Published : 15 Sep 2025, 01:55 AM
‘নতুন বাংলাদেশে’ ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড় বিজয় জাতীয় রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসছে কি না, সে আলোচনা সামনে এসেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সুযোগে প্রায় তিন দশক পর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের এই সহযোগী ছাত্র সংগঠনটির আধিপত্যকে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিকরাই বা কীভাবে দেখছেন?
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সাবেক দুজন নেতা ও জামায়াত, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চারজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

তাদের কেউ বলছেন, শিবিরের এই বিপুল বিজয় জাতীয় রাজনীতি ও নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। কেউ বলছেন, এটা কোনো ‘মাস্টারপ্ল্যানের’ অংশ কি না, ‘মানুষকে তা ভাবিয়ে’ তুলেছে।
তাদের পর্যবেক্ষণ হল, আওয়ামী লীগের শাসনামলে যারা প্রকাশ্যে সরকাররের বিরোধিতা করে আন্দোলনে ছিল তাদের ভরাডুবি হয়েছে। এছাড়া অন্য সংগঠনগুলোর মধ্যে কোন্দল, বিভক্তি, নেতিবাচক কর্মকাণ্ড, দুর্বল কৌশলের কথাও বলেছেন তারা।
অপর দিকে, ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশ ও সাধারণ ছাত্র বেশে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কৌশল, শৃঙ্খলা ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার কারণে ছাত্রশিবির অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থেকেছে।
পাশাপাশি ভোটে ‘অনিয়ম ও কারচুপি’ এবং রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের ‘ষড়যন্ত্রের’ কথাও বলেছে কেউ কেউ। আর কেউ সামনে এনেছেন ‘পরিকল্পিত রাজনীতির’ বিষয়টি।
দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত মূল্যায়ন করে সামনের দিকে এগোনোর কথাও বলেছেন তারা।
ছাত্রদলের ভরাডুবি, যা বলছেন ডাকসুর সাবেক দুই নেতা
ছয় বছর পর গেল ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। রাত পেরিয়ে পরের দিন সকালে মিলেছে ভোটের ফল।
ডাকসুর ২৮টি পদের ভিপি ও জিএসসহ ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে নয়টিতে শিবিরের ‘ঐকবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ বড় জয় পেয়েছে। সব মিলিয়ে ২৩টি পদ পেয়েছে এই প্যানেল।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রবেশপথগুলোতে রাজনৈতিক লোকজনের জড়ো হওয়ার ঘট্না, ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ কিছুটা উত্তেজনা ছড়ালেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ৪০ হাজার ভোটারের ৭৮ শতাংশ ভোট দিয়েছেন।
এ নির্বাচনের কেন্দ্রীয় সংসদে ভোট বিবেচনায় ছাত্রদল দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও হল সংসদে সুবিধা করতে পারেনি। জগন্নাথ হল ছাড়া সবখানেই তাদের হারতে হয়েছে। তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) দু্টি হলে ভিপি, ছয়টি হলে জিএস এবং তিনটি হলে এজিএস পদে জয় লাভ করে।
বাম ধারার সাত সংগঠনের প্যানেল প্রতিরোধ পর্ষদের একজন ডাকসুর সদস্য পদে জয় পেয়েছেন। ছাত্র অধিকার পরিষদ জয় পেয়েছে একটি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি পদে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ-জাকসুর বৃহস্পতিবারের ভোটের ফল মিলিছে ৪৮ ঘণ্টা পর শনিবার সন্ধ্যায়। ১৯টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ১৫টি জিতেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল। বাকি চারটি পদের মধ্যে ভিপিসহ তিনটি পদে স্বতন্ত্র এবং একটিতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-বাগছাস প্রার্থী জয় পেয়েছেন। সবমিলিয়ে ২৫ পদের ২০টিতেই জয় পেয়েছে শিবিরের প্যানেল।

ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান থেকে থেকে ভোট গণনার যন্ত্র (ওএমআর মেশিন) কেনা, ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেলা ও ব্যালট সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে। এর পরেও ‘অনিয়ম’ ও ‘কারচুপির’ অভিযোগ আসে। ভোট বর্জন করে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলসহ পাঁচটি প্যানেল। পদত্যাগ করেন দুজন নির্বাচন কমিশনার ও তিন নির্বাচন কর্মকর্তা।
জাকসুতে ভোটের ফলে ছাত্রদল আরও খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হয়। বেশিরভাগ পদেই তারা চতুর্থ হয়।
ডাকসুতে ছাত্রদলের সাবেক এজিএস নাজিমুদ্দিন আলম বলেন, প্রথমত হল, বিএনপি একটি অনেক বড় রাজনৈতিক দল। এখানে এই দলের কিছু নেতাকর্মী, যাদের সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের মধ্যে দল সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকাও রয়েছে। ছাত্রদলের ‘কিছু কিছু নেতিবাচক’ দিক থাকলেও ইতিবাচক দিকই বেশি। কিন্তু মানুষ এখন ইতিবাচক দিক নিয়ে চিন্তাভাবনা ‘কম করে’। সবসময় নেতিবাচক বিষয়ের প্রতিই ‘আসক্ত’।
তার ভাষায়, দ্বিতীয়টা হল-যেহেতু বাংলাদেশে একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সকল দলের অংশগ্রহণে, সকলের আন্দোলনের একটা ফসল এই গণতন্ত্র।
“এখন এখানে আওয়ামী লীগ তো চাইবে যে, যেকোনো মূল্যে একটা ষড়যন্ত্র করতে। … আওয়ামী লীগের অনেক ভোট, বেশিরভাগ শিবিরেই পড়ছে। এটা সবাই জানে।”
ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল কোন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড না করলেও ‘অন্য খানের’ প্রভাব সামাজিক মাধ্যমের কারণে ক্যাম্পাসগুলোর ভোটে পড়েছে বলে মনে করেন বিএনপি এই নেতা।
নাজিমুদ্দিন আলমের ভাষ্য, “কিছু কিছু নেতাকর্মী আছেন, যারা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটান। কিন্তু এতে পুরা দলের উপরে দায় পড়ে এবং বিএনপির যে এত বছর একটা পার্টি যারা জনগণের কল্যাণে কাজ করছে, কিন্তু মানুষ বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে এসবের কারণে। গত এক বছরে বিএনপির জাতীয় পর্যায়ে যে জনপ্রিয়তা ছিল, সেটা এখন অনেকটাই চলে গেছে।”
ছাত্রদলের নিজেদের মধ্যে দলাদলির কারণে ডাকসুতে হারতে হয়েছে তাও স্বীকার করেন তিনি।
তবে ছাত্রদলের মাঝে পুরনো ছাত্রলীগের ভূমিকা দেখতে চান না বলেই শিক্ষার্থীরা আদর্শিকভাবে পছন্দ না করলেও শিবিরকেই বেছে নিয়েছে বলে মনে করেন ১৯৮৯-৯০ মেয়াদে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মুশতাক হোসেন।
তার ভাষ্য, “গণঅভ্যুত্থান তো ছাত্ররা করল। তখন কোনো দলীয় ‘কালারের’ ভেতরে গণঅভ্যুত্থান করা তারা পছন্দ করে নাই, দেশের জন্য পছন্দ করে নাই। তারা সফলও হয়েছে। এখনও সেই মনোভাবই আছে তাদের মধ্যে।
“এর মধ্যে তারা দেখেছে যে সবচেয়ে বৃহত্তর ছাত্র সংগঠন হচ্ছে ছাত্রদল। তারা গণঅভ্যুত্থানে পরেও দায়িত্বশীল আচরণ করে নাই। ক্যাম্পাসের ভেতরে হয়তো আমরা কোনো দখল, দখলের রাজত্ব দেখি নাই। কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরে তাদের কর্মীরা নানা রকম কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে। সাধারণ ছাত্ররা একেবারেই তা গ্রহণ করে নাই। জনগণও গ্রহণ করে নাই।”
