Published : 03 Nov 2025, 09:56 AM
আহমদ ছফা তার 'সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস' (১৯৭২) গ্রন্থে লিখেছিলেন, "বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, তা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না; এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।" তার এই বক্তব্য নিয়ে বহু বাদ-বিবাদ, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। কেননা, প্রায় স্লোগানে পরিণত হওয়া ছফার এই বাক্যবাণ পরিষ্কার করতে পারেনি যে, তিনি গুলিটা কার বুকে চালিয়েছিলেন!
আহমদ ছফা স্বয়ং একজন জনবুদ্ধিজীবী ছিলেন। কেউ কেউ তাকে আন্তনিও গ্রামসির তত্ত্বায়নের ভিত্তিতে 'অর্গানিক ইনটেলেকচুয়াল'ও বলে থাকেন। তাহলে, ছফা সমালোচনা করেছিলেন কাদের? আর তিনি নিজেও কি সেই বুদ্ধিজীবীদের অংশ হয়ে পড়েন?
গ্রামসি যেমন সমাজের বিপুল অংশকে 'প্রথাগত বুদ্ধিজীবী'র তকমা দিয়ে, কাউকে কাউকে 'জৈব বুদ্ধিজীবী'র ভূমিকায় দেখেছেন, ছফাও তেমনই যে বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করেছেন, তাদের একটি পরিচয় বাতলে দিয়েছেন। ১৯৯৭ সালে তিনি যখন এই গ্রন্থের বর্ধিত সংস্করণের ভূমিকা লেখেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, "এই লেখাটির জন্যই আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর রোষ আমাকে পেছন থেকে অভিশাপের মতো তাড়া করেছে।" এখানে এসে ছফার বক্তব্য পরিষ্কার, কারা সেই বুদ্ধিজীবীকুল।
গ্রামসি যে আমলা, একাডেমিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, যাজক, রাজনীতিক শ্রেণিকে 'প্রথাগত বুদ্ধিজীবী' বলেছিলেন, তারা আদতে ছফা কথিত এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত। গ্রামসির মতে, এই বুদ্ধিজীবীরা শ্রেণিস্বার্থে 'স্ট্যাটাস কো' ও বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। ছফা এই ঘরানার বিপরীতেই ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পরে এই সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করেছিলেন। এই বুদ্ধিজীবীরাই আজকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য 'ভারপ্রাপ্ত' হয়েছেন, কিংবা বলা যায়, 'ভার' নিয়েছেন। কিন্তু, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা আজকে শুধু 'ভাবের ঘরে চুরি' করতে নেমেছেন।
এই 'ভাব'টার নাম পরিষ্কার অর্থেই সংস্কার, যদিও 'চুরি'টা আমাদের বিচার-বিশ্লেষণ করেই তুলে আনতে হবে। তবে, তার আগে আহমদ ছফার প্রবাদতুল্য হয়ে ওঠা কথাটা আবারও ঋণ করে বলে নেওয়া ভালো, এই বুদ্ধিজীবীরা "এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।" এ কারণেই, বিতর্ক থাকলেও, সময়ান্তরে, কখনও কখনও ছফার এই বক্তব্য কোনো বিশেষ সময়ের নিক্তিতে পরিমাপ করতে গেলে, তাকে অত্যন্ত সত্যদ্রষ্টা মনে হবে।
আজকের সময়কে এই বক্তব্যের ছাঁচে ফেললে দেখা যায়, এই মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আচরণে পুরোদস্তুর 'অভিজাত মধ্যবিত্ত' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আজকের তারিখে তাদেরকেই 'সুশীল সমাজের প্রতিনিধি' বলা হয়। এই অংশটি মূলত চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ক্ষমতার সুঘ্রাণে এমনই মাতোয়ারা হয়ে গেছেন যে, যা খুশি তাই করার অভিপ্রায়ে পুরো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পাহারাদার ভাবা শুরু করেছেন নিজেদের। তারই সর্বশেষ নজির 'জুলাই জাতীয় সনদ' নামের একটা বিতর্কিত দলিল, যার মাধ্যমে তারা ঐক্য গড়ে তোলার 'ভাব' করে চূড়ান্ত রকম অনৈক্যের জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে। তারা এমন অভিপ্রায় প্রকাশ্যে এনেছেন, যেনবা মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বড় হয়ে গেছে! 'ভাবের ঘরে চুরি' করার বড় উদাহরণ এর চেয়ে আর কী হতে পারে?
এ মুহুর্তে কয়েকটা অপ্রিয় সত্য কথা তাই না বললেই নয়। এই ক্ষমতাবান বুদ্ধিজীবী তথা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে আমাদের কিছু বিনীত প্রশ্ন আছে। প্রশ্নগুলো বহু পক্ষকে বিদ্ধ করবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এগুলো তোলার এটাই প্রকৃত সময়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিক নাকি সুশীল সমাজ অপরিহার্য?
ক্ষমতাবান ও অভিজাত এই বুদ্ধিজীবীরা ঐকমত্য কমিশন ও নির্বাচনের মুলা ঝুলিয়ে জনগণকে অত্যন্ত বোকা সাব্যস্ত করে একটা ধোঁকাবাজির পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের এই ধোঁকাগিরি বন্ধ না হলে, দেশ একটা গভীর খাদে পতিত হয়ে যাবে আবারও, যেটা গণ-অভ্যুত্থানের পরে মোটেই কাম্য ছিল না।
এ কথা সত্য, রাজনীতি নষ্ট হয়েছে রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতায়। কিন্তু, সেটার সমাধান কখনই সুশীল সমাজকে দিয়ে হবে না। যখনই সুশীলরা ফাঁক গলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ঢুকে ছুড়ি-কাঁচি চালিয়েছেন, তখনই ফ্যাসাদ বাঁধিয়েছেন। ২০০৬-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও তার ঐকমত্য কমিশন এই ফ্যাসাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বর্তমান সরকারের ঐকমত্য কমিশন একটা অনৈক্য তৈরির কারিগর। তারা জনগণের টাকায় প্রায় এক বছর ধরে কাল ক্ষেপণ করে তামাশার জন্ম দিয়েছেন তো বটেই, এখন শেষে এসে বাধিয়েছেন ফ্যাসাদ। তারা আসলে কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে নেমেছেন? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের এত ক্ষোভ কেন? সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেওয়া বিএনপির এক মনোনয়ন-প্রত্যাশী নেতা জিয়াউর রহমানকে 'প্রথম রাষ্ট্রপতি' বলেছেন—এটা হলো তার রাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অজ্ঞতার ফল। তিনি রাষ্ট্রই যখন বোঝেন না, তখন আমরা তাকে প্রশ্ন করবই যে, এই জ্ঞান নিয়ে রাজনীতি ও রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেবেন কীভাবে?
তবুও, রাজনীতিবিদদের এসব তামাশা নেওয়া যায়, কেননা এগুলো লোকদেখানোর রাজনীতি বৈ অন্য কিছু নয়। কিন্তু, জনবিচ্ছিন্ন এজেন্ডাধারী সুশীল বুদ্ধিজীবীদের তামাশা নেওয়া খুব মুশকিল। কেননা, রাজনীতিকদের জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার দায় আছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে এবং তাদের রংটা আমরা চিনি। কিন্তু, সুশীল বুদ্ধিজীবীদের বুদ্বুদটা পর্যন্ত বোঝা বড় দায়। ফলে, ব্যর্থ হলেও, বারবার, রাষ্ট্র ক্ষমতায় জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনীতিকদেরই দরকার। বেদনা হলো, রাজনীতিবিদরা ভ্রষ্ট হন বলেই বারবার সুশীলদের ডেকে এনে 'ওয়াচ ডগ' বানানোর আবদার করতে হয়। এরই নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকার। কুয়োর ব্যাঙকে বড় জলাশয়ের স্বাদ দিলে কী হয়, তা তো আমরা জানিই। অন্তত, গত দুই দশকে দুইবার এটা প্রমাণিত হলো।
সংসদ সর্বেসর্বা নাকি ঐকমত্য কমিশন?
ঐকমত্য কমিশনের 'টার্মস অব রেফারেন্সে' (কর্মপরিধি) সংস্কার বাস্তবায়নের উপায় বলা ছিল না। ফলে, প্যাঁচ লেগেছে সংবিধান সংস্কারে হাত দিতে গিয়ে। লাগতই। কনস্টিটিউয়েন্সি পলিটিক্সে অভিজ্ঞ বিএনপির অবস্থান এ বিষয়ে শুরু থেকেই ঠিক ছিল। নির্বাচিত সংসদ ছাড়া সংবিধানে হাত দেওয়া যায় না—এটাই একমাত্র উপায়। বাকিসব অনিবার্য কালক্ষেপণই ছিল। প্রশ্ন আসা সঙ্গত, বিএনপি তবুও পরে আলাপ চালিয়ে গেল কেন?
আমাদের 'বর্বর থেকে সভ্য' বানানোর জন্য নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের 'জুলাই সনদ' স্বাক্ষর হয়েছে ১৭ অক্টোবর। এতে শেষতক ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব আসে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাব। এগুলোর ভিত্তিতে গণভোটের আলাপ নিয়ে এসেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। অথচ, জনগণের একটি বৃহত্তর অংশকে এ সংস্কারগুলোর বোঝাপড়া করার ক্ষেত্রে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে। কেন? কার স্বার্থে?
সনদ স্বাক্ষরের দুই সপ্তাহ পর এসে ঐকমত্য কমিশন বলেছে, প্রস্তাবিত জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কারের ধারাগুলো পরবর্তী সংসদের ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে বাস্তবায়ন না-করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগুলো সংবিধানের তফশিলের অন্তর্ভুক্ত হবে।
প্রথমত, কেন ও কোন যুক্তিতে? সংবিধান কি এতই হেলাফেলার বিষয় যে, ঐকমত্য কমিশনের বয়ানই সর্বেসর্বা হয়ে উঠবে? সংসদ নিজে ঐকমত্যে না আসতে পারলেও, বিল পাস করতে না পারলেও, সংবিধানে হাত দেওয়া জায়েজ হয়ে যাবে? এত বড় অসাংবিধানিক কথা চাপিয়ে দেওয়া হবে সংবিধানের ওপর? দ্বিতীয়ত, কেন ২৭০ দিন? কম বা বেশি নয় কেন? হিসাবটা কীসের ভিত্তিতে? ব্যাখ্যা কী? তৃতীয়ত, সংসদ যা পারে, তার জন্য আলাদা করে 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' গঠন করতে হবে কেন? কোন যুক্তিতে? তাও আবার যা নিয়ে পূর্বে কখনই আলাপ হয়নি?
গায়ের জোরে কলমের খোঁচায় সংসদকে বাধ্য করতে যা-না-তা লিখে দিলেই হবে? ঐকমত্য কমিশন কঞ্চি হলে, সংসদ হলো বাঁশ। বাঁশের চেয়ে কঞ্চি লম্বা হলো কবে?
গণভোট নিয়েও প্রশ্ন, প্রশ্ন নিয়েও প্রশ্ন!
এবার আসা যাক, গণভোটের আলাপে। সংবিধান সংশোধন না করে, সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত না করেই 'গণভোট' বা 'রেফারেন্ডাম' করা যাবে? নির্বাহী আদেশেই সব করার আগ্রহ কেন সরকারের? তবুও, ধরা যাক, গায়ের জোরে ও নানা কথার মারপ্যাঁচে না হয় গেল, কিন্তু জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের সময় নিয়ে টালবাহানা কেন? কেন একদিনে হতে হবে? কেন দুই সময়ে হতে হবে? একদিনে হওয়ার যুক্তি দেওয়া হয়েছে—সময় ও অর্থের অপচয় রোধ। দুই সময়ে করার যুক্তি কী?
অনেক ভেবে, ব্যক্তিগতভাবে, আমি দুই সময়ের পক্ষে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রাজনীতি করি না বলে, আমার কারণটা বলার দায় নেই। তবে, অনুমান করি, দুই সময়ে হলে, ভোটার টার্ন আউট কম হবে এবং 'হ্যাঁ'-এর বিপক্ষে রায় যাবে। কেননা, যে প্রশ্ন ধার্য করা হয়েছে, তা অতি জটিলতার দোষে দুষ্টু। এই প্রশ্নটি ও এর কার্যকরণ বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যেই যেখানে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, সেখানে স্বল্প-শিক্ষিত এত বিশাল জনগোষ্ঠী কী করে এই প্রশ্নটি মোকাবিলা করবেন?
সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, সংস্কারের অসংখ্য বিবৃতি বা বর্ণনামূলক ধারাকে কেন একটি মাত্র 'নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নে'র ফাঁদে ফেলা হবে? জনগণের আর কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে না? সেই সুযোগ সীমাবদ্ধ করা হবে কেন? কমিশন কি জানে না যে, সেই সীমাবদ্ধতা রোধের একমাত্র উপায় হলো, দ্রুততম সময়ে জাতীয় সংসদকে জাতির কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া, যা কি না গণভোটের চেয়েও অধিকতর শক্তিশালী?
গণভোটের ফল নির্ধারণ প্রসঙ্গে
যদি, গণভোট স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয়, আর টার্ন আউট মোট তালিকাভুক্ত ভোটারের ৫১ ভাগের কম হয়, তাহলে কি 'হ্যাঁ' জিতবে? নাকি 'না' জিতবে? এই বিধান কীভাবে ঠিক হবে?
'তালিকাভুক্ত ভোটারে'র আলাপ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টিং ভোটার আর লিস্টেড ভোটার দুই বিষয়। আমরা কথা বলছি, লিস্টেড বা তালিকাভুক্ত ভোটার নিয়ে। সেই সূত্রেই প্রশ্ন, ন্যূনতম ৫১ ভাগ তালিকাভুক্ত ভোটার 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে না-দাঁড়ালে সংবিধান সংস্কার করা যাবে? ধরা যাক, ৪৯ ভাগ ভোটার টার্ন আউট হয়েছে এবং 'হ্যাঁ' পুরো ৪৯ ভাগ ভোট পেয়েই জিতেছে। তবুও, গণভোটে অংশগ্রহণ না করা ৫১ ভাগ মানুষের কণ্ঠস্বর তো জায়গা পেল না। পরিবর্তনের স্বার্থে ও চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য যাদের চাওয়া তালিকাভুক্ত ভোটারের অন্তত ৫১ ভাগ 'হ্যাঁ' ভোট দিক, তাদের চাওয়া কি অমূলক?
একটা সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোটার টার্ন আউট এক বিষয়। আর রাষ্ট্রের সংবিধানের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ দলিল সংস্কারের জন্য গণভোটের টার্ন আউট আরেক বিষয়। ভিন্ন এজেন্ডা বহনকারী দুই ধরনের ভোটকে গৎবাঁধা 'কাস্টিং ভোটই আসল ভোট' নামক নিক্তিতে এক করার সুযোগ আছে?
গণভোটে 'হ্যাঁ' জিতে গেলে তো কথাই নেই। কিন্তু, যদি হেরে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার ঝুলে যাবে কি? তখন, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সংসদের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর উপায় আছে? 'হ্যাঁ' হেরে গেলে, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যাদেরই থাকুক, তারা সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব আনতে কি বাধ্য? বিশেষত, যেখানে ৪৮টির মধ্যে ৩৬টিতেই অন্তত একটি করে 'নোট অব ডিসেন্ট' আছে?
যদি 'না' জয়যুক্ত হয়, তাহলে গণভোটের এই আয়োজনের কারণে সংসদও বাধ্যবাধকতার বাইরে চলে যায়। ফলে, উচিত হলো সংসদের সর্বময় ক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে জুলাই সনদের খসড়া প্রস্তাবের শুধু এবং শুধু ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলোকে বিলে উপস্থাপন করে সংসদের দ্বারা সিদ্ধ করিয়ে আনা। সেক্ষেত্রে গণভোটের জটিলতায় যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। তবুও কেন যাওয়া হচ্ছে?
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব
আমরা নিজের নাক কেটে হলেও, অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে ভালোবাসি। ফলে, গণভোট প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ক্ষমতাসীনরা এড়িয়ে চলেছেন। সেটি হলো, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রসঙ্গটি। তালিকাভুক্ত ভোটারের সংখ্যায় অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ (মতান্তর থাকতে পারে) আওয়ামী লীগ সমর্থক। এই সমর্থকদের প্রতি সর্বশেষ নির্দেশনা হলো, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোনো প্রকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা। কিন্তু সর্বশেষ নির্দেশনা যদি নাও আসত, তাহলেও ধরা যায়, লীগের সমর্থকরা 'না' ভোটই দেবে। কিন্তু, এই সংখ্যাটা তো গুরুত্বপূর্ণ। এদের অংশগ্রহণ ছাড়া 'গণভোটে'র জনভিত্তি দাঁড়াবে তো?
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ অবস্থা থেকে সিদ্ধ অবস্থায় আসার গ্রহণযোগ্য সুযোগ হয়তো আপাতত আসবে না। প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড না থাকার পরও, আওয়ামী লীগ দলটির কারণে সরকার ও নানান মহল দ্বিবিধ সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। শুধু প্রচার-প্রকাশ নিয়েই নানা দশা যখন বিদ্যমান, তখন নির্বাচনে এত বড় ভোটার সংখ্যার অনুপস্থিতি নির্বাচনকে কতটা গ্রহণযোগ্য করে তুলবে, সেটা ভাবার বিষয়।
আওয়ামী লীগ টানা তিনটি এক তরফা ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার পরিণতি ভোগ করেছে। সেসব নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করেনি, করলেও প্রতারিত হয়েছে। যেমন ২০১৮ সালের নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি সেই দশায় পড়েছিল। আর নির্বাচনও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আওয়ামী লীগকে এভাবে নির্বাহী আদেশে বাইরে রাখলে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য হবে?
বিএনপির নীতি ও গণতান্ত্রিক বিচ্যুতি
আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী আচরণ এর আগের তিনটি নির্বাচনে রীতিমতো ব্রাত্য করে রেখেছিল আজকের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপিকে। অথচ, সেই বিএনপিরই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রাথমিক অবস্থান ছিল কোনো দলকে নিষিদ্ধ না করার ব্যাপারে। কিন্তু, সত্য এই যে, বিএনপি কোনো কিছুতেই তাদের প্রাথমিক পর্যায়ের যৌক্তিক অবস্থান বজায় রাখতে পারেনি গত ১৪ মাসে। প্রতিপক্ষ প্রশ্নেও পারেনি, সংবিধান ও সংস্কার প্রশ্নেও পারেনি। গণভোট প্রশ্নেও পারল না।
নইলে, এত বড় ও অভিজ্ঞ একটি কনস্টিটিউয়েন্সি রাজনৈতিক শক্তি সংবিধান সংস্কার না করেই 'গণভোটে'র পক্ষে সায় দিল কী করে! বারবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দাবি করা এবং নির্বাচিত নতুন সংসদে সবকিছু আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান করার পক্ষে কথা বলা দলটি সুশীল সমাজের একটি ছোট্ট গোষ্ঠীর কাছে নাকানিচুবানি খেল কী করে!
বিএনপির নীতি নির্ধারকরা কি আহমদ ছফার কথাটি ভুলে গেছেন? এই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করা মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা আজ যা বলছেন বা করছেন, তা মেনে নিলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামো বদলাবে তো না-ই, উল্টো মুক্তিযুদ্ধের পথ না ধরে, বিপরীত পথে চলে যাবে। বস্তুত, এই সরকার ও তার ঐকমত্য কমিশন সমাজ-কাঠামো বদলাতেই চায়নি কখনও, বরং তারা দমিয়ে ফেলতে চেয়েছে মহীরুহ মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত স্পিরিটকেই!