনি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।
এই আসনে এবার বিএনপির দুই জ্যেষ্ঠ নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং গোলাম আকবর খন্দকার প্রার্থী হতে আগ্রহী। ইতিমধ্যে গত ১৫ মাসে দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে একাধিক সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। সংঘাতপূর্ণ এই সংসদীয় আসনের প্রার্থীর নাম পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয় সোমবার।
চন্দনাইশ উপজেলা ও সাতকানিয়া উপজেলার আংশিক নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৪ আসনটি। এখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে এলডিপির নেতা অলি আহমদ ছিলেন ২০১৮ সালের প্রার্থী।
এবার এই আসনে এবিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ডা. মহসিন জিল্লুর করিম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক ও চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এবং বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম রাহী দলের মনোনয়ন চান। আসনটিতে সোমবার প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি।
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ২০১৮ সালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আ ন ম শামসুল ইসলাম ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে জোটের প্রার্থী ছিলেন।
এবার দলের প্রার্থিতা প্রত্যাশা করেছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মো. মহিউদ্দিন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জামাল হোসেন, লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা আমিন ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনেও দলের প্রার্থী তালিকা পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, কয়েকদিন আগে তারেক রহমানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে সভা হয়েছিল। সেখানে অনেকেই দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তাদের অনেকেই পেয়েছেন আবার কেউ কেউ পাননি। তাতে ঘোষণা না করা ছয় আসনের প্রত্যাশীরাও ছিলেন।