তাদের কর্মকাণ্ড ছাত্রলীগের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলেও মনে হয়েছে মুশতাক হোসেনের। জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা বলেন, “কোনো কিছু তাদের দায়িত্বে আনতে পারে না। মব সন্ত্রাস থেকে শুরু করে, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে সবকিছু করেছে, যেটা আগেকার ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ করতো।
“ফলে তারা সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠন হওয়ার পরেও তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে তারা (শিক্ষার্থীরা) আরেকটা শক্তির আশ্রয় নিয়েছে।”

‘অগণতান্ত্রিক’ সময়ে ‘অন্ধকারের শক্তি’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ষাটের দশক থেকে শুরু করে সবসময়ই বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতির চর্চা ছিল সম্মুখসারিতে।
আবাসিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভৌগলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শিক্ষার কাঠামোগত উৎকর্ষতার ফলে প্রগতি, মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতির চর্চা ছিল হাতে হাত ধরে।
এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটের বাক্সে বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলো কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি।
কেন পারেনি? এর এখনও ‘পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন’ করে উঠতে পারেননি বলেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স।
তারা তথ্য-উপাত্ত নির্ভর মূল্যায়ন করবেন, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “কিন্তু আমার প্রথম পর্যবেক্ষণ হচ্ছে যে দীর্ঘদিন এইখানে তো রাজনীতির কোনো আবহাওয়া ছিল না। গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখানে কোনো রাজনীতির আবহাওয়া নেই।
“যখন অগণতান্ত্রিক আবহাওয়া থাকে, তখন কিন্তু এধরনের অন্ধকারের শক্তি, যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, যাদের বিশাল অর্থ আছে, তারা গড়ে ওঠার সুযোগ পায়। সেটা তারা (ছাত্রশিবির) গড়ে উঠেছে, সেটা একটা প্রমাণ পাওয়া গেল। আমি এটাকে প্রধান বিষয় মনে করি যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অনুপস্থিতিতে অগণতান্ত্রিক শক্তি বেড়ে উঠেছে।”
তবে শিক্ষার্থীরা কেন এটা রুখে দাঁড়ালো না, সে মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রিন্স।
“এত সবের পরেও অনেক সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী তারা কেন এটা রুখে দাঁড়ালো না বা কেউ কেউ কেন পক্ষে গেল- সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে মূল্যায়ন করে আগামীতে এগোতে হবে।
“তরুণ প্রজন্মের এই বিষয়গুলো আমাদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। যার জন্য আমাদেরকে বিশেষ বিবেচনা করে আগামীতে এগোতে হবে এবং একটু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেই, কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটল, সেটাও আমাদের ভাবতে হবে।”
তবে এর জন্য বিগত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকেই দুষছেন তিনি।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের এই নেতা বলেন, “এর আগে যারা ক্ষমতাসীন ছিল, আওয়ামী লীগ তারা মুক্তিযুদ্ধের নামে স্বাধীনতার নামে যে কাজগুলো করেছে সেটা ‘যথাযথ ছিল না’। এবং তাতে নতুন প্রজন্মের কাছে মনে হইতে পারে, মুক্তিযুদ্ধ মানে যেন দুর্নীতি-লুটপার্ট, স্বাধীনতা মানে দুর্নীতি-লুটপাট, জোর করে ক্ষমতা দখল।
“সুতরাং এগুলো অনেক তরুণ প্রজন্মকে হয়তো বায়াস করেছে। এগুলো আমাদের বিবেচনা করে আগামী দিনের পথচলা ঠিক করতে হবে।”

প্রকাশ্য নেতারা কেন হারলেন?
