Published : 21 Sep 2025, 05:56 PM
রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে যে সিদ্ধান্তকে আমরা ‘সমাধান’ মনে করছি সেই সিদ্ধান্তটি গ্রহণে তাড়াহুড়ার ছাপ রয়েছে। এটাই আমাদের দেশের সাধারণ প্রবণতা। কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা তড়িঘড়ি একটি উদ্যোগ গ্রহণ করি। এ ধরনের উদ্যোগে দৃশ্যমান সমস্যাটির সাময়িক উপশম হলেও বিদ্যমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনিরাময়যোগ্য করে তোলে।
দুঃখজনকভাবে বিষয়টিকে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী ও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ত্রিমুখি দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখানো হচ্ছে। একটি সুস্থ পরিবেশে শিক্ষার উন্নয়নে এই তিনটি পক্ষ একযোগে কাজ করার কথা। কী কারণে তারা মুখোমুখি সেটি গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করা দরকার। শিক্ষার্থীদের দাবিকে উপলক্ষ করে অন্য কোনো পক্ষ স্বার্থ উদ্ধারে ক্রিয়াশীল কি না–সেটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। সুন্দর একটি সমাধান চাইলে আমাদের অ্যাডহক ব্যবস্থা এবং অনাবশ্যক দ্রুততার পথ থেকে সরে আসতে হবে।
রাজধানীর বুকে সাতটি সরকারি কলেজের প্রতিটিরই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা সুধী সমাজ ঢাকা কলেজ বা তিতুমীর কলেজকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে তার প্রত্যাশা বা হতাশা আবর্তিত হয়। কিন্তু যে বিষয়টি তারা দেখেন না, তা হল এই প্রতিষ্ঠানগুলো একটি অখণ্ড রাষ্ট্রীয় সার্ভিসের অংশ। ভূমি বা দালানকোঠার মধ্যে এর প্রাণ খুঁজলে ভুল হবে। সাত কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা যদি তাদের শিক্ষকদের বৈরি বা অযোগ্য মনে করেন তা হলে এর দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, কলেজ কর্তৃপক্ষ কাউকে নিয়োগ বা পদায়ন দেয় না। নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব পিএসসি তথা রাষ্ট্রের।
বাংলাদেশে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় শিক্ষা খাত ব্রিটিশ ভারতের এডুকেশন সার্ভিসের উত্তরাধিকার। রাষ্ট্রের অধীন সমগ্র শিক্ষা খাত ডাইরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের কার্যালয় (আধুনা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতো। এই পেশায় শিক্ষকতা ও শিক্ষা প্রশাসনকে বিভক্ত করা হয়নি। এডুকেশন সার্ভিসের কর্মকর্তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাষক, অধ্যক্ষ কিংবা হেডমাস্টার পদবির সমান্তরালে বিদ্যালয় পরিদর্শক, উপ-পরিচালক, পরিচালক ইত্যাদি পদে দায়িত্ব পালন করতেন। পাকিস্তান শাসনের পুরো সময় এবং বাংলাদেশ পর্বেও এই ধারা অব্যাহত থাকে। কেন্দ্রীভূত সরকারব্যবস্থা হওয়ায় স্বাধীন বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিস একীভূত হয়েছে যেমনটা অন্য সকল সার্ভিসের ক্ষেত্রে ঘটেছে। স্বাধীন রাষ্ট্রে শিক্ষা খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মপরিধি হতে প্রাথমিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে পৃথক করা হয়েছে। শ্রেণিগত বিভাজনের পাশাপাশি আরেকটা কাজ করা হয়েছে। তা হলো শিক্ষকতা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করার বিরতিহীন প্রক্রিয়া। এর ফলে শিক্ষার অখণ্ড চরিত্রটি ক্ষুণ্ন হয়েছে। সেবাদানে জটিলতা বেড়েছে। নীতি নির্ধারণে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে শ্রেণিকক্ষ শিক্ষকগণ ক্রমাগত প্রান্তিক হয়েছেন। এসব পৃথকীকরণের সময় সার্ভিসের সদস্যদের মতামতকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। দুর্ভাগ্য হল, যুগের পর যুগ বঞ্চনার শিকার হয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের নিকটবর্তী সেবাদাতা শিক্ষককেই শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেছে। সমস্যা সমাধানে যাদের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে তারা যদি শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভকে ব্যবহার করে সংকীর্ণ কোনো স্বার্থকে প্রাধান্য দেন–সেটা হবে গভীর হতাশার।
গত বছরের জুলাইয়ের পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। কিন্তু নানা কারণে শিক্ষার্থীদের এই উত্থানকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষাঙ্গনের বিশৃঙ্খলা তার অন্যতম কারণ। অভ্যুত্থানের প্রতি আনুগত্য নির্ণয়ের দায়িত্বটা শিক্ষার্থীরা নিজেরা নিয়ে ফেলে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল সেই নৈরাজ্যকে আসকারা দিয়েছেন। যার ফলে শিক্ষকরা আড়ষ্ট ও ভীত হয়েছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্তি এসেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রকৃত জনমত নির্ণয় কঠিন ছিল। গতবছর ২৪ অক্টোবর “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি কলেজের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সমস্যা নিরসনকল্পে” সরকার একটি বহুপক্ষীয় কমিটি গঠন করে। এই