Published : 07 May 2026, 08:41 AM
অবশেষে রবার্ট ব্রুসীয় সূত্র ও সমীকরণে বঙ্গবিজয় করল ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি! উত্তর-পূর্ব ভারতের যেসব রাজ্যে বাঙালিরা বিশাল সংখ্যায় আছে, সেগুলোর প্রতিটিতেই এই সুবাদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ক্ষমতাসীন হলো তারা। ২০১৮-২০২৩ সালে ত্রিপুরা, ২০১৬-২০২১-২০২৬ সালে আসামের পর এবার পশ্চিমবঙ্গ জিতে ষোলকলা পূর্ণ করল কেন্দ্রীয় শাসক দলটি। এর ফলে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ভাগাভাগি করা উত্তর-পূর্ব ভারতের পাঁচটির মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যই তাদের দখলে গেল।
আসামে ১২৬ আসনের মধ্যে গেল দুইবার যথাক্রমে ৮৬ ও ৭৫ আসন পাওয়া বিজেপির ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) জোট এবার ১০২টি আসনে জিতে আরও শক্ত খুঁটি গেড়েছে সেখানে। কিন্তু, আসামের এই বাড়তি প্রাপ্তিও ঢাকা পড়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের অভাবিত সাফল্যে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের পতন একদিন যেমন বিশাল খবর হয়ে উঠেছিল, বিজেপির পত্তন ঠিক তেমনই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বঙ্গের এমনই মহিমা!
২.
পশ্চিমবঙ্গে একটি বাদে ঘোষিত ২৯৩টির মধ্যে বিজেপি ২০৭টি ও বিদায়ী শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জিতেছে। অথচ, ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম রেজিমের অবসানকালে ১৮৪টি আসন নিয়ে যখন তৃণমূল ক্ষমতায় আসে, তখন বিজেপি একটি আসনও জেতেনি। পরের নির্বাচনে তৃণমূল ২১১টি আসন পেল, বিজেপি ৩টি আসন নিয়ে পড়েছিল এককোণে। গত ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের আসন বেড়ে হলো ২১৫টি, বিজেপিও একলাফে প্রধান বিরোধী দল হয়ে গেল ৭৭টি আসন পেয়ে। ঠিক পাঁচ বছর পর আজকে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দল আসন সমীকরণে আবারও প্রায় সমানে সমান। তবে, ভোজভাজির মতো পাল্টে গেল শুধু দল দুটির নাম!
বিধানসভা হোক বা লোকসভা, যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বলার মতো কোনো অবস্থানই ছিল না মাত্র ১০-১৫ বছর আগেও, তারাই আজ ক্ষমতায়। কী করে এই পটপরিবর্তন ঘটল, সেই দীর্ঘ ইতিহাস বোঝাটা আজকের সময়ে অনাবশ্যক।

৩.
১৯৮০ সালে গঠিত হবার পর সর্বভারতীয় পার্টি হিসেবে বিজেপির উত্থান ঘটে ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। পাঁচ বছর আগে মাত্র ২টি আসন পাওয়া বিজেপি ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে ৮৫টি আসন পেয়ে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। মূলত অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগঠিত আন্দোলনে নির্বাচনি মেনিফেস্টোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানোয় সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির জনপ্রিয় উত্থান ঘটে। এ সময় (১৯৮৬-১৯৯১) দলটির সভাপতি ছিলেন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি।
হিন্দু জাতীয়তাবাদী এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নব্বইয়ের দশকে বিজেপি আরও বড় নির্বাচনি পার্টিতে পরিণত হয়। এই দশকে অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের তিনটিতেই তারা লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ইতিহাসে কংগ্রেস ব্যতীত আর কোনো দলের এই রেকর্ড ছিল না। নব্বইয়ের দশকের প্রথমটিতে, অর্থাৎ, ১৯৯১ সালের আগাম নির্বাচনে ১২০টি আসন পেয়ে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পরের টার্মেই সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রধান দলে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটি আজও একটি সর্বভারতীয় রেকর্ড।
এরপর, ভারতীয় রাজনীতিতে আসে অস্থিতিশীল সরকার এবং ঝুলন্ত লোকসভার কাল। তিন বছরে তিনবার নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় সে সময়। কাকতালীয় নাকি অলৌকিক, এ তিন নির্বাচনেই সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পেয়ে কংগ্রেস আসন সংখ্যায় দ্বিতীয় আর বিজেপি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পেয়ে আসন সংখ্যায় প্রথম হয়!
