২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

নৈতিকতার আলোচনা, চর্চা ও জাগরণের জন্য

বিশ্ব রাজনীতি থেকে শুরু করে দেশের সমাজব্যবস্থায় নৈতিকতার যে চরম ধস নেমেছে, তার মোকাবিলায় নৈতিকতার চর্চা ও জাগরণ জরুরি।

নৈতিকতার আলোচনা, চর্চা ও জাগরণের জন্য

আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে এখন যে নৈতিক জাগরণ সবচেয়ে বেশি জরুরি, এ কথা অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। ছবি: এআই

আলমগীর খান আলমগীর খান

Published : 25 Sep 2026, 08:39 AM

Updated : 25 Sep 2026, 08:39 AM

বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে এখন আমরা যে সময় পার করছি, তা চরম অনৈতিকতার এক কালপর্ব। একদিকে বিশ্বজুড়ে আমরা দেখছি যুদ্ধবাজ ডনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যথেচ্ছ আচরণ এবং ভয়াবহ গণহত্যা। অন্যদিকে, সবকিছুর মধ্যেও বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়ন, পরিবারে নারী নির্যাতন এবং ঘরে-বাইরে প্রতিনিয়ত নৃশংস হত্যা ও অকালমৃত্যুর এক দীর্ঘ মিছিল আমরা দেখছি। আছিয়া, রামিসা, আয়েশা, দিপু চন্দ্র দাস, মরিয়ম, অপ্রতিম—এই সব নির্মম ঘটনার যেন কোনো শেষ নেই, এমনকি থামার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। আমরা কি আসলেই অনুধাবন করতে পারছি যে আমাদের সমাজ এক ক্ষতিকর গুণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে আমাদের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধে এক ভয়াবহ নৈতিক ধস নেমেছে?

অন্যায্যতার এই মিছিলে চোখ বুজে থাকার নামও অপরাধ। তাই নৈতিকতার আলোচনাটি এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই। এ ধস রাষ্ট্রীয়, জাতিসংঘ পর্যায়ের, এমনকি বৈশ্বিক। সমস্যা হচ্ছে এই সংকটকে নৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রেই একটা কার্পণ্য রয়েছে। এটা যে এক চরম নৈতিক ধস, তা ভাবাই হয় না। এ ঘাটতি ধর্মীয়, বামপন্থি, উদারপন্থি কিংবা আস্তিক, নাস্তিক ও সন্দেহবাদী সবার দিক থেকেই। নৈতিক সংকটকে সবার আগে নৈতিক সংকট হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে। ডেঙ্গু রোগের জন্য যেমন প্রধানত এডিস মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে না পারা দায়ী, এই পরিস্থিতির জন্য তেমনি প্রধানত নৈতিক সংকট দায়ী। এরপর আরও দশ-পনেরোটা কারণ তো জড়িয়ে আছেই।

এক পক্ষ মনে করছেন, ধর্মীয় উত্থান ঘটলেই সব অনৈতিকতা দূর হয়ে যাবে। চব্বিশের সফল গণআন্দোলনের পরে একটা ক্ষমতাকেন্দ্রিক ধর্মীয় উত্থান লক্ষ করা যায়; কিন্তু সমাজের ভেতর অনৈতিক আচরণ বেড়েছে বৈ কমেনি। আরেক পক্ষ, বিশেষ করে বামপন্থিদের ধারণা সবকিছু শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত; কেবল শ্রমিক শ্রেণির বিজয় ঘটলেই সব সমাধান হয়ে যাবে, তার আগে পর্যন্ত আর কিছু করার নেই। আর উদারপন্থিরা মনে করেন, যথাযথ সরকারি পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যার তীব্রতা কমানো যায়; অন্যদিকে বাস্তববাদীদের মতে কঠোর শাস্তির বিধান ও তা কার্যকর করে এসব দূর করা যায়। কিন্তু নৈতিক আলোচনা ও নৈতিক সংস্কৃতি গঠনের ব্যাপারে প্রায় সকলেই নিশ্চুপ।

