Published : 15 May 2026, 09:34 PM
কানাডা প্রবাসী চীনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জুয়েকিন জিয়াঙ ২০২৪ সালে তিনটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যা ইরান হামলার সময় অনলাইনে ভাইরাল হয়েছিল। ভবিষ্যদ্বাণী তিনটি ছিল: ১. ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসবেন, ২. ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাবেন এবং ৩. ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হারবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে জিয়াঙ ‘চীনা নস্ট্রাডামুস’ বলে বর্তমান বিশ্বে খ্যাতি লাভ করেছেন। এই খ্যাতির কারণ, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরান আক্রমণ করতেই তার প্রথম দুটি ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে। বাকি ছিল কেবল তৃতীয়টি, যা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সেই তৃতীয়টিও অবশেষে সত্য প্রমাণিত হতে চলেছে। জিয়াঙ অবশ্য জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসরণ করে বা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান হিসাব করে এ ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। তিনি অতীতের ইতিহাস পাঠ ও বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে এ তিনটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
দুটি ভবিষ্যদ্বাণীর সত্য হওয়া নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। তবে তৃতীয়টি, অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে আমেরিকা পরাজিত হয়েছে—এ নিয়ে দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক। ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার সঙ্গীরা তো তাদের বিজয়ের কথা বলে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু হাতে গোনা এই কয়েকজন বাদে এখন প্রায় সবাই একমত যে, আমেরিকা মোটামুটি পরাজিত। কেবল তাই নয়, এই হামলার ফলাফলের মধ্যে আরও একটা দিক স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো আমেরিকান সাম্রাজ্যের পতনের সুর। আমেরিকান সাম্রাজ্যের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে মধ্যপ্রাচ্যে আক্রমণের শুরু থেকেই; এবার তা ধসে পড়া শুরু। কীভাবে, দেখা যাক। ইরানকে পাথরযুগে ফেরত পাঠাবার ক্ষমতাসম্পন্ন এক ক্ষমতাগর্বী রাষ্ট্র নিজের পতন দেখতে পাচ্ছে সরাসরি চোখের সামনে—আমেরিকানদের ভাষায় ‘ইন রিয়েল টাইম’।
সবাই স্বীকার করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরান হামলা তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে জংলি কায়দায় শোবার ঘর থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর ডনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটি কুক্ষিগত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ভেস্তে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ও পৃথিবীতে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে—এমন ধারণা এখন ভিত্তি হারিয়েছে। পূর্বের আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে দেশ দুটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন দেশ দুটিকে দখল করে রাখার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে সে বিশ্বকে সন্ত্রস্ত করে রেখেছিল। বিশ্বে একক শক্তির অহমিকা এবার বড় রকমের হোঁচট খেয়েছে ইরানের হাতে। সম্প্রতি রবার্ট কেগান এ পরিস্থিতিই তুলে ধরেছেন তার ‘চেকমেট ইন ইরান’ লেখাটিতে। কেগান কে? যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজদের একজন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নয়ারক্ষণশীল বুদ্ধিজীবী ও ইরাক আক্রমণের অন্যতম সমর্থক।
সম্প্রতি ১০ মে ‘দ্য আটলান্টিক’-এ সেই কেগানই আক্ষেপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হেরে যাওয়া ও তার দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া নিয়ে। কেগানের লেখাটি শুরু হয়েছে এভাবে: “এমন একটা সময়ের কথা ভাবা কঠিন যখন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি পরাজয় বরণ করেছিল; এমন এক ধরনের স্পষ্ট পশ্চাদপসরণ যখন কৌশলগত ক্ষতি না হজম করা যায়, না গেলা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে পার্ল হারবারে, ফিলিপাইনে ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সংঘটিত বিপর্যয়পূর্ণ ক্ষতি শেষ পর্যন্ত পুষিয়ে নেয়া গিয়েছিল। ভিয়েতনামে ও আফগানিস্তানে পরাজয়ের মূল্য বিরাট হলেও তা বিশ্বে আমেরিকার সামগ্রিক অবস্থানে কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিসাধন করতে পারেনি, কারণ এগুলো ছিল বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মূল মঞ্চ থেকে দূরে। ইরাকে প্রাথমিক ব্যর্থতা কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রশমন করা গেছে, যা পরিণামে ইরাককে করেছে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও প্রতিবেশীদের জন্য হুমকিহীন এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেছে।”