আওয়ামী লীগ আমলে যতগুলো বড় আন্দোলন হয়েছে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন অন্যতম। এ আন্দোলনের নেতাদের সংগঠনের কর্মীরা সে সময় থেকে বিগত সরকারের পুরোটা সময় হামলা ও জেল-জুলমের শিকার হয়েছেন। সে আন্দোলন থেকে উঠে এসে ডাকসুর ভিপিও হন নুরুল হক নুর।
তবে তার দল গণঅধিকার পরিষদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামীন মোল্লা ডাকসুর নির্বাচনে এসে হেরেছেন। অথচ এ নেতা সাত মাস কারাভোগও করেন আওয়ামী লীগ আমলে।
এছাড়াও যারা প্রকাশ্যে এসে চব্বিশের আন্দোলন সফল করেছেন তারাও হেরেছেন বাজে ভাবে।
বাগছাসের বাইরেও তাদের কেউ কেউ অন্য প্যানেলে নির্বাচন করাকে ‘পরিকল্পিত রাজনীতির’ অংশ মনে করেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান।
শিবিরের নাম না নিয়ে এ নেতা বলেন, “আপনি যদি সাংবাদিক হিসেবে একটু দেখেন যে, এনসিপির যে নেতা আসলে মানে জিএস প্রার্থী হলেন, তার পিছনে কারা আছে। কারা তাকে নির্ধারণ করল? এক।
“দ্বিতীয়ত হল, এই যে এজিএস পদপ্রার্থী, তাদের অনেকেকে একেক প্যানেল থেকে দাঁড় করিয়ে দিল।
“এগুলো যদি আপনি একটু পর্যবেক্ষণ করেন, আপনি আসল তথ্য পেয়ে যাবেন। মূলত এই কারণে আন্দোলনের সামনের মুখ যারা, তাদের প্রতি অনাস্থার জায়গাটা তৈরি করার জন্য, এটা আসলে করেছে। একটি পরিকল্পিত রাজনীতি হয়েছে, যেটা আমি মনে করি।”
রাশেদ খান এ ক্ষেত্রে এনসিপিকে দায়ী করছেন। তিনি বলেন, “এনসিপি নিজেও জানে, কিন্তু এনসিপির নেতাকর্মীরা এই জিনিসটা আসলে নানান কারণে প্রকাশ করতে পারতেছে না এবং আমি নিজেও জানি। এইখানে একটা নোংরা রাজনীতি হয়েছে।”
এ কারণে জুলাই আন্দোলনে ‘নয় দফার ঘোষক’ আব্দুল কাদেরকে ভিপি পদে হারতে হয়েছে। এর জন্য ডিবি হেফাজতে যে ছয়জন সমন্বয়ক তুলে নেওয়া হয়েছিল, তার একজন জিএস পদে আবু বাকের মজুমদারকে হারতে হয়েছে বলে দাবি করেন ২০১৯ সালে ডাকসুতে নুরু-রাশেদ পরিষদের এই জিএস প্রার্থী।
এর বাইরে প্রকাশ্যে রাজনীতি না করার সুবিধাটা ছাত্রশিবির পেয়েছে তুলে ধরে রাশেদ বলেন, “আরেকটা বিষয় হলো যে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ বা এমনকি আব্দুল কাদের, তারাও থাকতে পারে নাই। নাহিদ ইসলামরা থাকতে পারেন নাই। কারণ তারা তো আমাদের সাথে ১৮ সাল থেকে সংগ্রাম করে আসছে।
“কিন্তু বাঁধনের (রক্তদান সেবা সংগঠন) সাথে যুক্ত হয়ে, সাংবাদিক সমিতির সাথে যুক্ত হয়ে, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে, একমাত্র শিবিরই ক্যাম্পাসে ছিল। যে কারণে শিবিরের সাথে শিক্ষার্থীদের একটা সংযোগ সম্পর্ক ছিল। তারা যে শিবির করে এটা তো কেউ জানত না।”
ছাত্রশিবিরের আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়ায় তারা ‘ওয়েলফেয়ার মেকানিজম’ করতে পারছে বলেও তিনি তুলে ধরেন।

সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে ‘বড় ভাই’ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের কর্মকাণ্ড চালানোর বিষয়টিও রাশেদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
তিনি বলেন, “শিবির কিন্তু রমজানের সময় রুমে রুমে ইফতার দিয়েছে, সেহরি দিয়েছে। আরেকটা জিনিস হল, যে সকল শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, অধিকাংশই তো নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তের সন্তান। জামায়াত এবং শিবিরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখান থেকে নিয়মিত স্কলারশিপ দেওয়া হয়।”
কোচিং সেন্টার পরিচালনাসহ শিবিরের বিভিন্ন ‘কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের’ কথাও তার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
শিবিরের শক্তিশালী আর্থিক কাঠামোর কথা তুলে ধরেন জাতীয় নাগরিক পার্টির-এনসিপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও।
পাশাপাশি এনসিপি সমর্থিত বাগছাসের দুর্বলতার কারণওে তার পর্যবেক্ষণে এসেছে।
আদীবের মতে, যারা শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলনের মূল নেতা ছিলেন, তারা জাতীয় রাজনীতিতে চলে যাওয়ায় তূলনামূলক নতুন নেতৃত্ব ছিল ছাত্র সংসদের নির্বাচনে। যেখানে নানাবিধ দুর্বলতাও তাদের ছিল। তবে হল সংসদে তা কাটিয়ে উঠতে পারায় সংগঠনটি ভাল সাফল্য পেয়েছে বলেও তার মত।
তবে অভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে বাগছাস একদম খারাপ করেনি, বরং ভালোই করেছে বলেও মনে করেন তিনি। তার দাবি, বাগছাস মোটামুটি ডাকসু-জাকসু দুই জায়গায়ই তারা ‘দ্বিতীয় অবস্থান’ অর্জন করছে। ডাকসুতে প্রায় ছয়টা হলের ভিপি, জিএস বা এজিএস বা এরকম কিছু এসেছে।
“আবার জাকসুতে ভিপি যে আসছে সেও কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক।”
জামায়াত কী বলছে?
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, “এটা খুবই পরিষ্কার যে দেশের যুবসমাজ অন্যায়, অসত্য, মিথ্যা এবং অগণতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যুবসমাজ যারা, আন্দোলন সংগ্রাম করে স্বৈরাচারকে হটিয়েছে, তারা ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে এবং এটাই তাদের মনোভাবের প্রতিফলন।
“যাদের বিজয়ী করেছে তারা ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী, নৈতিকতায় বিশ্বাসী এবং মূল্যবোধে বিশ্বাসী। সুতরাং এই শক্তি আগামী দিনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিবে- এটাই স্বাভাবিক।”
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা জামায়াতের সহযোগী সংগঠন হিসেবে ছাত্রশিবিরও একই ধারার রাজনীতি করে। পর্দা, ইসলামী রীতি-নীতি চর্চার ক্ষেত্রে তাদের কঠোর অবস্থান রয়েছে।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে নারীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্যানেলের প্রার্থীদের প্রচার চালাতে দেখা যায়। একসঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে শিবিরের গতানুগতিক রাজনীতি থেকে সরে আসার বার্তা দেয়।
এ ক্ষেত্রে শিবিরের রাজনৈতিক চর্চায় তাদের আদর্শের বিচ্যুতি ঘটল কিনা তা জানতে চাইলে মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, “ছাত্রশিবির তার মৌলিকত্ব থেকে কখনো বিচ্যুত হয় নাই।
“ছাত্রশিবির অত্যন্ত সুন্দরভাবে তাদের বক্তব্য, তাদের আচরণ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এবং ছাত্র-ছাত্রীরা সেটা গ্রহণ করেছে।”

রাজনীতিতে কী বার্তা?
দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের জয় রাজনীতি বা আগামী নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলতে পারে, জনপরিসরে এমন আলোচনা আছে।
রোববার ঢাকায় এক আলোচনা সভায় শিবিরের নাম না নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রশ্ন তুলেছেন, ডাকসু ও জাকসুতে একটি সংগঠনের বিজয় কোনো মাস্টারপ্ল্যানের অংশ কি না?
জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিশানা করে রাষ্ট্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সব মিলিয়ে কোনো একটা গভীর নীল নকশা তৈরি হচ্ছে কি না সেও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
“আমরা আওয়ামী লীগকে তাড়িয়েছি, এখন এদেরকে (বিএনপি) ঘায়েল করতে হবে…এই একটা কোনো ‘মাস্টারপ্ল্যান’ করা হয়েছে কি না, সেটা আজকে মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।”
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দুটো বিশ্ববিদ্যালয়েই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী। তারা ভোটের মাধ্যমে বিবর্তনের পূর্বাভাস দিয়েছে। এর প্রভাব গোটা বাংলাদেশের মানুষের উপর এবং নির্বাচনের উপর পড়বে।”
তবে বিএনপি নেতা নাজিমুদ্দিন আলম মনে করেন, এ নির্বাচন থেকে বিএনপি শিক্ষা নিলে আর তাদের নেতা তারেক রহমান সাংগঠনিকভাবে কঠোর অবস্থান নিলে, এ সংকট জাতীয় নির্বাচনের আগেই কেটে যাবে।
তার ভাষ্য, “এই ডাকসু-জাকসু নির্বাচন থেকে অনেক কিছুই বিএনপি শিখছে। এবং তারেক রহমান অনেক অনেক কিছুই বুঝতে পারছেন যে জনগণ এখন কী চাচ্ছে। তাকে আরো কঠোর অবস্থান নিতে হবে সাংগঠনিকভাবে।
“নির্বাচনের আগে আগে বিএনপি আর তারেক রহমান ও তার যারা নেতাকর্মী আছেন, সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। এবং সাংগঠনিক পর্যায়ে তিনি (তারেক রহমান) আরো কঠোর হবেন এবং কঠোর অবস্থানে যাবেন। তাহলে এ অবস্থার উন্নতি ঘটবে।”
এনসিপি নেতা আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “এনসিপি তো একটা গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা এবং এটা গণঅভ্যুত্থানও ঠিক না, এটা হচ্ছে গত ১০-১৫ বছর এখানকার যে রাজনৈতিক একটা নতুন শক্তির যে আবির্ভাব প্রয়োজন তার ধারাবাহিকতায় আত্মপ্রকাশ হইছে এনসিপির।
“ফলে ১০-১৫ বছরের যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে সেটার কারণে এনসিপির মাধ্যমে সেটা হয়তো এগোবে। কিছুটা কম-বেশি হবে।”
ডাকসুর সাবেক জিএস ও বাংলাদেশ জাসদের নেতা মুশতাক হোসেন বলেন, “এটার একটা রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। সেটা যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের নামে, স্বাধীনতা সংগ্রামের নামে আওয়ামী লীগ যে গত ১৫ বছর বিশেষ করে, শেষ ১০ বছর তথা ২০১৪ এর পরে তারা যে সমস্ত মানে, দেশটাকে পুরো একেবারে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় নিয়ে আসছিল। এর ফলে ক্ষতি করেছে তারা। মুক্তিযুদ্ধ চেতনাটা, অনেক সময় জয় বাংলা স্লোগানটা অত্যাচারের সমর্থক হয়ে গেছে।
“কাজেই তার বিপরীত আদর্শের লোক তারা শিবির হলেও আপাতত শিক্ষার্থীরা মেনে নিয়েছে। তাদের অতীত উপেক্ষা করেছে যে, এরা যাক।”
তবে আগামীর রাজনীতির জন্য, শিক্ষার্থীরা দেখবে শিবির তার মতাদর্শ চাপিয়ে দেয় কিনা, এমন মন্তব্য করে মুশতাক বলেন, “এখন তারা (শিক্ষার্থীরা) দেখবে, তারা (শিবির) ইসলামিক আইডিওলজি নিয়ে, তারা তাদের রাজনীতি চাপিয়ে দিতে চায় কিনা, ছাত্রদের উপরে।
“এক্ষেত্রে বাস্তবের বিরুদ্ধে যায়, এমন কিছু হলে সেটা তাদেরকে (শিবির) দ্রুত, মানে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। যেমন টিএসসিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাদের নেতাদের ছবি টাঙানো হলে প্রতিবাদ হয়েছে।”
সিপিবি নেতা প্রিন্স বলেন, “যদি এই ধরনের ‘অগণতান্ত্রিক পরিবেশ’ থাকে তাহলে তো কোনো গণতান্ত্রিক শক্তির, ধর্মের পক্ষ শক্তির সামনে আসা ‘খুবই কঠিন’। প্রগতির শক্তি সামনে আসা ‘খুবই কঠিন’। আমাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এবং সমস্ত জায়গায় যাতে একটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আবহাওয়া ফিরে আসে তার জন্য ‘লড়াই করতে হবে’।”
আরও পড়ুন:
তালগোলের জাকসু নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্য হল?
ডাকসুতে শিবিরের জয়ের নেপথ্যে কী, জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে?