Published : 05 Jan 2026, 07:55 PM
মুহাম্মদ ইউনূসের ‘তিন শূন্য’ ধারণাটি একটি নতুন বিশ্ব গড়ে তোলার রূপরেখা। এর মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি এই ধারণাটি নিয়ে কাজ করছিলেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন।
কেউ তাকে বাহবা দিয়েছেন, আবার কেউ সমালোচনা করে বলেছেন—এটা কি সম্ভব? দারিদ্র্য থাকবে না, বেকারত্ব থাকবে না, এমন পৃথিবী কেমন হবে? যারা নিয়মিত দান-খয়রাত করেন, তাদের অনেকেই খুশি হতে পারেননি এমন ধারণা শুনে। তারা বলেছেন, “গরিব না থাকলে দান-খয়রাত, জাকাত কাকে দেব?”
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. ইউনূস নিশ্চয়ই অনেক ভালো কাজ করেছেন। সবার আগে বলতে হয়, তিনি একটা স্বস্তি এনেছেন যে, একজন সুশিক্ষিত, প্রাপ্তবয়স্ক, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মেধাসম্পন্ন শিক্ষাবিদ দেশের হাল ধরেছেন। অর্থনীতিতে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন। এত অল্প সময়ে নির্বাচনের আয়োজন করাটাও একটি বিরাট কাজ।
২.
অন্যদিকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, ইউনূস আমলে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কী? সম্ভবত সবাই একযোগে বলে উঠবেন—“মব, মব, মব...”। সত্যিই, মবের বিস্তার, অনেকে বলবেন মবের প্রতি সহনশীলতা বা মব-সংস্কৃতির অনুমোদন—ইউনূস আমলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর এই মবই যদি তাদের একমাত্র উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি) হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।
প্রশ্ন উঠবে, আমরা কেন মবের অনুমোদন বা সহনশীলতার কথা বলছি? উত্তর সহজ। ইউনূস সরকার মব দমনে শুধু ব্যর্থই হয়নি, তারা মবকে শূন্যের কোঠায় আনার কোনো ইচ্ছা বা লক্ষ্যও কখনো প্রকাশ করেনি। বরং নানাভাবে মবের বিস্তারকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কখনো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মব আগেও ছিল, এ আর নতুন কী? কখনো বলা হয়েছে, মব হলো একটি প্রেশার গ্রুপ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মবকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়েছে ফ্যাসিবাদীদের শায়েস্তা করার জন্য। যেন সরকারের একটি বড় উদ্দেশ্য সফল করতে কিছু লোককে মব করার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে মনে হয়েছিল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পরে যখন এটি মহামারীর রূপ নিল, তখন প্রতিকারের বাইরে চলে গেল। আশ্চর্যের বিষয়, গত দেড় বছরে মবের গতিরোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি; বরং মবকারীদের নানাভাবে তোষণ করা হয়েছে।
এই পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ নিয়ে মবকারীরা প্রেসক্লাব থেকে সাংবাদিকদের ধরে থানায় দিয়েছে, একজন কৌতুক অভিনেতাকে মারধর করে থানায় দিয়েছে, এই সেদিন বসুন্ধরায় একজন আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এরপর খবরে জানা গেল নতুন শিকার খোকন চন্দ্র দাশের কথা। শীতের সকালে ঢাকায় এক নারীকে খুঁটিতে বেঁধে পানি ঢেলে নির্যাতন করতে দেখা গেল কয়েকজনকে।
এগুলো অসংখ্য ঘটনার মাত্র কয়েকটি। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় আগুন ধরানো এখন পর্যন্ত মবকারীদের সবচেয়ে বড় কীর্তি। সেদিন সরকারের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি; দেশটা যেন সরকারবিহীন ছিল।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি তার ‘তিন শূন্য’ বাস্তবায়নের কাজে ফিরে যাবেন। প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশে যে মব-সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে, তার নিরাময়ে তিনি ভবিষ্যতে কি অবদান রাখতে পারবেন? তিনি কি তার তিন শূন্যের সঙ্গে ‘মব শূন্য’ যোগ করে চার শূন্য করতে পারেন না?
তবে অনেকেই আশাবাদী হবেন না। তারা বলবেন, যিনি ক্ষমতায় থেকে মব দমনে কিছুই করেননি, তিনি আরেকটি শূন্য যোগ করে কী অবদান রাখবেন? ফলাফল শূন্যই থাকবে।
৩.
তবুও কাউকে না কাউকে এ বিষয়ে চিন্তা করতেই হবে। বাংলাদেশে মবকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার কাজ করতে হবে তো। পরবর্তী সরকারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় উদ্যোগ নিতে হবে, যেখানে অগ্রাধিকার পাবে হটকারী উগ্রবাদীদের চিহ্নিত ও প্রতিহত করা। কিন্তু অনেক চিন্তাবিদ সন্দিহান যে, রাজনৈতিক দলগুলোর এ ব্যাপারে সত্যিই কোনো সদিচ্ছা আছে কি না!
আমার বিশিষ্ট বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান খোন্দকার সিদ্দিক-ই-রব্বানী। তার মতে, হয়তো আমাদের প্রতিটি শহরে গঠন করতে হবে ‘নাটোরের লাঠি বাঁশি সমিতি’র মতো গণপ্রতিরোধ বাহিনী, যাদের তিন শূন্য হবে—শূন্য সন্ত্রাস, শূন্য চাঁদাবাজি এবং শূন্য মব।
‘নাটোরের লাঠি বাঁশি সমিতি’ নিয়ে খন্দকার আতিক-ই রাব্বানী এক লিখেছেন, “নাটোরের লাঠি বাঁশি সমিতি হলো একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ীদের সংগঠন যা মূলত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য পরিচিত, যেখানে লাঠি ও বাঁশি ব্যবহার করে প্রতিবাদ করা হয়। এটি ১৯৯৯ সালে গঠিত হয়েছিল এবং প্রায়শই এই ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে মিছিল ও সমাবেশ করে। সমিতিটি নাটোরকে সন্ত্রাসীমুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং বর্তমানেও বিভিন্ন সময়ে সক্রিয় রয়েছে, বিশেষ করে যখন ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন।”
হয়তো তাই। মব ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দেশের প্রতিটি গ্রামে-শহরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি প্রতিহত করতে হবে। যেখানে সরকার অসহায়, সেখানে জনগণকে শক্ত হতে হবে। সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা দলবদ্ধ হয়ে চাঁদাবাজদের চাঁদা দিতে অস্বীকার করেন এবং তাদের প্রতিহত করেন। জনগণের প্রতিরোধের কাছে চাঁদাবাজরা অসহায় হয়ে পালিয়ে যায়।
তবে জনপ্রতিরোধের মধ্যে শঙ্কাও আছে। এই প্রতিরোধে বিশৃঙ্খলা ছড়াতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ আনুপাতিক না হয়ে ব্যাপক আইনহীনতায় রূপ নিতে পারে। ‘নাটোরের লাঠি বাঁশি সমিতি’র মতো প্রতিরোধ বাহিনী গড়তে হলে তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে হবে; প্রতিরোধ যেন নিজেই মবে পরিণত না হয়।
৪.
শূন্য সন্ত্রাস, শূন্য চাঁদাবাজি এবং শূন্য মব—এগুলো কোনো রাজকীয় দাবি নয়, এগুলো জনগণের মৌলিক অধিকার। জনগণ আশা করবে এই তিন অধিকারের সঙ্গে রাজনীতিকে যেন গুলিয়ে ফেলা না হয়। যে চাঁদাবাজ জোর করে চাঁদা নিতে চায়, সে কেন চাঁদা চায় বা কোন রাজনৈতিক দলের—তা গৌণ। যারা মব করবে, তাদের উদ্দেশ্য যতই সৎ হোক, তাদের কার্যক্রমকে সহিংসতা ও অপরাধমূলক বলে গণ্য করতে হবে। একজন নাগরিকের অন্য নাগরিককে আঘাত করার কোনো অধিকার নেই—একমাত্র ব্যতিক্রম আত্মরক্ষা। এই সাধারণ আইনগুলো যতদিন প্রয়োগ না করা হবে, ততদিন এইদেশে মবের বিস্তার ঘটতেই থাকবে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক