মাতৃভাষা ও প্রবাস-প্রজন্ম

বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে প্রবাস-প্রজন্মের মাতৃভাষা শেখার বিষয়টি বাজার অর্থনীতির ‘চাহিদা-সরবরাহের’ চক্রে ভাবা যায় কিনা সেই প্রশ্ন রেখেছেন লেখক শামস রহমান।

শামস রহমান
Published : 24 July 2022, 01:43 PM
Updated : 24 July 2022, 01:43 PM

চলমান ট্রেনে পাশাপাশি বসা এক বিলেতি যখন অন্য আর এক বিলেতিকে জিজ্ঞেস করে- ‘How far are you going?’ এর উত্তর কি গণিতে না গন্তব্যে? যারা বিলেতি সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সাথে পরিচিত তারা জানেন যে প্রশ্নটি মোটেই গণিতশাস্ত্রের নিয়মে পথ অতিক্রম করার বিষয়ভুক্ত নয়। বরং এটা গন্তব্য সংক্রান্ত প্রশ্ন।

অথবা কোন অস্ট্রেলিয়াবাসীর কাছে কোনও অনুসন্ধানে গেলে, উত্তরে যখন বলে, “I am afraid, I wouldn’t be able to…’। সঠিক উত্তর দিতে অপারগ, ব্যস! এখানে আবার ভয়-ভীতির কথা কোথা থেকে এলো?

এগুলো এলোমেলো শোনালেও, এটাই ভাষা। ভাষা শুধুই ব্যঞ্জন আর স্বরবর্ণের সংযোজনে সৃষ্টি শব্দমালাই নয়। তবে নিশ্চয়ই শব্দমালা কোন ভাষার কাঠামো গঠনের প্রধান উপকরণ। আর ভাষা, ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। মানুষের ভাবের উদয় হয় তার চিন্তা-চেতনা, ভাবনা এবং অনুভূতির মাঝে। তাই ভাষা শুধুই শব্দের পিঠে শব্দে সৃষ্ট বাক্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এর বিস্তৃতি ব্যাপক।

আমরা যারা প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী, তাদের কাছে ইংরেজি শব্দে সাজানো বাক্য বোধোদয় হওয়া সত্বেও, বাক্যের যথার্থতা অনুধাবনে অসম্পূর্ণতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। সে কারণেই অনেক সময় অস্ট্রেলিয়াবাসীদের ভাব-ভাষার আদান-প্রদান ঠাহর করা কষ্টকর হতে পারে। এক ভাষা থেকে অন্য আরেক ভাষায় শব্দের রূপান্তর ঘটলেও, ভাবের সঠিক রূপান্তর নাও ঘটতে পারে, যা কনটেক্সচুয়াল। সঠিক অর্থে না বোঝার মূলত সেটাই কারণ।

বহুল পরিচিত সেই ইংরেজি বাক্যটির কথাই ধরা যাক- ‘The spirit is high but the flesh is weak’। এই বাক্যটি যখন রুশ ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে, ফের রুশ থেকে ইংরেজিতে প্রকাশ পায়, তখন এ রকম দাঁড়ায় – ‘The wine is OK but the meat is rotten’। হয়তো এটি একটি ‘এক্সট্রিম’ উদাহরণ, তবে এখানে মূল বিষয় হচ্ছে ভাষার কনটেক্সট।

মাটি-মানুষ, জলবায়ু ও সার্বিক পারিপার্শ্বিকতা – এসব নিয়েই তৈরি হয় কনটেক্সট বা প্রাসঙ্গিক পরিবেশ। কোন ভৌগলিক ভূখণ্ডের শব্দাবলী এবং সেই ভূখণ্ডের মাটি-মানুষ, জলবায়ু অর্থাৎ সার্বিক পারিপার্শ্বিকতার সমন্বয়ে সৃষ্ট যে মূর্ত-বিমূর্ত প্রকাশ, সেটাই ভাষা। সামারসেট মম- এর বিখ্যাত ‘দ্য লাঞ্চন’ গল্পটি অনেকেই নিশ্চয়ই পড়েছেন অথবা শুনেছেন।

অতীতের ভালবাসার মেয়েটি প্যারিসের এক রেস্তোরাঁয় বসে এস্পারাগাস্ (asparagus) অর্ডারের মাঝে যখন তার বন্ধুর পকেট শূন্য করে, তখন বুঝি এ খাদ্যদ্রব্যটি নিশ্চয়ই অত্যন্ত দামী। তবে তার স্বাদ-গন্ধ উপলব্ধি বা রসাস্বাদন করিনি তখনো।

অন্যদিকে, ‘চামচা’, নিষিদ্ধ উপন্যাস ‘স্যাটানিক ভার্সেস’- এর একটি প্রধান চরিত্র। শব্দটি একদিকে বিশেষ্য, অন্যদিকে বিশেষণ, যার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য উপমহাদেশের মাটি-মানুষ ও পারিপার্শ্বিকতা ঘিরে তৈরি। সাহিত্যে প্রখ্যাত বুকার প্রাইজ পুরস্কার কমিটির একজন বিচারক হিসেবে, বিলেতের সাবেক লেবার পার্টির নেতা, মাইকেল ফুট যখন নিষিদ্ধ উপন্যাস ‘স্যাটানিক ভার্সেস’- এর ‘চামচা’ চরিত্রটির ভূয়সী প্রশংসা করে, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে– উপন্যাসে ‘চামচা’ শব্দ বা চরিত্রের সাথে যখন প্রথম সাক্ষাৎ হয়, তখন মি. ফুট কি উপমহাদেশের পাঠকের মত ‘চামচা’ চরিত্রটি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন?

‘চামচা’ এবং ‘এস্পারাগাস্’ উভয় শব্দই কনটেক্সটে ঘেরা– একটি উপমহাদেশীয়, অন্যটি ইউরোপীয়। ভাষা যদি মনের ভাব প্রকাশের বাহক হয়ে থাকে, তবে ‘চামচার’ বৈশিষ্ট্য এবং ‘এস্পারাগাসের স্বাদ-গন্ধও ভাষার অঙ্গ। সময়ে, কোন ভাষার বর্ণমালার সংখ্যা বা বর্ণের উচ্চারণ সচরাচর না বদলালেও, মাটি-মানুষ ঘিরে পারিপার্স্বকতা বদলায়- মানে কনটেক্সট বদলায়। তাই ভাষাও বদলায়। সেই অর্থে ভাষা জীবন্ত। প্রবাস-প্রজন্ম আমাদের মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সেই কনটেক্সট থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। আর সেখানেই ভয়। তবে স্বীকার্য যে বিশ্বায়নের হাওয়ায় কনটেক্সটের পরিধি উত্তরোত্তর ব্যাপ্তির পথে। সেখানেই আশার আলো।

অস্বীকার্য যে, প্রবাস-প্রজন্মের মাঝে মাতৃভাষার প্রসার ঘটানোর ব্যাপারে ‘আবেগ’ কিছুটা হলেও কাজ করে থাকে। থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই আমার প্রাণপ্রিয় যুবকটি মধ্যরাতে ফোনে আমার ‘তুমি কোথায়?’ প্রশ্নের উত্তরে যখন বাংলায় বলে– ‘এখনই ফিরছি’, তখন আবেগে আপ্লুত হই। তবে কি প্রবাস-প্রজন্মের ভাষা শিক্ষা ও তার দৈনন্দিন ব্যবহার কেবলই আবেগে তাড়িত? আবেগ কি এক ধরনের হস্তক্ষেপ (intervention)?

যে কোনও ভূখণ্ডের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের এক প্রধান উপকরণ ভাষা। সেদিক বিচারে নিশ্চয়ই ভাষার প্রভাব শুধুই যোগাযোগ কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়, যা প্রতিনিয়ত প্রতীয়মান। তুলনামূলকভাবে অস্বচ্ছ হলেও, ভাষার একটি অর্থনৈতিক দিক আছে। যদি ভাষার কনটেক্সট এর সাথে ‘অর্থনৈতিক’ মাত্রার সংযোজন ঘটে, সেক্ষেত্রে প্রবাস-প্রজন্মের পক্ষে বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রটি জটিল থেকে জটিলতর হয়।

অন্যদিকে, সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘বেগ’ আসে ‘চাহিদা-সরবরাহের’ চক্রে। যদিও তা মানুষেরই সহজান প্রবৃত্তিরই প্রতিফলন, তথাপি এ এক কঠিন চক্র। তাই এ চক্রে প্রবর্তিত সমাজ মানবিক দৃষ্টকোণের ‘ভাল-মন্দ’ বিশ্লেষণের উর্ধ্বে। মানবিক মাপকাঠিতে যাই দাঁড়াক না কেন, কনটেক্সটে আবদ্ধ যুক্তিবাদের (rationalism) চক্র চলে তার নিজস্ব গতিতে। অতীতে কোন কোন ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ (intervention) থাকলেও, আজ তা শূন্যের কোঠায়। এ চক্র উপেক্ষা করে যারা গত সত্তুর থেকে নব্বই বছর ধরে লালন করেছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্য চক্র, শেষাব্দি তারাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে বাস্তবতার কাছে বা কনটেক্সট কাছে।

যদি ‘বেগে’ লাগে ‘আবেগের’ ছোঁয়া, সন্দেহ নেই, ভাটা পরে বেগে। সেটা অবশ্য বিশুদ্ধ বিশ্লেষণের নিরিখে দেখার প্রতিফলন কিংবা, ‘জিরো সাম’ এর আদলে বিশ্লেষিত সরল সমীকরণের ফলাফল। বাস্তবে, সিনারজিক প্রভাবও সম্ভব। তাই, বেগ-আবেগের সঠিক সমন্বয়ে সৃষ্ট ধারা প্রবাহিত হতে পারে ‘দুয়ে-দুয়ে পাঁচে’র বেগে। এখানে সমন্বয়ই মূল কথা। তবে, সে সমন্বয় সময়ে ঘটবে, তার জন্য ‘প্রতীক্ষা’? নাকি, সময়কে অতিক্রম করে সমন্বয় ঘটানো, তার জন্য ‘প্রচেষ্টা’? সেটাই প্রশ্ন। অবিশ্বাস্য শোনালেও, উত্তর, মাটি-মানুষে তৈরি সেই কনটেক্সটের মাঝেই আবদ্ধ।

গ্লোবাইলাইজেশন প্রেক্ষাপটে প্রবাস-প্রজন্মের মাতৃভাষা শেখার বিষয়টি বাজার অর্থনীতির ‘চাহিদা-সরবরাহের’ চক্রে ভাবা যায় কি? নিঃসন্দেহে, প্রবাস-প্রজন্ম একটি শিক্ষিত সমাজ। কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বা বিজ্ঞানী এবং অন্যান্য বিষয়ে দক্ষ। তাদের অনেকে বহুসাংস্কৃতিক দলের হয়ে যদি কখনো অস্ট্রেলিয়া থেকে কুমিল্লার মালঞ্চ গ্রামে চক্ষু-চিকিৎসার ক্যাম্প খুলে? যদি প্রবাস-প্রজন্মের কোন এক তরুণ চিকিৎসক কোন বৃদ্ধের চিকিৎসার ফাঁকে পূর্ব পুরুষের ভাষায় বৃদ্ধকে বলে– ‘আমি এই গ্রামের মোহাম্মদ কলিমউদ্দিনের নাতনী’। ‘হুনছো, মাইয়াডা কয় কী’ বলে বৃদ্ধ যদি তরুণ চিকিৎসককে জড়িয়ে ধরে? এখানেও কি শুধুই আবেগ? নাকি, বেগ-আবেগের এক উত্তম সমন্বয়, যার ফলে বয়ে যেতে পারে ‘দুয়ে-দুয়ে পাঁচে’র ধারা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক