Published : 01 May 2026, 05:35 PM
মে মাস এলেই আমার ভেতরে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। এই মাসের প্রথম দিনটি শুধু শ্রমিক দিবস নয়—সরদার ফজলুল করিমের জন্মদিনও। আমার শিক্ষক, আমার দেখা এক অনন্য মানুষ, এক চলমান জ্ঞানকোষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে তাকে প্রথম দেখেছি—ধীরে কথা বলতেন, থেমে থেমে। কিন্তু সেই নিচু স্বরের কথার মধ্যেই দার্শনিকতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। তার প্রতিটি বাক্য যেন গভীর কোনো দর্শনের সমুদ্র থেকে তুলে আনা। এত সহজভাবে, এত স্বচ্ছভাবে দর্শনের কথা বলতে আমি আর কাউকে দেখিনি।
সরদার স্যারের মুখ থেকে শোনা অনেক কথা আজও কানে প্রতিধ্বনিত হয়। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার একটি অমূল্য বাণী। তিনি বলতেন, গণতন্ত্র হচ্ছে ‘গণ’-এর তন্ত্র। ‘গণ’-এর জীবনাচরণই গণতন্ত্র। এর সঙ্গে শাসনব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। শাসকরা কখনও ‘গণ’-এর ইচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হন না। কাজেই শাসকের তন্ত্র আর যাই হোক, গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের জন্য ‘গণ’-এর যে আন্দোলন, সেটুকুই গণতন্ত্র; বাকিটুকু ‘ডুমুরের ফুল’। এই কথাগুলো এখনও ধ্রুপদি গানের মতো হৃদয়বীণায় বাজে।
এই আপাত সরল অথচ গভীর সত্যটি বুঝতে গেলে দরকার হয় সরদার স্যারের মতোই নির্মোহ দৃষ্টি। তিনি ছিলেন একেবারে ভিন্ন রকমের মানুষ—আদর্শে স্থিত, ধীরস্থির, আত্মসচেতন এবং অসম্ভব প্রজ্ঞাবান। কোনো লোভ-মোহ ছিল না তার। ভাবনা-চিন্তা আর জ্ঞানসাধনা ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে তার তেমন আকর্ষণ ছিল না বলেই মনে হয়। আর সে জন্যেই তিনি আমার কাছে চিরস্মরণীয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি ঘটনা আজও মনে পড়ে। তখন আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। স্যারের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগও ছিল। একবার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার কনট্রিবিউটর হিসেবে দুর্নীতি বিষয়ক একটি লেখা তৈরির প্রয়োজনে স্যারের কাছে গেলাম। স্যার খুব একটা পাত্তা দিলেন না। আমার উদ্দেশ্য জানার পর তিনি বললেন, ‘যার যেটা করার কথা, সেটাই ন্যায়। আর সেটা না করাটাই হচ্ছে অন্যায়। অন্যায়ই হচ্ছে দুর্নীতি। যেমন তুমি একজন ছাত্র। তোমার কাজ হচ্ছে ভালোভাবে লেখাপড়া করা। এখন তোমার ক্লাসে, সেমিনারে বা লাইব্রেরিতে থাকার কথা। কিন্তু তুমি তা না করে আমার কাছে এসেছ। আমার পড়ায় তুমি ব্যাঘাত ঘটাচ্ছ। এটাও অন্যায়। তার মানে তুমিও দুর্নীতি করছ।’ শুনে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সেদিন বুঝলাম, দুর্নীতি শুধু টাকাপয়সা লেনদেনের নাম নয়; নিজের কর্তব্যে অবহেলা করাটাও এক ধরনের দুর্নীতি। এরপর আর স্যারকে ঘাঁটানোর সাহস পাইনি।
সরদার স্যার সব সময় সরাসরি কথা বলতেন। তিনি কখনও ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কিছু বলতেন না। সাংবাদিকতা করার কালে তার আরও কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছিল। বহুবার তার বাসায় গেছি, গল্প করেছি। সেই গল্পগুলো কখনও আনুষ্ঠানিক ছিল না—কিন্তু প্রতিটি আলাপই ছিল একেকটি শিক্ষামূলক অধিবেশন। এ সময় স্যারের সাক্ষাৎকারের জন্য বিভিন্ন সময়ে শ্যামলী ও রাজাবাজারের বাসায় গেছি। স্যার সাক্ষাৎকার দিতে চাইতেন না। বলতেন, ‘আমি নিজেকে কোনো কোটেড পারসন মনে করি না।’
তবে একটি সাক্ষাৎকারের ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে। আমি তখন ‘মাতৃভূমি’ পত্রিকায় কাজ করি। শ্যামলীর চিলেকোঠার বাসায় গিয়েছিলাম। প্রথমে সাফ না করে দিলেন। অনেক আড্ডার পর হতাশ হয়ে ফিরতে গেলে বললেন, ‘কাল সন্ধ্যায় আসো। একটা রেকর্ডার নিয়ে আসবে। তুমি আমার কাছে কী জানতে চাও, সেটা রেকর্ড করে নেবে। তারপর লিখে আমাকে দেখিয়ে ছাপবে।’ নির্দিষ্ট দিনে রেকর্ডার নিয়ে হাজির হলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা কথা হলো। কিন্তু ঘরে এসে দেখি, রেকর্ডারে কিছুই ধরা পড়েনি। যন্ত্রের যন্ত্রণা সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পাই। কী করব? কোনো নোট নেই। পরদিন স্মৃতি থেকে সব লিখে ফেললাম। স্যারকে দেখাতে গেলে প্রকৃত ঘটনা জানিয়ে ক্ষমা চাইলাম। তিনি তেমন কোনো পরিবর্তন ছাড়াই ছাপার অনুমতি দিলেন। সেদিন নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর নতুন করে আস্থা পেয়েছিলাম!
“আমি জানি যে আমি কিছু জানি না, কিন্তু এরা জানে না যে এরা কিছু জানে না”—সক্রেটিসের এই উক্তিটি তিনি প্রায়ই ব্যবহার করতেন। তিনি নিজে যে কিছু জানেন না, এই কথাটি জোর দিয়েই বলতেন। বরিশালের আঁটিপাড়ার কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি সর্বদা নিঃসংকোচে বলতেন, ‘আমার দরিদ্র পিতামাতার দান করা জীবন নিয়ে এই পথ হেঁটে এসেছি।’ বাবা-মা নিরক্ষর, মাটির মানুষ হয়েও তাকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। এই ঋণ তিনি কখনও ভোলেননি। তার মতে, ‘জীবন জয়ী হবে।’ তিনি জীবনের অর্থ খুঁজেছেন জীবনযাপনের ভেতরেই।
সরদার স্যার মৃত্যুকে নিয়েও কথা বলতেন এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতায়। তার মতে, “আমার মেয়ে ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবাই চেষ্টা করুক না কেন, মৃত্যু তাকে নিতে আসবেই। মৃত্যুকে তিনি পরোয়া করেন না। মৃত্যু তার কাছে জন্মের মতোই স্বাভাবিকতা।” এই নির্লিপ্ত গ্রহণযোগ্যতা ছিল তার জীবনদর্শনেরই অংশ—যেখানে ভয় নয়, বোঝাপড়াই প্রধান।
স্যারের অনুবাদ গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষার এক মূল্যবান সম্পদ। একদিন তার অনূদিত ‘প্লেটোর সংলাপ’ পড়ে যারপরনাই মুগ্ধ। সেখানে সক্রেটিসের মৃত্যুকে গ্রহণ করার বর্ণনা—বন্ধুর প্রস্তাব সত্ত্বেও পালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত—এতটাই বিশ্বস্ত, ধ্রুপদি ও সাবলীল যে মনে হয়, অনুবাদক নিজেও যেন সেই দার্শনিক আগুনে দগ্ধ।
সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি স্যারের বিশ্বাস ও সমর্থন ছিল নিঃশর্ত। সরদার স্যার বলতেন, “তোমরা কেউ কমিউনিস্ট না থাকলেও আমি একাই কমিউনিস্ট থেকে যাব মরণের আগেও।” আর তার সেই বিখ্যাত উচ্চারণ—“সমাজতন্ত্র, যদি লাগে দশ লাখ বছর তবুও।” এই কথাগুলো কোনো স্লোগান ছিল না; ছিল তার জীবনব্যাপী প্রতিজ্ঞা। সমাজের জন্য, সমষ্টির জন্য, দশের জন্য মঙ্গলকর ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা—এই ছিল তার কাছে জীবনের সার্থকতা।
তার জীবনের একটি ঘটনাই তার চরিত্রকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পর বিলেতে পড়ার স্কলারশিপ পেলেন। ইন্টারভিউ দিতে কলকাতায় গেলেন। কিন্তু রাইটার্স বিল্ডিংয়ে না গিয়ে প্রথমে গেলেন কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে। সেখানে মুজাফফর আহমেদ ও নৃপেন চক্রবর্তীদের সঙ্গে কথোপকথনের পর, এক প্রকার হাসতে হাসতেই তিনি ছিঁড়ে ফেললেন ইন্টারভিউ কার্ড। শুরু করলেন পার্টির কাজ। আদর্শের কাছে ব্যক্তিগত সাফল্য কত তুচ্ছ—এমন দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।
পরে আত্মগোপন, গ্রেপ্তার, কারাজীবন—সবই এসেছে তার জীবনে। কিন্তু কোথাও তিনি আপস করেননি। এমনকি এক সময় পুলিশ তাকে খুঁজতে এসে ভুল মানুষ ভেবে ফিরে গেছে—এই ঘটনাটিও যেন তার জীবনের এক অদ্ভুত রসাত্মক ট্র্যাজেডি।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে তার সেই বিখ্যাত মন্তব্য আজও কানে বাজে: “এক সময়ের অবরোধবাসিনী এ সময়ের গার্মেন্ট শ্রমিক… আমি বলি, রাজপথে গার্মেন্ট শ্রমিক হাঁটে মানে, প্রতিদিন সকালে বিপ্লব হেঁটে যায়।” এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আলাদা করে—যেখানে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেই তিনি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতেন।
তিনি হতাশার বিরুদ্ধে ছিলেন। বলতেন, “আমার চারদিকে হতাশার সর্বগ্রাসী একটা ব্যাপার দেখি… জীবনের মধ্যে হতাশাকে অনুসন্ধান করতে হয় না। জীবনের মধ্যে আশার বীজ অনুসন্ধান করতে হয়।” তার এই আশাবাদ কোনো সরল আশাবাদ ছিল না; ছিল সংগ্রাম থেকে উঠে আসা এক গভীর বিশ্বাস।
তার জীবন শুরু হয়েছিল এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। নিজেই বলেছেন, “বাজারে গিয়ে তরিতরকারি বিক্রি করেছি ছোটবেলায়।” সেই মানুষই হয়ে উঠলেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। কিন্তু তার বিনয় ছিল অবিচল—“আমি হলাম মোস্ট নন-অ্যাম্বিশাস পারসন… আমি কুলি হতে চেয়েছিলাম।”
তিনি নিজেকে বলতেন, “আই ওয়াজ আ কমিউনিস্ট বাই মাইসেলফ।” তার পরিচয় তিনি নিজে বানাননি—“আমি কৃষকের পোলা। আমি শুধু বাপের ঋণ শোধ করতে চাই।” এই কথাগুলোতেই তার গভীর মানবিকতা প্রকাশ পায়।
জীবন সম্পর্কে তার এক অদ্ভুত অথচ গভীর উপলব্ধি ছিল: “জীবনের অর্থই জীবন। জীবন জীবিত থাকে আর মৃত্যু মারা যায়।” এই বাক্যের মধ্যেই যেন তার পুরো দর্শন সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে।
আজ তার জন্মদিনে মনে হয়—আমরা তাকে যতটা বুঝেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি এখনো বুঝতে বাকি। তার লেখা, তার অনুবাদ, তার জীবন—সবই আমাদের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অন্তহীন আহ্বান। এই ফিরে যাওয়াটা কেবল স্মৃতির জন্য নয়—বরং নিজেদের জন্য। কারণ, সরদার ফজলুল করিমের মতো মানুষরা কেবল অতীতের নন; তাঁরা ভবিষ্যতের পথও আলোকিত করে দেন।
“আমি জানি যে আমি কিছু জানি না, কিন্তু এরা জানে না যে এরা কিছু জানে না”—এই দৃষ্টিভঙ্গির ঘনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন তিনি। নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করার মধ্যেই যে জ্ঞানের সূচনা, তিনি তা জীবন দিয়ে বুঝিয়েছেন। বরিশালের আঁটিপাড়া গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি সর্বদাই বলতেন, ‘আমার দরিদ্র পিতামাতার দান করা জীবন নিয়ে এই পথটা হেঁটে এসেছি।’ দীর্ঘ ৮৯ বছরের জীবনে তিনি ‘জীবন’ নিয়ে ভেবেছেন যতটা, মৃত্যু নিয়ে ভেবেছেন তার চেয়ে অনেক কম। শেষ বয়সেও তার প্রিয় উচ্চারণ ছিল—‘জীবন জয়ী হবে।’ জীবনকেই তিনি শেষ পর্যন্ত মহিমান্বিত করে যেতে চেয়েছেন।