এআই থামবে না, খাপ খাইয়ে নিতে পারবে তো বাংলাদেশ?
এআই প্রযুক্তির গতি থামানোর ক্ষমতা আমাদের কারও হাতে নেই। কিন্তু তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা কীভাবে নিজেদের বদলাব, ওই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।
যারা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি বানাচ্ছেন, তাদের ভেতর থেকেই এখন এর গতি কমানোর তাগিদ শোনা যাচ্ছে। শুনতে সত্যি অদ্ভুত লাগে; যে প্রতিযোগিতায় সবার আগে যাওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য, ওই দৌড় থামানোর ডাক আসছে এখন ভেতরের মানুষদের থেকেই। আহ্বানটি যখন ‘অ্যানথ্রপিক’-এর প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদির মুখ থেকে আসে, তখন সেটিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার আশঙ্কাটাও খুব স্পষ্ট। অসংখ্য এআই এজেন্ট একবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মাত্র এক বছরের মধ্যেই তারা অত্যন্ত শক্তিশালী বটনেট গড়ে তুলতে পারে, ইন্টারনেটের বড় অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে, আর ওই ক্ষতির অঙ্কে পৌছাতে পারে শত শত কোটি ডলারে। গত গ্রীষ্মে একটি জনপ্রিয় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে শত শত এআই এজেন্টের অনধিকার প্রবেশের ঘটনাকে তিনি প্রথম বাস্তব সতর্কসংকেত হিসেবে তুলে ধরেছেন। আরও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, সাধারণত যেসব বিষয়ে প্রযুক্তি মালিকরা একমত হতে চান না, ওই স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্কও এবার তার এই সতর্কবার্তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন।
তাদের এই একমত হওয়াকেও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। সমালোচকদের যুক্তি, কোম্পানিগুলোর এই অবস্থানের পেছনে পুরোপুরি নিঃস্বার্থ ভাবনা নাও থাকতে পারে। বড় কোনো সাইবার বিপর্যয় ঘটলে আইনি দায় কার ওপর পড়বে, ক্ষতিপূরণের বোঝাই বা কে বইবে, ওই হিসাবও হয়তো এখানে কাজ করছে। আবার অন্য পক্ষের প্রশ্ন, যে পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, তা ঝুঁকি ঠেকানোর জন্য আদৌ যথেষ্ট কি না। অর্থাৎ আপত্তির জায়গা আলাদা, প্রশ্নও আলাদা; কিন্তু দুপক্ষের কথার মিল একটি জায়গায়; এআইয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তাদের একার হাতে থাকা নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা হয়তো বিশ্বমঞ্চে এআই তৈরির দৌড়ে নেই, কিন্তু এর ব্যবহার করছি খুব দ্রুতগতিতে। তাই কোনো ভুল হলে বা বড় বিপদ ঘটলে তার আঘাত থেকে আমাদেরও রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা নিজেরা এআই বানাচ্ছি না বলে এই ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকব, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ওই দ্রুত ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের নিরাপত্তার প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকলেও এআইয়ের ব্যবহার থেমে নেই। কাজ দ্রুত শেষ করতে গিয়ে অনেক কর্মী ব্যাংকের গোপনীয় তথ্য, ঋণ প্রস্তাবের খসড়া কিংবা নিরীক্ষা প্রতিবেদনের অংশ বিদেশি সার্ভারে থাকা চ্যাটবটে তুলে দিচ্ছেন। এতে সাময়িকভাবে কাজ সহজ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার এক ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তথ্য কোথায় যাচ্ছে, কে তা ব্যবহার করছে আর পরে কোথায় সংরক্ষিত থাকছে, এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় ওই কর্মীর নিজের কাছেও নেই। অথচ এআই ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি ঠিক এখানেই।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে আট কোটি ডলার চুরির ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে এখনো টাটকা। ওই ঘটনা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছিল, ব্যবস্থার একটি ছোট দুর্বলতাও কীভাবে পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। আজ ওই দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করা এআইয়ের জন্য আরও সহজ। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নকল কণ্ঠ আর নকল মুখ। ঘরে বসে অ্যাকাউন্ট খোলা, মোবাইলে টাকা পাঠানো কিংবা অনলাইনে লেনদেনের ওপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, মানুষের কণ্ঠ ও চেহারা নকল করাও তত সহজ হয়ে উঠছে। অথচ প্রতারণা ঠেকানোর পদ্ধতিগুলো এখনো অনেকটাই পুরোনো কৌশল ধরে এগোয়। সিস্টেম খোঁজে পরিচিত ধরনের জালিয়াতির লক্ষণ। কিন্তু এআই নতুন কৌশল তৈরি করছে প্রতিদিন। ফলে পুরোনো ফাঁদে নতুন ধরনের প্রতারণা ধরা পড়ছে না; এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফাঁক।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বসে নেই। ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংকিং খাতে এআই নীতিমালা চালুর কথা জানিয়েছে তারা; নিজস্ব মডেল তৈরির কথাও ভাবছে। উদ্যোগটি কিছুটা দেরিতে হলেও জরুরি। তবে নীতিমালা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আসল পরীক্ষা শুরু হবে এরপর। ব্যাংকগুলো সেটি কতটা মেনে চলছে, আর কর্মীদের দৈনন্দিন কাজে ওই নির্দেশনা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই দেখার বিষয়। কাগজে নীতিমালা থাকলেই হবে না, ব্যাংকের প্রতিটি স্তরে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংকিং খাতের এই ঝুঁকির বাইরে এখন সামনে আসছে আরেকটি বড় প্রশ্ন, কাজের বাজারে এআইয়ের প্রভাব কতটা পড়বে? বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও স্পর্শকাতর। উন্নত দেশগুলোতে এআই ইতিমধ্যে অনেক মাঝারি দক্ষতার কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে ওই কাজগুলোর অনেকগুলোই আবার হাজার হাজার মানুষের আয়ের পথ। ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট, কনটেন্ট যাচাই, সাধারণ অনুবাদ কিংবা গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করে দেশি-বিদেশি বাজারে বহু মানুষ আয় করছেন।
এতদিন কম মজুরির দক্ষ কর্মীই ছিল আমাদের বড় সুবিধা। এখন ওই সুবিধার জায়গাতেই এআই চাপ তৈরি করছে। যে কাজ শেষ করতে একজন মানুষকে কয়েক ঘণ্টা দিতে হয়, একটি এআই টুল সেটি করে ফেলতে পারে অনেক কম সময়ে। ফলে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হবে। এআইয়ের গতি থামবে কি না, সেটি আমাদের হাতে নেই; কিন্তু ওই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রস্তুত হব কি না, সিদ্ধান্তটা এখনো আমাদের হাতেই আছে।
ঝুঁকিটা শুধু ব্যাংক বা চাকরির বাজারে আটকে থাকবে না; ভাষা ও তথ্যের জগতেও এর প্রভাব পড়বে। জমির কাগজ, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য, শিক্ষার্থীর ফলাফল; সবই ধীরে ধীরে ডিজিটাল হচ্ছে। অথচ ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার কাঠামো এখনো অনেকটাই দুর্বল। বাংলা ভাষায় উন্মুক্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডারও প্রায় নেই। ফলে বাংলায় কাজ করা মডেল তৈরির ক্ষেত্রে বাইরের কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আর ভাষা ও তথ্য যখন অন্যের হাতে, তখন গুজব, ভুয়া তথ্য আর বানানো ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে। নির্বাচন, ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার মিলিয়ে বাংলাদেশ এমন ঝুঁকির জন্য খুবই সংবেদনশীল। প্রযুক্তিবিদরা মানবজাতির বিলুপ্তির যে দূরবর্তী আশঙ্কার কথা বলেন, তার অনেক আগেই আমাদের সামনে আরও বাস্তব একটি সংকট এসে দাঁড়াতে পারে, মানুষে মানুষে আস্থা কমে যাওয়া।
এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থীই গবেষণাপত্র, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা তথ্য বিশ্লেষণের কাজে কোনো না কোনোভাবে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে। বিদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে লেখার সময় মস্তিষ্কের সক্রিয়তা তুলনামূলক কম থাকে, লেখায় একই চিন্তা ঘুরেফিরে আসে। এআই আবার কখনো এমন বই বা গবেষণাপত্রের নাম বানিয়ে দেয়, বাস্তবে যার অস্তিত্বই নেই। অনেক শিক্ষকও বাস্তবতাটি মেনে নিয়ে এআইকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখার বদলে এর সঠিক ব্যবহার শেখানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। ফলে এআই ব্যবহার করা উচিত কি না, তা মূল প্রশ্ন নয়; আসল বিষয় হলো কোথায়, কতটা এবং কীভাবে এআই ব্যবহার করলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন থাকে।
এআই প্রযুক্তির গতি থামানোর ক্ষমতা আমাদের কারও হাতে নেই। কিন্তু তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা কীভাবে নিজেদের বদলাব, ওই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে শুরুতেই স্পষ্ট করে দিতে হবে, কোন তথ্য কোনোভাবেই বাইরে দেওয়া যাবে না, কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে আর কোথায় মানুষের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো কাজ এআইয়ের হাতে চলে গেলেই ওই কর্মীকে অপ্রয়োজনীয় ভাবার কোনো সুযোগ নেই; তাকে নতুন কাজ শেখার সুযোগ দিতে হবে এবং নতুন দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এআই নিষিদ্ধ করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় এআই ব্যবহার করা যাবে আর কোথায় শিক্ষার্থীকে নিজের মাথা খাটিয়ে লিখতে, ভাবতে ও বিশ্লেষণ করতে হবে, ওই সীমাটা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। প্রযুক্তি তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যাবে। আমরা চাইলে পিছিয়ে থাকতে পারি, আবার চাইলে সময়ের সঙ্গে নিজেদের বদলে নিতে পারি। বাংলাদেশের সামনে তাই অযথা ভয় পাওয়ার চেয়ে বড় কাজ হলো এআই প্রযুক্তিকে গভীরভাবে বোঝা, সঠিক নিয়মের মধ্যে আনা এবং মানুষের নিজস্ব দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তির শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com
