Published : 22 Aug 2026, 07:45 PM
বাংলাদেশের সংবিধানে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতিকে।
কিন্তু মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে পদটির গুরুত্ব যতটা, নির্বাহী ক্ষমতা ঠিক ততটা নয়।
গেল ২৪ জুলাই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পৌনে দুই বছর আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
পদত্যাগের পর আইন অনুযায়ী তার স্থলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
গত শুক্রবার সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
দেশের সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
এর বিপরীতে বঙ্গভবনের মতো বিশাল ও সুরক্ষিত সরকারি বাসভবন, বেতন-ভাতা, পরিবহন, চিকিৎসা, আপ্যায়নসহ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি। এর মধ্যে অনেক সুযোগ-সুবিধা পদ ছাড়ার পরেও বলবৎ থাকে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা
সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। এর একটি হল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।
দেশের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দল থেকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তবে যদি কোনো দল নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে কে সরকার গঠন করবে, এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একইভাবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে বাধ্য নন। বাংলাদেশের সংবিধানে এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে রাখবেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পেশ করার অনুরোধ জানালে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কিনা এবং দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে সম্পর্কে কোনো আদালত কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবে না মর্মে এক ধরনের সাংবিধানিক সুরক্ষাও দেওয়া আছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির আইনগত ক্ষমতার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দণ্ড মওকুফ বা শাস্তি কমানোর ক্ষমতা।
সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মাফ, স্থগিত বা কমানোর ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির আছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সংসদীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রপতির অন্যান্য দায়িত্বের মতো এ ক্ষমতার প্রয়োগও সরকারের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে।
সাংবিধানিক সুরক্ষা ছাড়াও রাষ্ট্রপতি পদের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, সাংবিধানিক দায়মুক্তি।
সংবিধান অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হয় না। দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না।
একইসঙ্গে এই সময়ে তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।
তবে সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যায়। আবার শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও রাষ্ট্রপতিকে পদ থেকে অপসারণের বিধান রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে সেটি বিবেচনার পর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের ক্ষেত্রেও প্রায় একইভাবে সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠন করে রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে। এরপর একইভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে প্রস্তাব পাস হলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা যায়।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ বা অবসরে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধা নেই।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ অর্থাৎ ১০ বছর রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময় তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য থাকেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হয়। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
বেতন কত, অন্যান্য যত সুবিধা
দেশের রাষ্ট্রপতি কী সুযোগ-সুবিধা পান, তা বলা আছে দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্টে।
তাতে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই বেতন থেকে কোনো আয়কর কাটা হয় না। অর্থাৎ এটি আয়করমুক্ত।
সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালে এই পদে বেতন বাড়ানো হয়। এর আগে এই পদের মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা। রাষ্ট্রপতি অবসর বা পদত্যাগের পরও কিছু সরকারি সুবিধা পান।
রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা এন্টারটেইনমেন্টের জন্যও বার্ষিক ভাতা রয়েছে। এই ব্যয়ের নিরীক্ষা করা হয় না।
রাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন নির্ধারিত। এর সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।
রাষ্ট্রপতির সরকারি যাতায়াতের জন্য গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধাও সরকার দিয়ে থাকে। এছাড়া রাষ্ট্রপতি সরকারি কাজে বিদেশ সফরে গেলে সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা পান।
রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে স্বেচ্ছাধীন তহবিল। বছরে এ তহবিলের পরিমাণ দুই কোটি টাকা। রাষ্ট্রপতি তার বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এ অর্থ ব্যয় করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশের যেকোনো হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে দেশের বাইরে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।
এর বাইরে রাষ্ট্রপতির জন্য বিমানভ্রমণের বীমাসুবিধাও রয়েছে। বর্তমানে এ সুবিধার পরিমাণ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে ছিল ১৫ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন