Published : 17 Jan 2026, 01:43 AM
জামায়াতে ইসলামীর জোটে গেল না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, যারা ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার প্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। উল্টো জামায়াতের আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়ে একাই ভোট করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে জামায়াতের জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন সরে আসায় ভোটের হিসাব কি পাল্টে যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন সামনে আসছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন এক জোটে থাকলে ভোটে যে প্রভাব পড়তো, তা এখন অনেকটাই কমে আসবে।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ অবশ্য সন্দিহান, আসলেই ভোটের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব তৈরি করতে যাচ্ছে ইসলামপন্থি দলগুলো।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলোকে বিএনপির বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হচ্ছিল।

তবে শুক্রবার বিকালে ইসলামী আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলন থেকে জামায়াতের ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’র সঙ্গে না যাওয়ার ঘোষণা আসায় সেই সম্ভাবনা হোঁচট খেল।
আগের দিন বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের এই জোট নিজেদের মধ্যে ২৫৩ আসন ভাগাভাগির ঘোষণা দেয়। ইসলামী আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা করার পরও তারা আসেনি। বাকি ৪৭ আসন নিয়ে সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ার কথা বলা হয় জোটের তরফে।
কয়েক মাসের টানাপোড়েনের পর বৃহস্পতিবার সবশেষ জোটের সমঝোতা বৈঠকেও যায়নি ইসলামী আন্দোলন।
সংবাদ সম্মেলনে দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, তার দল জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ঐক্যে যোগ না দিয়ে ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে। সেইসঙ্গে বাকি ৩২ আসনে অন্যদের সমর্থন দেবেন তারা।
অর্থাৎ ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আসার সম্ভাবনা আপাতত বিলীন হয়ে গেল, যার সূচনা হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে বরিশালের চরমোনাইয়ে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাতে।

ইসলামী আন্দোলনের একাধিক নেতা বলেন, জামায়াতের জোটে দলটি যোগ না দেওয়ায় সারাদেশের বেশ কিছু আসনে প্রভাব পড়বে। জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করলে অন্তত শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ সৃষ্টি হত।
অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তাতে ১৯৭৯ সালের পর প্রথমবারের মতো জামায়াতের সঙ্গে ইসলামপন্থি দলগুলোর সম্মিলিত নির্বাচনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এর আগে বিভিন্ন সময় অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য হলেও জামায়াতের সঙ্গে ইসলামপন্থি দলগুলোর স্বতন্ত্র জোট গড়ে উঠেনি।
ইসলামপন্থি দলগুলোর নির্বাচনি ঐক্য প্রক্রিয়া চলার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন নিয়ে কয়েকটি জরিপ হয়েছে, যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থানের ইঙ্গিত রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ূম বলছিলেন, দেশের দুটি জাতীয় দৈনিকে দুটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলোর উদ্যোগে হওয়া জরিপে এসেছে ইসলামী আন্দোলনকে ভোট দিতে চায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে আমার দেশ পত্রিকার করা জরিপে বিএনপি ৩৪, জামায়াত ৩৩, এনসিসি ৭ ও ইসলামী আন্দোলন ৩ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
গেল ৫০ বছরের ভোটের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদে জামায়াত ছয়টি আসন জয় পায়।

‘বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির তিন দশক (১৯৭১-২০০০)’ শীর্ষক গ্রন্থে মো. এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী লিখেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বহুদলীয় রাজনীতির পথ খুলে গেলে ইসলামী ভাবধারার দলগুলো সক্রিয় হয়।
তিনি লিখছেন, ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দলবিধি ঘোষণার পর ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) গঠিত হয়। সেই দলে মূলত পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি), নেজাম-ই-ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা-কর্মীরা সমবেত হন এবং তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকেন। আইডিএল-মুসলিম লীগ জোট ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ২০টি আসন লাভ করে। প্রদত্ত ভোটের শতকরা ১০ দশমিক শূন্য ৭ ভাগ পায় এ জোট।
১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০টি আসনে বিজয়ী হয় জামায়াত। ১৯৮৮ সালের ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি।

স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর গ্রহণযোগ্য হিসেবে নির্বাচনগুলোর একটি ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে সব ইসলামপন্থি দল মিলে মোট প্রদত্ত ভোটের ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ পায়। জামায়াত ১২ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে ১৮ আসনে জয়লাভ করেছিল।
ওই নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (তৎকালীন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন)।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন অংশগ্রহণ করেনি। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর পর একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ সব রাজনৈতিক দল। ওই নির্বাচনে জামায়াত তিনটি আসনে বিজয়ী হয়।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে অংশগ্রহণ করে। ২০টি আসনে নির্বাচন করে দলটি পায় ১১ হাজার ১৫৯ ভোট।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে ইসলামী আন্দোলন। এই নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রার্থিতা দিয়েছিল চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন দলটি। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটে নির্বাচন করে ১৭টি আসন পায় জামায়াত।
২০০১ সালের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের ভোট ছিল প্রায় ১ শতাংশ।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের ব্যানারে নির্বাচন করলেও জামায়াত পায় মাত্র দুইটি আসন। ইসলামী আন্দোলন এই নির্বাচনে শতাধিক আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রদত্ত ভোটের ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ লাভ করে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা বাদে বিরোধী আর কোনো দল নির্বাচনে যায়নি।
নিবন্ধন না থাকায় ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে, তবে কোনো আসনে জিততে পারেনি। সে ভোটে বিএনপি ছয়টি আসন পায়।
সেই ভোটকে ‘রাতের ভোট’ আখ্যা দিয়ে নির্বাচনকালীন বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করলেও পরে বিএনপির ছয়জন এমপি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন।
আর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজয়ী হলেও সংসদে যাননি। তার আসনে উপনির্বাচনে জিতে আসেন বিএনপির আরেক প্রার্থী।

সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির ছয়জন এমপি ও সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্য পদত্যাগ করেন।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও-কারও মতে, ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি ধারা কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ছাত্র-শিক্ষক, যাদের একটি বড় অংশ জামায়াতকে ভোট দেয় না। এই ধারার ভোটগুলো বিএনপিসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে যেতে পারে। দ্বিতীয় একটি অংশ যারা প্রধানত ইসলামী আন্দোলনকে ভোট দিতে পারে।
বিএনপির একজন নেতা শুক্রবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইসলামী ভাবধারার একটি বড় অংশের ভোট বিএনপির দিকেই ঝুঁকে আছে। কেবলমাত্র বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের কথায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভোট জামায়াতের দিকে যাবে না।”
তিনি দাবি করেন, ইসলামী আন্দোলন কেবলমাত্র আসনের বিষয়ে জামায়াতকে ছেড়ে আসেনি, বরং পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণের জায়গা থেকে সরে আসতে পারে।
বৃহস্পতিবার ইসলামী আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ আনুষ্ঠানিকভাবে যে আসন সমঝোতার কথা জানায় তাতে জামায়াত একাই নেয় ১৭৯ আসন।
শরিকদের মধ্যে এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, খেলাফত মজলিস ১০, এলডিপি ৭, এবি পার্টি ৩, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২ ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টিকে ২ আসন দেওয়া হয়।
ইসলামপন্থি দলগুলোর ‘নির্বাচনি ঐক্যে’ ইসলামী আন্দোলন নেই, এতে করে ভোটে প্রভাব কী পড়তে পারে?

জবাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, “সেটা বলার সময় এখনও আসেনি। মেরুকরণ অনেক কিছুই হতে পারে নির্বাচনে প্রত্যাহারের দিন পর্যন্ত।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আপিল নিষ্পত্তির ধাপে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২০ জানুয়ারি প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বে যে ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ গড়ে উঠেছে, তার সূচনা ঘটে ধর্মভিত্তিক আট দলের যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে শুরু হয়েছিল সেই যুগপৎ আন্দোলন।
শুরুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ছিল এই মোর্চায়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই মোর্চাকে নির্বাচনি জোটে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগের দিন এনসিপি ও এলডিপি এবং তার পরদিন এবি পার্টি এই জোটে যোগ দেয়।
কিন্তু ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল এনসিপির জোটে আসা নিয়ে আপত্তি তোলে। শেষ পর্যন্ত মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে রাজি করানো গেলেও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত জোটের দূরত্ব বেড়ে যায়।
ইসলামী আন্দোলনের একজন কেন্দ্রীয় নেতা দাবি করেন, দেশের প্রতিটি গ্রামে তাদের কমিটি আছে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পীরধারার দল বলে নিজস্ব কিছু ভোটও রয়েছে। সব মিলিয়ে এককভাবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী।
এই নেতার দাবি, আগামী নির্বাচনে অন্তত ১২ শতাংশ ভোট পাবেন তারা। সে হিসেবে উচ্চ কক্ষে কমপক্ষে ১২ জন প্রতিনিধির অংশ নিশ্চিত করতে চায় ইসলামী আন্দোলন।
তবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, “অনেক কিছুই রাজনীতিতে ঘটে। এখন একটা মেরুকরণ হচ্ছে। নানান রকম রাজনীতির খেলা সব ইলেকশনের আগেই চলতো।
“আমাদের পক্ষ থেকে ওনাদের পক্ষ থেকে নানান অভ্যন্তরীণ আলোচনা-যোগাযোগ বিভিন্ন সময় চলছে। একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে, ১১ দলের শীর্ষ নেতারা একটা পলিসি ঘোষণা দিয়েছেন।”
“ওনারা (ইসলামী আন্দোলন) একটু ভিন্ন মত করেছেন। এটা তো ওনারা করতেই পারেন। আমরা প্রত্যাহারের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। তার আগে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না এ ব্যাপারে,” বলছিলেন গোলাম পরওয়ার।
এ বিষয়ে শুক্রবার রাতে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের কোনো অপেক্ষা নাই। আমরা তো জানিয়ে দিয়েছি। তবে অপেক্ষা আছে, তারা যদি শরিয়া আইন বাস্তবায়নে স্পষ্ট অবস্থান জানায়, কোনো লুকোচুরি না, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন করবে।”
বিরোধিতার প্রশ্ন তো আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করে? জবাবে ফয়জুল করীম বলেন, “এটা তো আপনার কথা আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করে, আমার কথা হচ্ছে আদর্শগত কারণে ঐক্য হচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “আমরা তো ইসলামের পক্ষে। তারা (জামায়াত) যদি শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন না করে, তাহলে আমাদের কথায় ও কাজে মিল থাকে কি?
“ইসলামের পক্ষে যারা থাকবে, তাদের পক্ষে তো আমরা আছি।”
কিন্তু বিভাজনের মধ্য দিয়ে কি ইসলামী আন্দোলনের ভোট বাড়বে? এমন প্রশ্নে দলের সিনিয়র নায়েবে আমির বলেন, “অবশ্যই বাড়বে। যারা ইসলামের পক্ষে তারা অবশ্যই ভোট দেবে। এটা তো আদর্শিক ভোট।
“২৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে জামায়াত ও ইসলামি দলগুলোর ভোট।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক খালিদুর রহমান মনে করেন, অতীতের আসনভিত্তিক ভোটের ধারা এবং সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত বিভিন্ন জনমত জরিপ বিশ্লেষণ করলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের ভোট ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) এই অধ্যাপক বলেন, “জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ দলগুলোর স্বতন্ত্র ভোট যোগ করলে মোট ভোটের হার সর্বোচ্চ প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
“সবকিছু বিবেচনায় নিলে জামায়াত ও তার জোটসঙ্গীদের সম্মিলিত ভোট সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ শতাংশের মধ্যে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।”
তবে জামায়াতের জোটে ইসলামী আন্দোলনের না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে খালিদুর রহমান বলেন, “ইসলামী আন্দোলনের মতো কোনো গুরুত্বপূর্ণ শরিক দল যদি জোটের বাইরে অবস্থান নেয়, সে ক্ষেত্রে এই ভোটের হার আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
তার মতে, আসনভিত্তিক ভোটের তারতম্যের কারণে এই ভোট ভাগাভাগি থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০টি আসন মিলতে পারে। উচ্চকক্ষেও তাদের প্রতিনিধিত্ব আনুমানিক একই মাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসন্ন নির্বাচনে জুলাই অভ্যুত্থানের বিষয়টিও নজরে এনেছেন। তিনি মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আবেগ তৈরি হয়েছিল, তা নৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে কার্যকর রূপ না পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলেনি।
“একই সঙ্গে গত ডিসেম্বর মাসে দেশব্যাপী জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পর্যায় থেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত ও নেতিবাচক মন্তব্য প্রকাশ পাওয়ায় জুলাইকেন্দ্রিক আবেগ তাদের কিংবা তাদের জোটসঙ্গীদের অনুকূলে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।”
তবে দেশে ডানপন্থিদের অনুসারী বেড়েছে বলে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে ইসলামি দলগুলোর উত্থান এরকমভাবে হবে, আমার মনে হয় খুব কম লোকের কল্পনাতেই ছিল। যদিও ক্রমাগত সারা পৃথিবীতেই ডানপন্থিদের উত্থান ঘটছে।”
আওয়ামী লীগের সময়ে ডানপন্থিদের প্রতি শেখ হাসিনার একই সঙ্গে ‘কঠোর অবস্থা ও প্রশ্রয়’ ছিল তুলে ধরে ধরে তিনি বলেন, “প্রশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা ‘কওমি জননী’ হয়েছে। (আবার) শেখ হাসিনার এই যে, তাদের প্রতি খড়্গহস্ত হওয়ার কারণে অনেকেই কিন্তু ওই যে বিকল্প ভেবেছে এবং অনেকে মনে করছে ইসলামপন্থি এই দলগুলোর মাধ্যমে হয়তো মুক্তি আসতে পারে।”
রাজনৈতিক এই বিশ্লেষক বলছেন, “দিন-দিন মানুষের মধ্যে যে ধর্মীয় উন্মাদনা এবং ধর্মের প্রতি অনুরাগ এবং ধর্মভিত্তিক সমাধানের দিকে মানুষ আকর্ষিত হচ্ছে, এটা কিন্তু আমাদের দেশে শুধু নয়, অনেক দেশে, এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও তা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সব জায়গায় ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান ঘটছে।
“তো এখন আমাদের যেহেতু কোনো একটা নির্বাচন হয় নাই, কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন হয় নাই গত ১৫ বছরে। ফলে এটা বলা দুরূহ, আগামী নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলগুলো কেমন ভোট পাবে। তবে এই যে, তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যাদের ভোট দিচ্ছে এবং এমনকি এই যে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এত বিপুল সমর্থন দেখা গেল, কিন্তু সবশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোয়ও এই উদ্দীপনার কোনো প্রভাব পড়েনি। ছাত্রদলের যে পরাজয় হয়েছে, তা আমাদের না ভাবিয়ে রাখতে পারে না।”
বদিউল আলম বলেন, “অন্যদিকে জামায়াত একটি ‘রেজিমেন্টেড অর্গানাইজেশন’। তাদের যেরকম ‘রিক্রুটমেন্ট’ এবং এটা তো অত্যন্ত, যে অত্যন্ত ‘ইফেক্টিভ’। সম্প্রতি অনেক জরিপ এসেছে, যেগুলোর মধ্যে অনেক স্ববিরোধিতাও আছে। তবে ইসলামি ঘরানার ভোটের বাস্তবতাকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
আগের খবর:
জামায়াতের আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন ইসলামী আন্দোলনের, সতর্ক করল অন্যদের
জোটে 'ইনসাফ না পেয়ে' একক ভোটের ঘোষণা ইসলামী আন্দোলনের
জামায়াত ছেড়ে ইসলামী আন্দোলন কি আলাদা জোট গড়ছে?
আসন ভাগাভাগি: জামায়াত কত নিল, বাকিরা কত পেল?
জামায়াত জোটের সংবাদ সম্মেলনেও আসেনি ইসলামী আন্দোলন
১১ দলে আসন ভাগাভাগি: জামায়াতকে নিয়ে ‘অবিশ্বাস’, যা বলছে ইসলামী আন্দোলন