তার লেখার অনেক কিছুই প্রশ্নসাপেক্ষ। উদাহরণস্বরূপ, এখানে ইরাকে হামলার বিষয়টি। তার মতো একজন যুদ্ধবাজের পক্ষেই এ কথা বলা সম্ভব যে, ইরাকে প্রাথমিক ব্যর্থতা হলেও পরে তা সফল হয়েছে—যে হামলা হয়েছেই সাদ্দাম হোসেনের হাতে পারমাণবিক বোমা ও জীবাণু অস্ত্র থাকার মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে। ইরাকের বর্তমান স্থিতিশীলতা নিয়ে তার মন্তব্যও অনবদ্য মিথ্যাচার। যাই হোক, তিনি লিখে চলেছেন: “ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘর্ষে পরাজয় প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন। এ ক্ষতি না পূরণ করা সম্ভব হবে, না অবহেলা করা। পরিস্থিতি আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না; এমন কোনো চূড়ান্ত মার্কিন বিজয় ঘটবে না যা এ ক্ষতিকে পুষিয়ে দিতে পারবে। হরমুজ প্রণালী আর আগের মতো খুলবে না। হরমুজের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ইরান এ অঞ্চলে মূল খেলোয়াড় ও বিশ্বে বড় খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরানের মিত্র হিসেবে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা শক্তিশালী হয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। যুদ্ধের সমর্থকরা যাই দাবি করুক, এই সংঘর্ষে এমন এক আমেরিকা উপস্থাপিত হয়েছে যে অনির্ভরযোগ্য এবং সে যা শুরু করে তা শেষ করার ক্ষমতা রাখে না। এটি বিশ্বে এমন এক ঘটনাচক্র শুরু করবে যে, কী-বন্ধু কী-শত্রু উভয়ই এখন থেকে মার্কিন ব্যর্থতাকে আমলে নিয়ে চলবে।”
কেগান এরপর লিখেছেন, “এটা যদি কিস্তিমাৎ না হয়, তবে তার কাছাকাছি। সাম্প্রতিক কালে ট্রাম্প বারবার গোয়েন্দাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, তিনি নিজেই বিজয় ঘোষণা করে খেলা ছেড়ে দিয়ে চলে আসলে ফলাফল কী হতে পারে তা হিসাব করে দেখতে। বেচারাকে দোষ দেওয়া যায় না।”
বেচারা! তাকে কেউ দোষ দিচ্ছে না। কেননা ইরান হামলায় পরিকল্পিতভাবে একটি বিদ্যালয়ের দুই শ নিষ্পাপ শিশুকে হত্যার যে দায়, তা নিছক দোষ দেওয়ার বিষয় নয়। এই রকমের যুদ্ধাপরাধের ফলে তার স্থান হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায়। ‘জ্যাকোবিন’ সাময়িকীতে ২ মে “ডনাল্ড ট্রাম্প’স বোর্ড অব পিস ইজ এ বোর্ড অব নেকিড পাওয়ার” শীর্ষক লেখায় উইলয়াম হার্টুঙ তাই লিখেছেন, “গাজায় গণহত্যা চালানোর জন্য বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতায়িত করায় ও ইরানের বিরুদ্ধে তার অবৈধ যুদ্ধে একটি পুরো সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকির কারণে ডনাল্ড ট্রাম্পের স্থান যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য হেগের কাঠগড়ায় হওয়া উচিত।”
বর্তমানের পৃথিবী যেখানে আমেরিকা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, সেখানে তা ঘটবে না নিঃসন্দেহে। কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়াটাও ফেলনা নয়। রবার্ট কেগান অবশ্য ভেবেছেন যে, ‘বেচারা’ বললেই ট্রাম্পের সব দোষ মিটে যায়। তবে কেগানের এত সাম্রাজ্যপ্রীতির পরও যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের সত্য উন্মোচিত হয়েছে তার লেখাটিতে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের এই সমর্থক স্বীকার করেছেন, “এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এখন কাগুজে বাঘ হিসেবে প্রমাণিত হবে, যা উপসাগরীয় ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে ঠেলে দেবে ইরানের শক্তিকে মেনে নিতে।” তিনি আরও স্বীকার করেছেন যে, “উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় বৈশ্বিক ক্ষেত্রে বৃহত্তর প্রভাব ফেলবে।”
কী সেই প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া? তার লেখার শেষ দুই লাইনে তা প্রকাশিত: “আমেরিকা-উত্তর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার একসময়কার আধিপত্যের সমাপ্তি থেকেই এখন আগামী বিপর্যয়ের শুরু।”
যার গুণ আছে, তার দোষ থাকাই স্বাভাবিক। আমেরিকার যেমন অনেক গুণ, তার দোষও অজস্র। তবে তার সাম্রাজ্যের অপরাধের পাল্লা গত আশি বছরে এত ভারী হয়েছে এবং এখন ট্রাম্পের নেতৃত্বে তা এত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে যে, হয়তো এই পরিণতির আর কোনো বিকল্প নেই। এখন এই পরিণতির সম্ভাবনার কথা কেবল তার শত্রুরাই বলছেন না, বলছেন তার খোদ মিত্ররা। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান ২০ জানুয়ারি ২০২৫, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার অভিষেকের দিনটিকে আমেরিকার এই সাম্প্রতিক অধঃপতনের দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।