কমিটি সুপারিশ বা প্রতিবেদন দেওয়ার আগে ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর “সরকারি তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নিমিত্তে” আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে বিসিএস শিক্ষকদের কাউকে রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। সেই সঙ্গে নতুন নতুন কমিটি গঠন এবং ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতে থাকে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউজিসি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রূপরেখা প্রণয়ন”। এই কমিটির কার্যপরিধিতে যে পাঁচটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল সেগুলো নিয়ে কাজ করতে সময় লাগার কথা। অথচ অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল করে। ২৭ জানুয়ারি সাত কলেজের শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বাতিল ঘোষিত হয়। অন্তর্বর্তী প্রশাসন চালানোর জন্য একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ভাঙা-গড়ার প্রতিটি পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কর্তৃত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের এই জায়গাটা আলোচনা হওয়া দরকার।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের পূর্বে কলেজগুলোর স্নাতক কোর্স পুরোনো চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অধিভুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হত। ওই সময়ে অনার্স কলেজ এবং সেগুলোর আসন সংখ্যা ছিল অনুল্লেখযোগ্য। ২০০৯ সাল থেকে জাতীয় সংসদে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সমাধান হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত আসে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন প্রণীত হয়। বাস্তবায়নে গিয়ে দেখা যায় ৩৪ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মিলিত দুই লাখ ৬৪ হাজার শিক্ষার্থীকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ লাখ শিক্ষার্থীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রস্তুত নয়। কিন্তু ইউজিসি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণ এই অবাস্তব বণ্টনে অতি আগ্রহ দেখাতে থাকে। ড. মো. মহব্বত খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি স্টাডির নামে কিছু দায়সারা আলোচনাসভা করে। ইউজিসি সেটাকেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন হিসেবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। কোনোরকম অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা ছাড়া ২০১৭ এর ডিসেম্বরে রাজধানীর সাতটি কলেজের দেড় লাখ শিক্ষার্থীকে ছিনিয়ে নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদ্বয়ের দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে চলমান শিক্ষার্থীদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। পরীক্ষার রুটিন দাবি করতে গিয়ে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান তার দৃষ্টি হারান।
উন্নত শিক্ষাজীবন এবং সনদের অধিকতর সামাজিক স্বীকৃতির আশায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির পর তারা বৈষম্যের শিকার হয়। শিক্ষার্থীদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে উদাসীনতা এবং অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যও করা হয়েছে। বস্তুত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারা অনুসরণ করে কলেজগুলোকে রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আজ আট বছর পর নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই বিপর্যয়ের দায় নির্ধারণ জরুরি। সে ক্ষেত্রে ইউজিসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান থাকার কথা কাঠগড়ায়। কিন্তু সুকৌশলে তারা সাত কলেজের শিক্ষকদের ওপর দায় চাপিয়ে নতুন এক্সপেরিমেন্ট ফর্মুলা নিয়ে হাজির হয়েছেন। দায়িত্ববিহীন কর্তৃত্ব প্রয়োগের এই পৌনপুনিক মঞ্চায়ন এখনই বন্ধ হওয়া দরকার। আভিযোগ আসছে, সংস্কারের নামে সাতটি ঐতিহ্যবাহী কলেজের ভূসম্পত্তি গ্রাস করা এবং কলেজ শিক্ষার বিলোপ ঘটিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি পক্ষ তৎপর। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।
পত্রিকা মারফত কথিত তুঘলুকি সংস্কারের রূপরেখা আমরা অবহিত হয়েছি। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এবং শিক্ষকদের মানের প্রশ্নটি বার বার সামনে আনা হচ্ছে। দায়িত্বের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির কর্তৃত্ব করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। যত্রতত্র অনার্স খোলা এবং অযৌক্তিকভাবে আসনসংখ্যা বৃদ্ধি একদিনে ঘটেনি। শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের সকল রেগুলেটরি ক্ষমতা তাদের হাতেই ছিল। এখন ছাত্র বিক্ষোভের সুযোগে অধিভুক্তির মত স্বীকৃত একটি ব্যবস্থাকে তুবড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার কারণ কী?
এই অঞ্চলের শিক্ষার ইতিহাস সম্পর্কে যারা পড়াশুনা করেছেন তারা জানেন, বিখ্যাত উডস ডিসপ্যাচের সুপারিশ অনুযায়ী কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল পরীক্ষা গ্রহণকারী লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেলে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে অধিভুক্ত কলেজগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্কের বিষয় পরিষ্কারভাবে বিবৃত ছিল। এর পরে ১৯৩১ সালে বেঙ্গল এডুকেশন কোড প্রণীত হলে অধিভুক্ত কলেজের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং একাডেমিক সুপারভিশনে কার কোনটি অধিক্ষেত্র সেটা আরও প্রাঞ্জলভাবে নথিভুক্ত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ভিন্ন মডেলে বিকশিত হয়েছে। সেই কারণে অধিভুক্ত কলেজগুলো পরিচালনার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারনা সামনে আসে। স্বাধীনতার পর গঠিত ছয়টি শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে নানা বিষয়ে পরস্পরবিরোধী মত থাকলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নে অভিন্ন সুপারিশ রয়েছে। জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনে গঠিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তেমনটা অতীতে কোনো প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের অর্থে প্রতিষ্ঠানটি চলে। তিপান্নটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলে ইউজিসির অনুদানে। বিগত ৩৩ বছরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক টাকাও নেয়নি। উপরন্তু ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে এক হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দেওয়া হয়। এই স্থানান্তর নৈতিক ও আইনগত দিক দিয়ে কতটুকু ঠিক হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২) বলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় দুই লাখ ১৮ হাজার ৫৫৮ টাকা। পক্ষান্তরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয় ৭০২ টাকা। প্রকৃতপক্ষে এটি ঋণাত্মক অংক হবে কেননা প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রতি বছরে অন্তত আট হাজার টাকা রাজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলে দিয়ে থাকে। সরকারি কলেজগুলো পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে সে বিষয়ে ইউজিসি কখনই শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে শিক্ষার মানোন্নয়নে আর্থিক বরাদ্দ চাওয়ারও প্রয়োজনবোধ করেনি। এখন হঠাৎ করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য সরকারি কলেজগুলোকে কেন অধিগ্রহণ করতে হবে? নতুন করেই যদি সব গঠন করতে হবে তা হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ২২৫৭ টি কলেজের শিক্ষার্থীরা কী অপরাধ করল? তাদের কি উন্নত সেবা পাওয়ার অধিকার নেই?
বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী বনাম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা এমন সমীকরণ তৈরির আগে আমাদের মৌলিক এই প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে হবে? অতীতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিগত আট বছরে ঢাকার সাতটি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলে হাজার কোটির বেশি অর্থ তুলে দিয়েছে। এই অর্থের কতটুকু শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় হয়েছে? তেপান্নটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় অনুদান পেলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পরেও এই সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা কেন আগের মতই অধিকারবঞ্চিত থাকল? এখন সকল অবহেলার দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বদলিভিত্তিক কর্মরত বিসিএস শিক্ষকদের ওপর। এটা অন্যায়। ইউজিসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্রের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য তাকে কাজ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বার্থ কিংবা ইগো দ্বারা একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হোক–এমনটা প্রত্যাশিত নয়। আমরা চাই, ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার ভুল পদক্ষেপ থেকে ইউজিসি সরে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠরত সকল শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইলে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে। রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের বিলোপসাধন দায়িত্বশীল কাজ নয়।