১৯৯৬ সালে ১৬১টি এবং ১৯৯৮ সালে ১৮২টি আসন পাওয়ার পরও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় অটল বিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন সরকার টিকে থাকতে পারেনি। অবশেষে লোকসভার ৫৪৩টির মধ্যে ২৭২-এর ম্যাজিক নম্বর তারা অর্জন করে ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে। বিজেপি আবারও ১৮২টি আসন পায়, আর তাদের জোট এনডিএ ২৯৯টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বাজপেয়ির নেতৃত্বে। সে সুবাদে কংগ্রেসের বাইরে পাঁচ বছর পূর্ণ করা প্রথম ভারতীয় সরকারেও পরিণত হয় তারা।
উল্লেখ্য যে, স্বাধীন ভারতের শুরু থেকেই কংগ্রেসের বিপরীতে লোকসভায় প্রধান বিরোধী দল ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্ক্সিস্ট (সিপিএম) ও তাদের জোট। সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে সত্তর-আশির দশকে। তবে, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে চতুর্থ এবং ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে তৃতীয় হয়েছিল সিপিএম জোট, যার সিংহভাগ আসন ছিল পশ্চিমবঙ্গের। সাকুল্যে পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ৪৭ থেকে ৪৯ ভাগ পপুলার ভোট পেত বামরা, আসন পেত ৭৫-৮০ ভাগ। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পেত কংগ্রেস।
১৯৯৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঘটে গেল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। ভারতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত ৩০ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা কংগ্রেসের ভোটব্যাংকে অবলীলায় নেমে এল ধস। সেবার দল গঠন করেই লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় মমতার তৃণমূল। ৭টি আসন জেতে তৃণমূল, আর মমতা ম্যাজিকে অবশেষে বহু চেষ্টার পর পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা-বিধানসভা মিলিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আসন জেতে বিজেপিও; একমাত্র বিজয়ীর নাম তপন শিকদার। সেবারই প্রথম পপুলার ভোটও দ্বিসংখ্যায় উন্নীত হয় তাদের। পরে ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি দুটি আর তৃণমূল আটটি আসন পায় এবং এর বদৌলতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাজপেয়ির কেন্দ্রীয় সরকারে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় রেলের মন্ত্রী হিসেবে পুরস্কৃত হন।
ধীরে ধীরে কেন্দ্রে বিজেপির ‘কংগ্রেস ঠেকাও’ নীতি এবং রাজ্যে তৃণমূলের ‘বামফ্রন্ট হটাও’ প্রকল্প এক জবরদস্ত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম হয়!
৪.
এই সময়টিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি ছিল মিশ্র আদর্শ ও ডিগবাজিময়। ২০০০ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিলেও কোনো কারণ দেখানো ছাড়াই তিনি সেটা প্রত্যাহার করেন। ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এনডিএর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে তিনি তার পুরোনো পার্টি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেন। নবগঠিত পার্টি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এটাই ছিল তৃণমূলের প্রথম নির্বাচন। জ্যোতি বসুর অবসরে নির্বাচনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট ১৯৯ আসন জেতে। বিপরীতে তৃণমূল ৬০টি আসন জিতে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিধানসভায় প্রবেশ করে।
এরপর ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে মমতা ফের এনডিএ জোটে ফিরে কয়লা ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। এই নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) জোটের কাছে এনডিএ জোটের ভরাডুবি হয় এবং জোট পশ্চিমবঙ্গে মাত্র একটি আসন পায়, যেটি জেতেন মমতা। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ জোটের আরও ভরাডুবি ঘটে এবং তৃণমূলের আসন অর্ধেকে নেমে আসার পাশাপাশি জোটসঙ্গী বিজেপিও বরাবরের মতো শূন্য হাতে ঘরে ফেরে। বুদ্ধদেবের বামফ্রন্ট ২৩৫টি আসন নিয়ে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে আবারও সরকার গঠন করে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক আন্দোলন-জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় আসে এর পরপরই। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পবাণিজ্য বিস্তার ও বেকার সমস্যা নিরসনের উদ্দেশ্যে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। কিন্তু, মমতার নেতৃত্বে আন্দোলনে ব্যাপকভাবে দানা বাঁধে এবং কেন্দ্রের শাসকদল কংগ্রেস ও বিরোধী দল বিজেপিসহ রাজ্যের অন্যান্য বিরোধী দলগুলোও তাকে সমর্থন করে। ফলে রাজ্য সরকারকে পিছু হটতে হয়। বেনজির ধরপাকড় ও হতাহতের ঘটনা পরবর্তী লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
বিস্ময়কর হলেও সত্য, ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটে যোগদান করে তৃণমূল এবং ১৯টি আসন জেতে। ফলস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের দ্বিতীয় আমলের মন্ত্রিসভায় প্রবেশ করেন মমতা। ফের তিনি পুরস্কৃত হন রেলমন্ত্রী হিসেবে! এরপরই আসে ২০১১ সালের সেই অনন্ত অপেক্ষার ক্ষণ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূলের (১৮৪টি) নেতৃত্বে ইউপিএ ২২৬টি আসন জিতে পতন ঘটায় ৩৪ বছরের বাম দুর্গের।
৫.
সেদিনের পর থেকে টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করল তৃণমূল। আস্তে ধীরে পর্দার আড়ালে সরতে সরতে বামফ্রন্ট ধুঁকছে, কংগ্রেস তো আগে থেকেই ধুঁকছিল। যে কংগ্রেসের সঙ্গে একদিন জোট করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা, তাদেরও তিনি রাজ্যজোট থেকে দূরে ঠেলে দেন ক্ষমতার মোহে। বরং তার প্রয়োজন ছিল একটি দুর্বল ও ক্ষুদ্র বিরোধী দলের; সেটা বিজেপি ছাড়া আর কেই-বা হতে পারত!
প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যে মমতার হাত ধরে একদিন পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া পতাকা উড়েছিল, কালক্রমে তারাই হয়ে উঠল তার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী— লোকসভাতেও, বিধানসভাতেও। ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে দল পশ্চিমবঙ্গে যেকোনো নির্বাচনে ৩টির বেশি আসন কিংবা ১০-১১ ভাগের অধিক পপুলার ভোট পায়নি, তারাই কি না পরপর সব নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়ে গেল। ২০১৯ সালের লোকসভায় পেল ১৮টি আসন, ২০২১ সালের বিধানসভায় ৭৭টি, ২০২৪ সালের লোকসভায় ১২টি। আর ২০২৬ সালের বিধানসভায় তো একেবারে তৃণমূলের রাজ্যপাট গুটিয়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় বসার বন্দোবস্ত করে ফেলল!
তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার আলো-আঁধারি আদর্শ। কংগ্রেস-বিজেপি-বামপন্থিদের একটা পরিষ্কার আদর্শ, অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। তৃণমূলের আদর্শটা কী, অর্থনৈতিক কর্মসূচি কী—সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মানুষ। আদর্শ যদি খুব সবল থাকত, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল জাগরণের অন্যতম কাণ্ডারি মুকুল রায় কী করে শেষ জীবনে বিজেপিতে যোগ দেন এবং আবার তৃণমূলে ফিরে আসেন? তৃণমূলের এককালের অমিত সম্ভাবনাময় নেতা, নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর আন্দোলনের অন্যতম বড় মুখ শুভেন্দু অধিকারী কী করে বঙ্গে বিজেপির রামরাজত্ব কায়েমের ঝাণ্ডাদার হন? কী করে এবারের নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের দুই আসন জিতে তাক লাগানো আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান ও তৃণমূল সরকারের সাবেক মন্ত্রী হুমায়ুন কবীর কংগ্রেস-তৃণমূল-কংগ্রেস-বিজেপি করে ফের তৃণমূলে যোগ দেন? তৃণমূল ও বিজেপি কি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ?
এরকম বহু মুখ ধীরে ধীরে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে গেছেন। এখন তো আরও যাবেন। কারণ এতদিন তারা নরম হিন্দু জাতীয়তাবাদী ছিলেন, এখন গরম হয়ে উঠবেন। তৃণমূল অসাম্প্রদায়িক দল হলে, সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে না খেললে, বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে সে চ্যালেঞ্জ করতে পারত। কিন্তু, সেই নৈতিক ভিত্তি তার নেই; ফলে, তৃণমূলের ক্ষয়ে যাওয়াই হয়তো নিয়তি হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে!
ক্ষমতায় গিয়েই বামনিধনে ব্যস্ত ছিল তৃণমূল। আজকে নিন্দনীয় ও ন্যাক্কারজনকভাবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে—তখন ছিল ট্র্যাজেডি, এখন হয়েছে ফার্স! সেই পুনরাবৃত্তি করছে তৃণমূলেরই এককালের অভিন্নহৃদয় বন্ধু বিজেপি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূলকে নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়ে।
৬.
আশ্চর্যই বটে, এত অল্প সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এমন উত্থান ঘটবে, তা বোধহয় খোদ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘও (আরএসএস) ভাবেনি! ইতিপূর্বে পশ্চিম ভারত, মধ্য ভারত ও উত্তর ভারত তথা ‘হিন্দি হৃদভূমি’র গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব রাজ্যেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া বিজেপির জন্য পশ্চিমবঙ্গ ছিল ‘দ্য লাস্ট ফ্রন্টিয়ার’। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষের ইতিহাসে আসা সব শাসকের জন্য বাংলা বরাবরই তা-ই ছিল। গোপালকৃষ্ণ গোখলে যে বলেছিলেন, ‘বাংলা আজ যা চিন্তা করে, বাকি ভারত করে আগামীকাল’, সেই কথাটার মধ্যে একটা রাজনৈতিক বোঝাপড়ারও আভাস আছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কথাটা তো আরও তীক্ষ্ণ, ‘কলকাতা না পেলে বাংলা দিয়ে তিনি কী করবেন!’ মানে, বাংলা ও কলকাতাকে বাদ দিয়ে ভারতবর্ষে কিছু করা সম্ভব না।
সত্য এই যে, বাংলা যার, ভারত তার—এই যুগবাণীর সমাপ্তি বহু আগেই ঘটে গেছে। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বাংলার গুরুত্ব মিটে গেছে ১৯১১ সালের তথাকথিত বঙ্গভঙ্গ রদ তথা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ‘বৃহৎ ভাঙনে’র মধ্য দিয়ে। পর্যায়ক্রমে ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িকীকরণের ভারতভাগ এসে সেই কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। কিন্তু, বিজেপি নব্বইয়ের দশকে পুনর্জীবনের পর, বিশেষত ১৯৯৯ সালে পূর্ণ মেয়াদে সর্বভারতীয় ক্ষমতায় আসীনের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থেকেছে। সেটি গভীর শ্যেনদৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে এই গত দশকে এবং তা এতটাই যে, বাংলা দখলের ভারতবর্ষীয় সেই যুগবাণীটিই তারা প্রচ্ছন্নভাবে ফিরিয়ে এনেছে।
বিজেপির পূর্বদ্রষ্টা তাত্ত্বিকগুরু এবং পূর্বসূরী সংগঠন জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গে দলটি ব্রাত্য ছিল মূলত এই রাজ্যের বাম সংস্কৃতির কারণে। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের পরাজয় ও ক্ষয়, ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে শুরু হওয়া মোদি-শাহ রাজ এবং গত ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনামল—সব মিলিয়ে তৃণমূল-বিজেপির যে বামবিরোধী রসায়ন এই রাজ্যে শুরু হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজকের এই পতন।
বিজেপির তো খুব অনিবার্যভাবেই বাংলা প্রয়োজন ছিল, অতীতে সবারই যেমন ছিল। বিজেপির ছিল অনন্য কারণ—বাংলা দখল করতে না পারলে ভারতভূমে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন যে তাদের অপূর্ণই থেকে যাবে! সেই স্বপ্ন তারা মোটামুটি সিকি শতাব্দীর চেষ্টাতেই পূরণ করে ফেলল। সত্যিকার অর্থেই, বাংলা তথা ঔপনিবেশিক বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সিংহভাগ দখলের মধ্য দিয়ে ভারতে বিজেপির রামরাজ্য ২.০ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নপালা শুরু হয়ে গেল হয়তো!
ইতিহাস সাক্ষী, এই স্বপ্নপূরণে তাদের ‘সারথি’ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার পার্টি তৃণমূল কংগ্রেস!