২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

পশ্চিমা আমদানি নয়: সুফি দর্শনেই আছে বহুত্ববাদের শিকড়

সুফিবাদ মানুষকে তার বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং অহংকার ও উগ্রতা ভুলে অন্যকে আপন করে নিতে শেখায়।

পশ্চিমা আমদানি নয়: সুফি দর্শনেই আছে বহুত্ববাদের শিকড়

সুফিবাদ শেখায় বর্জন নয়, ভালোবাসাই ধর্মের আসল ভিত্তি—যেখানে ভেদাভেদ ভুলে একই আঙিনায় দাঁড়াতে পারে নানান ধর্ম ও মতের মানুষ।

ফারাবী বিন জহির ফারাবী বিন জহির

Published : 24 Sep 2026, 05:54 PM

Updated : 24 Sep 2026, 05:54 PM

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তর্ক কখনোই শেষ না হওয়া এক যুদ্ধক্ষেত্রের নাম। একপক্ষ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি শুনলেই আঁতকে ওঠে—ভেবে নেয় রাষ্ট্র থেকে বুঝি ধর্মকে বিতাড়িত করার পাঁয়তারা চলছে। অন্যপক্ষও এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেন বিকল্প বলতে শুধু নাস্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই বাকি আছে। সত্যি বলতে, দুই পক্ষই ভুল জায়গায় লড়াইটা লড়ছে।

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়; ফাঁকা মসজিদ আর তালা ঝুলানো মন্দির নয়। সোজা কথায় এর চারটি মূল দাবি: ১. রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের লাঠিয়াল না হয়ে সবার প্রতি নিরপেক্ষ থাকবে; ২. বিশ্বাস যা-ই হোক, নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে; ৩. নিজের উপাসনা করা ও বিশ্বাস বদলানোর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে; এবং ৪. ধর্ম থাকবে স্রেফ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়—কে দেশের খাঁটি নাগরিক, তা মাপার মাপকাঠি ধর্ম নয়।

একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গড়তে মানুষকে অধার্মিক হতে হয় না। দরকার কেবল এমন এক রাষ্ট্র ও নাগরিক সংস্কৃতি, যা সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়। মানুষ প্রার্থনা করছে—সমস্যাটা কখনোই এতে ছিল না। সমস্যা বাধল তখনই, যখন ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনীতির মেরুকরণের হাতিয়ার বানানো হলো।

এই মেরুকরণের সমস্যার সমাধান শুধু সংবিধানের পাতায় খুঁজলে চলবে না, এর একটা বড় অংশ আসতে হবে ধর্মীয় জীবনের ভেতর থেকেই। আইন কাগজে-কলমে সমতার নিশ্চয়তা দিতে পারে; কিন্তু সেই সমতাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে স্বাভাবিক করে তোলার শক্তি আইনের নেই। তার জন্য প্রয়োজন নিজেদের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক শক্তি। আর এই অঞ্চলে সুফিবাদ হতে পারে আমাদের সেই চেনা শিকড়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎস।

সুফিবাদ কোনো নির্দিষ্ট উপদল বা রাজনৈতিক প্রেসক্রিপশন নয়। এটি ইসলামিক আধ্যাত্মিকতার এক বিস্তৃত ঐতিহ্য, যে ঐতিহ্যে ভিন্নধর্মের মানুষও অনায়াসে জায়গা পায়। সুফিবাদ কয়েকটি বিশেষ বিষয়ে জোর দেয়: লোকদেখানো প্রার্থনার চেয়ে ভেতরের আত্মাকে বড় করে দেখা, পরিচয়ের ট্যাগের চেয়ে নৈতিক চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া, ক্ষমতার অন্ধ দাপটের চেয়ে বিনয়কে বেছে নেওয়া, এবং সহানুভূতিকে কোনো বিলাসিতা নয়, পরম ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা; আর সেই সঙ্গে স্রষ্টার সঙ্গে এমন সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, যার মাঝে কোনো প্রতিষ্ঠান বা মধ্যস্বত্বভোগীর জায়গা নেই।

এসবের মানে এই নয় যে সুফিবাদ ধর্মহীন, বরং এটি গভীরভাবে ধর্মীয়। তবে এর ক্ষমতার মূল কেন্দ্রটা রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে—আর ঠিক এখানেই সুফিবাদের আসল শক্তি। যে ঐতিহ্য একজন মানুষকে কোনো কাগজের লেবেল দিয়ে নয়, তার নৈতিক চরিত্র দিয়ে মূল্যায়ন করে—সেই ঐতিহ্য দিয়ে অন্যকে বর্জন ও সমাজচ্যুত করার অস্ত্র বানানো কঠিন।

শত শত বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সুফি দরগাহগুলো এমন স্থানে পরিণত হয়েছে, যেখানে গোঁড়ামির শক্ত দেয়ালগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে গেছে। আজমীর, দিল্লির নিজামুদ্দিন, সিলেটের শাহজালাল, সুরেশ্বরের দরবার, বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মতো আরও অনেক মাজারের মায়াবী আঙিনায় হিন্দু-মুসলিম এক লাইনে দাঁড়িয়ে একই আকুতি জানায়। তাদের ধর্মীয় শাস্ত্র, ধর্মাচার আলাদা, কিন্তু জীবনের অভাব-যোগগুলো হুবহু এক। এই দরগাহগুলো কাউকে সেই অমিল মেটানোর শর্ত না দিয়েই দুটো বাস্তবতাকে এক ছাদের নিচে জায়গা দেয়।

আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসেও ঠিক একই প্রতিচ্ছবি। বুল্লে শাহ গোঁড়ামিকে খোঁচা দিয়েছেন। শাহ আব্দুল লতিফ ভিটাই তার কালজয়ী কাব্য সাজিয়েছেন সিন্ধুর লোকগাথা দিয়ে। আর বাংলায় সুফি ভাবধারা, বাউল ও বৈষ্ণব সুর এত দীর্ঘকাল ধরে একে অপরের সঙ্গে মিশেছে যে, কোনটা কার—তা আলাদা করা শুধু গবেষণার মাধ্যমেই সম্ভব। এটি গড়ে উঠেছিল একেবারে প্রান্তিক পর্যায় থেকে। এই সুফি ভাবধারা এমন সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করেছিল—যা ধর্মের সীমান্তে এসে থমকে না গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

এই ইতিহাসই আমাদের এখানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে থাকা সবচেয়ে বড় অজুহাতটাকে এক নিমেষে দূর করে দেয়। বহুত্ববাদ পশ্চিম থেকে আমদানি করা কোনো জিনিস নয়; এটা আমাদের খাঁটি দেশি ঐতিহ্য।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি খুব সহজ একটা কৌশলে চলে: মানুষের সব পরিচয় মুছে দিয়ে শুধু তার ধর্মকেই একমাত্র পরিচয় বানিয়ে দেয়। পরিচয় যখন একবার এই ছাঁচে ঢেলে দেওয়া হয়, তখন বাকি সব সহজ হয়ে যায়। প্রতিবেশী আর মানুষ থাকে না, হয়ে যায় অন্য ধর্মের লোক; ছোটখাটো রাগ-ক্ষোভগুলো রূপ নেয় দলগত আক্রোশে, আর সব শেষে সহিংসতাকেও সঠিক বলে মনে হতে থাকে।

সুফি দর্শন গোড়াতেই এই নোংরা চালটা ভণ্ডুল করে দেয়। ধর্মকে যখন স্রেফ ভালো মানুষ হওয়ার সাধনা হিসেবে দেখা হয়, তখন প্রধান প্রশ্নটা আর ‘লোকটা কোন ধর্মের’ থাকে না—প্রশ্ন উঠে আসে, মানুষ হিসেবে তার স্বভাব-চরিত্র কেমন? শুনতে সামান্য মনে হলেও, এই একটা জায়গাতেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। প্রথম প্রশ্নটা যেকোনো উগ্রতাকে অন্ধভাবে জায়েজ করতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নটার সামনে কোনো উগ্র জনতার ফাঁকা আওয়াজ টেকে না।

সুফিভাবাপন্ন সংস্কৃতি তৈরি করেছে একসঙ্গে থাকার সাধারণ জায়গা, যা সর্বসাধারণের, সব মানুষের। আমরা একই উৎসবে, একই দরগাহের আঙিনায়, একই গানে, একই পাড়ায় একসঙ্গে বাস করতে পারি—আর এর জন্য কাউকে নিজ বিশ্বাস বিসর্জন দিতে হয় না। সহাবস্থান মানে হুবহু একমত হওয়া নয়; এর মানে হলো একমত না হয়েও চমৎকার যৌথ জীবন গড়ে তোলা সম্ভব—এই যূধবদ্ধতার সত্যটা আবিষ্কার করা।

এই কারণেই সুফিবাদের সাংস্কৃতিক দিকটি কেবল কোনো আলঙ্কারিক সাজসজ্জা নয়। কাওয়ালী, দরগাহের বাৎসরিক বর্ষপঞ্জি, লোককবিতা, ওরশ, আর এক ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে বহুদূরে ছড়িয়ে পড়া সংগীত—এগুলোই হলো সেই আসল চালিকাশক্তি। তর্ক করে কাউকে বহুত্ববাদী বানানো যায় না; কিন্তু যারা একই গায়কের গানে একই জনসমুদ্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে, তারা তর্কের চেয়েও বড় কাজটা করে ফেলেছে। ধর্মতত্ত্ব যেখানে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে, সংস্কৃতি সেখানে বাজি মাত করে; কারণ সংস্কৃতি কোনো বিচার বা রায় চায় না, সে শুধু বলে—‘আরেকটু পাশে বস’।

তবে এসবকে খুব রোমান্টিক চোখে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সময়ে সুফি ধারাগুলো রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি গেছে। তারা সব সময় খুব ধোয়া তুলসী পাতা ছিল না; মাজার পরিচালনায় দুর্নীতি আর বৈষম্য ছিল। উপরন্তু, সুফিবাদ এখন দুই দিক থেকে আক্রমণের মুখে: একদিকে কট্টরপন্থিরা একে পথভ্রষ্ট বলে, অন্যদিকে সরকারগুলো চরমপন্থা মোকাবিলার পণ্য হিসেবে নিজেদের পোষা সুফিবাদ বেচার চেষ্টা করে। রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত আধ্যাত্মিকতা আসলে আধ্যাত্মিকতাই নয়। এটা নিয়ন্ত্রণের আরেকটা রাজনৈতিক হাতিয়ার মাত্র, যা বাস্তবে কখনোই সফল হয় না।

তাই আমাদের দাবিটাও হওয়া উচিত পরিমিত। সুফিবাদ কোনো সরকারি রীতি-নীতি নয়। সুফিবাদ সংখ্যালঘুদের অধিকার কায়েম করতে পারবে না, বৈষম্যমূলক আইন পাল্টাবে না, কোনো উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাষ্ট্রকে আটকে রাখতে পারবে না। তার জন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা লাগবেই। তবে সুফিবাদ এমন কিছু করতে পারে যা আইন পারে না। যে অঞ্চলে ধর্মের প্রভাব সবচেয়ে বেশি, সেখানে সব ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে শান্তিতে থাকার পথ দেখিয়ে দিতে পারে সুফিবাদ।

একটা দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ হতে হলে ধর্ম ছেড়ে দেওয়ার দরকার নেই; দরকার সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলার মনমানসিকতা। সুফিবাদের কাজটা মানুষকে তার বিশ্বাস থেকে দূরে সরানো নয়, ধর্মকে সেই আসল শিক্ষাগুলোর সঙ্গে ফিরিয়ে আনা—যা মানুষকে একসঙ্গে থাকতে শেখায়। দয়া, বিনয়, সহাবস্থান, আর সেই পুরোনো সত্যটা—পরম স্রষ্টা আপনার প্রতিবেশী কোন ঘরে প্রার্থনা করছে তা দেখেন না, দেখেন আপনি তার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছেন। মনে রাখতে হবে, যদি হৃদয়ে উদারতা থাকে, তাহলে বিশ্বাস মানুষকে কখনোই আলাদা করতে পারে না।

ফারাবী বিন জহির: সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী। ইমেইল: fbzahir@gmail.com