তবে সবার আগে প্রয়োজন নৈতিক জীবনযাপনের প্রচলিত ধারণা থেকে মুক্তি লাভ। জায়নবাদী, হিন্দুত্ববাদী, খ্রিস্টান মৌলবাদী কিংবা মুসলমান মৌলবাদী সকলেরই সংগঠিত নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে। জায়নবাদী ও খ্রিস্টান মৌলবাদীরা তো এখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত—ইরাকে, গাজায়, লেবাননে ও ইরানে। কিন্তু এরা সবাই ধর্মীয় নৈতিকতার কথা বলে। তাদের ধর্মীয় নৈতিকতার খড়গের নিচে বলি হয় মানবতাবাদী নৈতিকতা।

আবার নৈতিকতার কিছু বাঁধা বুলি ও সুবচনের মধ্যেও এখনকার সংকটের সমাধান নেই। আধুনিক মানুষের জীবন জটিল, অপরাধ সংঘটন দূরবর্তী কায়দায়; যেমন সিস্টেম, কাঠামো বা এআই দ্বারা, সোশাল মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ইত্যাদির যুগে নৈতিকতার ধারণা জটিল হয়েছে, যা বাঁধা বুলি দিয়ে সমাধান করা যায় না। কম্পিউটারের বোতাম টিপে যে সেনাকর্মকর্তা হাজার হাজার নারী ও শিশুকে হত্যা করছে, তার কাছে এটি পোকামাকড় দূর করার সমতুল্য।

বামপন্থিদের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও নৈতিকতা নিয়ে তাদের উদাসীনতা বিরাট। একমাত্র শ্রেণিসংগ্রাম দিয়েই সব সমস্যা সমাধানের চিন্তা থেকে কমিউনিস্ট শাসিত দেশগুলোতে একসময় শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বের নামে নানারকম ফ্যাসিজম চলেছে, পরিণতিতে তাদেরকে পতনের মুখ দেখতে হয়েছে। এখনও নৈতিক আলোচনা অনেক বামপন্থির কাছে দুর্বল বুদ্ধিবৃত্তি, আপসকামিতা বা নাক সিঁটকানোর মতো ব্যাপার। তাদের ধারণা, তাদের পার্টি ক্ষমতায় আসামাত্রই নৈতিকতা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজেদের স্বেচ্ছাচারকে তারা শ্রমিক শ্রেণির বিজয়ের দোহাই দিয়ে পার করতে পারে, যেমন হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নে, চীনে এবং অন্যত্র।

অথচ মার্কসবাদী চিন্তা গোড়াতেই নৈতিক; যেহেতু তা শ্রেণি শোষণকে অনৈতিক বিবেচনা করেই তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। শ্রেণি শোষণ যে চিরস্থায়ী প্রাকৃতিক নিয়ম, এই বুর্জোয়া প্রচারণাকে তারা অস্বীকার করেই লড়াইয়ে নামেন। পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির রাশান অ্যান্ড ইস্ট ইউরোপিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ক্রিস্টেন গডসি সম্প্রতি দার্শনিক সুসান নেইম্যানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন, যার শিরোনাম ‘দ্য লেফট শুড স্টার্ট ইউজিং দ্য ওয়ার্ড ইভিল’ (বামপন্থিদের উচিত অনৈতিক শব্দটি ব্যবহার শুরু করা, জ্যাকোবিন সাময়িকী, ২১ সেপ্টেম্বর)।

সাক্ষাৎকারটির ভূমিকাংশে বলা হয়েছে, “ন্যায্য মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শ্রেণিবিভাজনমুক্ত বিশ্বের বামপন্থি ব্যাপারগুলো নিশ্চিতভাবে নৈতিক বিষয়—এর চলমান যান্ত্রিক কার্যকারণের তত্ত্ব যাই হোক। আর আমরা একে লুকানোর চেষ্টা করি না। সত্যি হলো আমাদের আন্দোলনগুলো সবচেয়ে সফল হয় যখন মানুষের আত্মস্বার্থের সঙ্গে ন্যায়চিন্তাকে যুক্ত করি, কোনোটা অবহেলা না করে। একদিক থেকে আমরা জানি যে, ভালো শব্দের ব্যবহার বাদ দিয়ে আমরা চলতে পারি না। ‘কোল ইট ইভিল: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য ট্রাম্প এরা’ শীর্ষক নতুন বইতে দার্শনিক সুসান নেইম্যান যুক্তি দিয়েছেন যে, আমরা অনৈতিক শব্দটি বাদ দিয়েও চলতে পারি না, এটাকে বাদ দিয়ে আমরা নিরস্ত্র হয়ে গেছি। নেইম্যান যুক্তি দেন যে বামপন্থিরা নৈতিক শব্দের ব্যবহার মৌলবাদীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।”

সাক্ষাৎকারটিতে দার্শনিক সুসান নেইম্যান বলেন, “বহুল প্রচলিত এই ধারণাটি পরিত্যাগ করতে হবে যে ভালো ও মন্দ সম্পর্কিত ধারণা নিছক ধর্মীয়। নৈতিক অনুভবের উৎপত্তি ধর্মতত্ত্বের আগে। ধর্ম নৈতিক সমস্যার একটা জবাব, যদিও আমি মনে করি না যে এটা খুব সফল। প্রতিটি সংস্কৃতি অন্যায়কে চিহ্নিত করে, তাদের ধর্মচর্চা যাই হোক। আপনি একে বলতে পারেন ‘অন্যায় সম্পর্কে সচেতনতা’, যা শিশুদের, উচ্চবর্গীয় প্রাণীদের ও এমনকি ইঁদুরের আচরণেও প্রকাশ পায়। আমার প্রিয় যুক্তি হচ্ছে, বাইবেল থেকেই দেখা যায় নৈতিকতা ধর্মের আগে এসেছে, যখন আব্রাহাম ঈশ্বরকে অনুরোধ করেন অপরাধীদের সঙ্গে যেন নিরপরাধ মানুষজন শাস্তি না পায়, কোলেটারাল ড্যামেজ গ্রহণযোগ্য নয়। এতে বোঝা যায় যে, আপনার যদি ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও থাকে, তিনি আপনার নৈতিক বিবেচনার উৎস নন।

সত্য যে ধর্মবিশ্বাসীগণ নৈতিক শব্দাবলী ব্যবহারে বেশ অভ্যস্ত। এটাও সমানভাবে সত্য যে, মৌলবাদীরা এর অপব্যবহারে পারঙ্গম। কিন্তু আমরা কি আমাদের ভাষার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলো তাদের কাছে ছেড়ে দেব, যারা এগুলোর দায়িত্বশীল ব্যবহারে সবচেয়ে অক্ষম? মানুষ এসব শব্দ দ্বারা আলোড়িত, যা আবেগ ও অনুভূতির গভীরে নাড়া দেয়। তাই আমাদের প্রতিদিনের দেখা জগতকে অস্বীকার করার চেয়ে অন্যায়ের বিচার-বিশ্লেষণ শেখা জরুরি। যদি জেলে, স্কুলছাত্রী অথবা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের হত্যা অন্যায় না হয়, তবে অন্যায় কী?

আমাদের সমাজে যে নৈতিক ধস নেমেছে, তার গোড়ায় আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, ছলে-বলে-কৌশলে ধনী হওয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, টাকাপয়সাকেন্দ্রিক জীবনদৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তার চাদর গুটিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানুষের জয়গান, ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ বা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ আদর্শচর্চা, তেলে মাথায় আরও তেল ঢালা ইত্যাদি নানাকিছু জড়িয়ে আছে। এসবের পরিবর্তন জরুরি। তবে এর বাইরেও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিতে নৈতিক আলোচনার অভাব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে এখন যে নৈতিক জাগরণ সবচেয়ে বেশি জরুরি, এ কথা অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। ধর্মনিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে অবস্থিত নৈতিক আলোচনা-সমালোচনা, তর্কবিতর্ক, বিচার-বিশ্লেষণ ও বাস্তব চর্চা ছাড়া আমাদের যে কোনো শুভ জাতীয় উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

প্রতিদিনের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অপমান, আধিপত্যবাদিতা ও প্রান্তিকীকরণের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য নৈতিক জাগরণের উদ্যোগ গ্রহণ এই মুহূর্ত থেকে জরুরি। একেক কালে একেক পদক্ষেপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; এই মুহূর্তে আমাদের জীবনে নৈতিক আলোচনা, চর্চা ও জাগরণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

আলমগীর খান: কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com