Published : 27 Jul 2025, 05:58 PM
পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেছেন, “এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু… এটা শুধু পরবর্তী সরকার নয়, জনগণকেও এ বিষয়ে সজাগ থাকা উচিত।”
রোববার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক সেমিনারে কথা বলছিলেন ফখরুল। ‘পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি’ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
ফখরুল বলেন, “প্রায় আট কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা পদ্মা ব্যারেজ ও পদ্মা সেতুর সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘ সাতবার সম্ভাব্যতা যাচাই হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
“আজকে ফারাক্কা ব্যারেজ বা ফারাক্কা বাধের বিরূপ প্রভাবে শুধু ফরিদপুর বা রাজবাড়ীর সমস্যা নয়, এটা আজ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের সমস্যা। আমাদের নাগরিকদের আজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সর্বস্তরের মানুষকে তাদের দাবি নিয়ে দাঁড়াতে হবে। সেটা যে সরকারই আসুক, তাদের বলতে হবে–‘এটা আমরা চাই’।”
বিএনপি মহাসচিব বলেন, “দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনেক আগেই কমিটমেন্ট (রয়েছে)।”
ফারাক্কা বাধের যে বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফখরুল বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের অনেক এলাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ায় মানুষ সেখান থেকে চলে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের বহু মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছে, কারণ তা আর বসবাসের উপযোগী থাকছে না।
কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষায় গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে আন্তঃসীমান্ত নদী গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ভারত। ওই গঙ্গাই বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নাম নিয়ে বঙ্গোপসাড়রে পড়েছে।
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই বাংলাদেশে পদ্মা ও শাখানদীগুলোতে পানি সংকট শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রভাব হয়েছে মারাত্মক।
শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করা হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ ও নৌচলাচলে সমস্যা হয়। আবার বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ওই বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়েছে।
ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনার জন্য পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশকে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
দেশের প্রধান এ নদীতে পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে তা সেচ, জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহারের জন্য রাজবাড়ীর পাংশায় এই ব্যারেজ তৈরির কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়।
প্রস্তাবিত এ ব্যারেজে বর্ষা মৌসুমে আসা পদ্মার পানি সংরক্ষণ করতে রাজবাড়ী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধার নির্মাণ করা হবে। ২.৯ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি ধারণক্ষম এ জলাধারের গভীরতা হবে ১২.৫ মিটার।
বিগত আওয়ামী লী সরকারের সময়ে বলা হয়েছিল, দুটি চীনা কোম্পানি এবং জাপানের একটি কোম্পানি এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে আগ্রহী। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সে সময় ভারতকেও এ প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে চাওয়া হয়েছিল। তবে বিষয়টি পরে আর এগোয়নি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আইনুন নিশাত সেমিনারে বলেন, “আমি আপনাদের বলতে চাচ্ছি, গঙ্গা ব্যারেজটা না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভবিষ্যত খুব খারাপ অবস্থায় যাবে। আপনারা নিজের দেশটাকে কতটুকু জানেন? জানেন না। সাতক্ষীরা-খুলনা-বাগেরহাট-বরগুনার দক্ষিণাংশে ইতোমধ্যে জনসংখ্যা গ্রোথ ইজ নেগেটিভ। মানুষ ওখান থেকে পালাচ্ছে, কারণ সেটা বসবাসযোগ্য নেই।
“জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা যোগ করলে এখন থেকে ৩০/৪০ বছরের ওই অংশগুলো বসবাসযোগ্য থাকবে না। কাজেই এখন থেকে যদি চিন্তা করতে হয়, তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাংশকে পানি দিতে হবে।”
পদ্মার পানিবণ্টন চুক্তির প্রসঙ্গ ধরে আইনুন নিশাত বলেন, “ভারতে সাথে চুক্তির ফলে ১৯৯৬ সাল থেকে আমরা যতটুকু পানি পাচ্ছি, তার কিছু অংশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা। তার থেকে ১৫ হাজার… আচ্ছা ১০ হাজার কিউসেক পানি যদি যশোর-খুলনায় দিতে পারি, তাহলে ওই এলাকাটা রক্ষা পাবে।
“এটা কেন হয়নি? এর একটাই উত্তর। এর পেছনে রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। মূলত সিদ্ধান্তটা হতে হবে রাজনৈতিক ভিত্তিতে।”
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সেতু নির্মাণ করবেন? এটা হবে কি হবে না, তা ১৮ আনাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমরা এখানে যারা আছি, আমরা কারিগরি বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাই। কিন্তু সিদ্ধান্ত আসে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকেই।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মনীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ, কেউ বলে ৩৭% মানুষ-জমি প্রকটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা সকলেই বুঝি কী হয়েছে।
“আমরা কাছে আশ্বর্য লাগছে, আইনুন নিশাত ভাইয়ের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে যে ৩০ বছরের (গঙ্গা চুক্তি) হয়েছিল, সেটি আগামী বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপনারা কি কেউ আলোচনা শুনেছেন, এই চুক্তিকে আগামী দিনে কী ধরনের দর কষাকষি করে আমার পক্ষে রাখার চেষ্টা করব? সেটার কারিগরি বা অন্য ধরনের কোনো আলোচনা আমি শুনতে পাই না।”
আগামী বছর নতুন সরকার এলে বাংলাদেশের যথোপযুক্ত স্বার্থ রক্ষা করে নতুন গঙ্গা চুক্তির আলোচনা শুরু করবে–এমন আশা প্রকাশ করে এখন থেকেই সেজন্য প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দেন দেবপ্রিয়।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “যদি ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হয়, যে সরকার আসবে, বর্তমানে যে বাজেটটি চলছে, সেই বাজেটটি তাকে সংশোধন করতে হবে। আমি আশা করব, সেই সংশোধনের ভেতরে এই প্রকল্পটি হালনাগাদ করার ব্যবস্থা করা হবে।”
ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান সেমিনারে বলেন, “বাংলাদেশ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে আছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কাঠামোর বিষয় নয়, আমাদের আগামীর রাজনীতির পথ চলার বৈশিষ্ট্য কী হবে, সেটাই এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
“সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট ও যোগ্য যে ভূমিকা, সেটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রাজনৈতিক শাসনগুলো পরিচালিত হবে এবং সেটা জনমানুষের মধ্যে তাদের আকাঙ্ক্ষার সাথে মিলিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিগুলো তৈরি হচ্ছে, সেটাও দেখার বিষয়।”
‘পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি সাবেক সাংসদ আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সভাপতিত্বে এই সেমিনারে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মিজানুর রহমান মিনু, চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান, সাবেক প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন, ‘পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির জাতীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর হোসেন খান জালাল বক্তব্য দেন।