Published : 20 Dec 2025, 10:03 PM
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল বাঙালি জাতিরই গৌরবগাথা নয়, এটি বিশ্ববিবেক জাগরণেরও এক মহাকাব্য। এই সংগ্রামে যারা অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ছিলেন না, কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে বিশ্বমহাসভায় সোচ্চার ছিলেন, মানবতার তাগিদে নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই সব বিদেশিদের নামও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আখ্যানে। বাংলাদেশ সরকার ২০১১-১৩ ও ২০২৩ সালে বিদেশি বন্ধুদের ৩ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা প্রদান করে তাদের এই অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে: ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’ (১জন), ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ (১৫জন) এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ (৩৩২জন ও ১০টি সংগঠন)।
১৯৭১ সালের রক্তরাঙা স্মৃতি–বাতাসে বারুদের গন্ধ, নদীতে ভাসমান নিথর দেহ, আর মানুষের চোখে—অনিশ্চয়তার শীতল অন্ধকার। বাংলার মাটি তখন আর শুধু মাটি ছিল না–সে ছিল লাশের ভারে নুয়ে পড়া এক ক্লান্ত জননী। ঠিক সেই সময়, জাপানের কোনো শহরে বা গ্রামে—কেউ একজন রেডিওতে শুনছিল বাংলার খবর। কেউ পত্রিকার ফাঁকে পড়ছিল ‘গণহত্যা’, ‘শরণার্থী’, ‘নিরস্ত্র মানুষ’, ‘নির্যাতিত নারী’। কেউ হয়তো প্রথম দিন বিশ্বাস করেনি। কিন্তু দ্বিতীয় দিন চোখ নামিয়ে বলতে শেখে—'ওরা তো আমাদের মতোই মানুষ।‘ এইভাবেই জন্ম নেয় এক অচেনা বন্ধুত্ব— যেখানে ভাষা আলাদা, মানচিত্র আলাদা, কিন্তু কান্নার শব্দ এক। জাপানের কয়েকজন সাহসী নাগরিক তাদের নীতি, প্রত্যয় ও মানবিকতাবোধ দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। তন্মধ্যে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ (Friends of Liberation War Honor) প্রাপ্ত ১২জন জাপানিজের অনন্য ভূমিকা এই রচনার বিষয়বস্তু।

১. সুয়োশি নারা (Tsuyoshi Nara), অধ্যাপক এমেরিটাস, টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ ফরেন স্টাডিজ (মরণোত্তর)
টোকিওর এক কোণে একটি ঘর। সাধারণ একটি ঘর—কিন্তু ১৯৭১ সালে সেটিই হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের অঘোষিত দূতাবাস। এই ঘরের মালিক সুয়োশি নারা। তার বাড়িতেই গড়ে ওঠে ‘নিপ্পন বেঙ্গারু তোমো নো কাই’ (Japan Bengal (Bangladesh) Friendship Association (JBFA)/জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সংস্থা)। তিনি ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছিলেন ও ১৯৬৮-৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি প্রথম ৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে কয়েকজন জাপানি ও বাঙালি ছাত্রকে নিয়ে টোকিওর ‘এশিয়া বুনকান কাইকানে’ মিলিত হন এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। ১১ এপ্রিল একই স্থানে তিনি, বেশিসংখ্যক জাপানি এবং বাঙালি ছাত্র একত্র করে জেবিএফএ গঠন করেন; তাকে এর সভাপতি করা হয় ও তার বাসাতেই অফিস স্থাপন করা হয়। এই সংগঠনই পরবর্তীকালে জাপানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধপন্থী জনমত গঠন, ত্রাণ সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার এক শক্তিশালী ভিত্তিতে রূপ নেয়। ২২ এপ্রিল তার বাসায় জেবিএফ-এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধে কীভাবে সাহায্য করা যায় তার একটা প্ল্যান অব অ্যাকশন প্রণয়ন করা হয়। জাপানিদের কাছ থেকে অর্থ ও ত্রাণ সাহায্য চাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রচারপত্র তৈরি করা হয়। এক পর্যায়ে তারা রাস্তায় নেমে অর্থ ও ত্রাণ সংগ্রহ করতে থাকেন, আর্থিক সাহায্যের আবেদন সম্বলিত স্টিকার লাগিয়ে দেন গাড়িতে গাড়িতে। বড় একটি উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০ মে টোকিওর ‘কান্দা বৌদ্ধ মন্দিরে’ একটি সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সহযোগী অধ্যাপক হেইজি নাকামুরা। ইঞ্জিনিয়ার ইউযো সুকুরাই ‘বর্তমান পূর্ব পাকিস্তানের বাস্তব পরিস্থিতি’ তুলে ধরেন। জনাকীর্ণ সভায় উপস্থিত ছিলেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী, ছাত্রনেতা এবং সাধারণ মানুষ— যারা প্রথমবারের মতো সরাসরি বাংলাদেশের দুর্দশার কথা শুনতে পান। ৮ জুন টোকিওর একটি জনসভায় সারগর্ভ বক্তব্য রাখেন ভারতের সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ। তিনি সেখানে বাংলাদেশের গণহত্যা, শরণার্থীদের ভারতে আশ্রয়গ্রহণ এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতার বিবরণ দিয়ে জাপানের জনগণের সহানুভূতি ও সহায়তা চান। তার বক্তৃতার পর জাপানের রাজনৈতিক ও মানবিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন নতুন গতি পায়। জুলাই মাসে তারা ‘রিসার্চ ডাটা অন ইস্ট পাকিস্তান প্রবলেম’ শিরোনামে ২০০০ কপি বুকলেট মুদ্রণ করেন। এগুলো ডায়েট সদস্য, রাজনৈতিক মহল ও আমজনতার মাঝে বিতরণ করা হয়।
এই বুকলেট পড়েই জাপানের সমাজতান্ত্রিক সাংসদ কেনিচি নিশিমুরা গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং তিনি নিজে কলকাতায় শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ নিয়ে যান। ত্রাণ সংগ্রহের আরেকটি বড় অধ্যায় ছিল ‘জাপান রেড ক্রসে’র মাধ্যমে ভারতে অর্থ ও খাদ্য সহায়তা পাঠানো। জাপান রেড ক্রস এক চালানে ১০ মিলিয়ন ইউনিট ভিটামিন ট্যাবলেট ও ৬০ টন গুঁড়া দুধ কলকাতায় পাঠায়— যা শরণার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। যে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সংগৃহীত হয় তা রাখার জায়গার সংকট দেখা দেয়। নারার বাসভবনই হয়ে ওঠে অস্থায়ী গুদাম, এত ত্রাণ জমা হয় যে তার পরিবারের ঘুমানোর পর্যন্ত জায়গা ছিল না। তখন এগিয়ে আসেন তাৎসুকো ইকেদা, ‘বুশু-গোনেনকাই বৌদ্ধ সংগঠনে’র শিষ্য, যিনি টোকিওর মেগুরোর একটি মন্দিরে ত্রাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এই ধর্মীয় সংগঠনটি ২৭,০০০ কম্বল সংগ্রহ করে এবং টোকিও ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির স্বেচ্ছাসেবক ছাত্ররা ট্রাকে করে সমস্ত ত্রাণ ইয়োকোহামা বন্দরে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে এক উদার জাহাজমালিক বিনা খরচে কলকাতায় ত্রাণ পরিবহন করেন। সবচেয়ে বড় চালানটি ছিল ১০ লক্ষাধিক শীতের পোশাক— যা কৃষ্ণ জয়ন্তী নামের একটি ভারতীয় জাহাজে করে বিনা ভাড়ায় কলকাতায় পাঠানো হয়। সুয়োশি নারা গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের ওয়ারলেস সেট সরবরাহ করেছিলেন। তিনি ১৮-২০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ‘গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। এ খবর আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সুয়োশি নারা ৭ এপ্রিল ১৯৭১ থেকে ১৭ জুন ১৯৭২ পর্যন্ত জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সংস্থার প্রায় প্রতিদিনের কার্যাবলি নিয়মিত ডায়রিতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তার নেতৃত্বে জাপানের মাটি থেকে যে সহানুভূতি, ত্রাণ ও রাজনৈতিক সমর্থন বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হয়েছিল—তা লাখো শরণার্থীর প্রাণ বাঁচিয়েছিল এবং বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ন্যায্য সংগ্রাম ও বিজয়কে দৃশ্যমান করেছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আবেগভরে স্মরণ করেন–জাপান যেদিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে সেই ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে পতাকা উত্তোলনের মুহূর্তে তিনি সশরীর উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে সুয়োশি নারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৪ সালে ৭৯ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

২. তাকায়োশি সুজুকি (Takayoshi Suzuki), পদার্থবিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও সমাজকর্মী
মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সংস্থার একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন তাকায়োশি সুজুকি। ভারতে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছিলেন। অজয় রায়কে সভাপতি ও আহমদ ছফাকে সম্পাদক করে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম শিবির’। তাছাড়া ‘বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টালিজেন্টশিয়া’র সভাপতি ছিলেন খান সারওয়ার মুর্শিদ, সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান ও বেলায়েত হোসেন। অন্যদিকে জাপানে গঠিত ‘বাংলাদেশ সলিডারিটি ফ্রন্ট’-এর সাধারণ সম্পাদক সেৎসুরে সুরুশিমা (Setsure Tsurushima), ‘জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন’-এর কার্যকরী সংসদের সদস্য তাকায়োশি সুজুকি এবং তেমিসুকা (Temisuka, টিভি ক্যামেরাম্যান) বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে চলমান ঘটনাবলি সম্পর্কে সরেজমিনে ধারণা অর্জনের জন্য ভারতে চলে আসেন এবং আগরতলায় তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সুজুকিকে জাপানের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে আসতে হয়েছিল। জাপানি প্রতিনিধি দল সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন এবং পরবর্তীতে জাপানে ফিরে গিয়ে একটি মাইক্রোবাস সংগ্রহ করে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহের অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাকায়োশি সুজুকি ছিলেন জাপানে বাংলাদেশপন্থী জনমত গঠন, ত্রাণ সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংগঠিতকরণ অভিযানের অন্যতম পথিকৃৎ। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘ভিজিটিং প্রফেসর’ হিসেবে কাজ করছেন।

৩. নাওয়াকি উসুই (Naoaki Usui), সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও সমাজসেবী (মরণোত্তর)
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফরাসি বুদ্ধিজীবী ও লেখক অঁদ্রে মালরোর একটি শক্তিশালী বিবৃতি ফরাসি সংবাদপত্র ল্য মোঁদে প্রকাশিত হয়। তিনি ঘোষণা করেন যে ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ট্যাংক বহর দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করতে শিগগিরই তিনি ভারত যাবেন। অঁদ্রে মালরোর এই ঘোষণার পর বেশ কজন জাপানি তরুণ ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক নাওয়াকি উসুইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। তারা জানতেন উসুই ফরাসী ভাষা জানেন; তারা চাচ্ছিলেন আর্দ্রে অঁদ্রে মালরোর অভিযানের সচিত্র সংবাদ যেন হাতছাড়া না হয়। উসুই সেপ্টেম্বরে কলকাতায় উপস্থিত হন। তিনি বাংলাদেশের অবস্থা সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বিশ্ববাসীকে বাংলাদেশের গণহত্যার তথ্য প্রদান করতে থাকেন। অঁদ্রে মালরোর অভিযানের আগেই রণাঙ্গন নাটকীয় মোড় নেয়। ভারতীয় বাহিনীর অংশগ্রহণে মিত্রবাহিনী সাঁড়াশি আক্রমণ করে। ৭ ডিসেম্বর নাওয়াকি উসুই ভারতীয় সামরিক যানে চেপে যশোরে ঢুকে পড়েন। ডিসেম্বরের দিনগুলোতে তিনি পশ্চিম সীমান্তে যশোর-খুলনা অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর অগ্রাভিযানের সাথী হয়ে চাক্ষুস দেখেছিলেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। তরুণ সাংবদিক হিসেবে ক্যামেরায় বন্দী করেছিলেন সেই অনিন্দ্যসুন্দর সময়ের স্থিরচিত্র।
২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজ হাতে তোলা আলোকচিত্রসমূহ নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে (সে সময় সেগুনবাগিচায়) তার আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ১৯৭১কে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। রণক্ষেত্রে অবস্থানকালে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধার সহযোগিতার কথা তিনি কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেন। প্রচণ্ড দুঃখ পেয়েছিলেন খুলনা-যশোর এলাকার রাস্তার দুপাশে মুণ্ডুহীন লাশ পড়ে থাকতে দেখে। তবে যুদ্ধের অন্তিমলগ্নে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে রাজাকারদের হাতে অগণিত মানুষ হত্যাকে তিনি সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল যখন দেখেছি বিজয়ের পতাকা হাতে প্রকৃতির উচ্ছলতায় বাঙালি হেসেছে নতুন প্রাণের জোয়ারে।’ মন্তব্যের খাতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘গতকাল বিকেলে যখন আমি গাড়ি দিয়ে ঢাকায় রাস্তায় আসছিলাম, তখন আমি আপনাদের শান্তি, উন্নতি এবং সুখ প্রত্যক্ষ করেছি, যা ১৯৭১ সালে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। আপানাদের তরুণসমাজ, বাবা-মা, ভাই-বোন ১৯৭১ সালে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।‘ ২০০৭ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধুর জীবনাবসান ঘটে।

৪. তাকাশি হায়াকাওয়া (Takashi Hayakawa), মন্ত্রিপরিষদ মন্ত্রী, আইন সভার সদস্য ও সমাজসেবী, (মরণোত্তর)
১৯৭০ সালে যখন দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তখন ত্রাণের তহবিল সংগ্রহের জন্য টোকিওর রাস্তায় প্রথম বেরিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে হায়াকাওয়া অন্যতম। ৭ ডিসেম্বর ১৯৮২ সালে আকস্মিক মৃত্যুর আগে তিনি জাপানি ভাষায় ‘জাতিগত ও আঞ্চলিক সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সাক্ষাৎ’ শিরোনামে একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলেন, যাতে তিনি এই তহবিল সংগ্রহ অভিযানের বৃত্তান্ত দিয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থাতেই রবিঠাকুরের পদাবলী পড়তেন এবং তখন থেকেই ‘সোনার বাংলা’র প্রতি তার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাকাশি হায়াকাওয়া নেতৃত্ব প্রদান করেন। জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সংস্থা এবং সলিডারিটি ফ্রন্টের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশের অগ্রগতিতে তার অবদান অনস্বীকার্য। জাপান-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। বাংলাদেশে তার সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি জাপানে ‘মি. বাংলাদেশ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন, যা দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ করেছিলেন। তারই আমন্ত্রণে তিনি ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় স্ত্রীকে তার অন্তিম ইচ্ছা জানিয়েছিলেন–দাহের পর তার মৃতদেহের ছাইয়ের একটি অংশ যেন বাংলাদেশে পাঠানো হয়। মিসেস মোতোয়ে হায়াকাওয়া নিজে সেই ছাই এনে ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধ মন্দিরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। হোটেল সোনারগাঁওয়ে স্থাপিত তার প্রতিকৃতি সম্বলিত ধাতব স্মৃতিফলকে বাংলা, জাপানি ও ইংরেজিতে লেখা আছে, ‘বর্তমান যুগে মানবতাকে বেঁচে থাকতে হলে একটি পরিবার হিসেবে একত্রিত থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি আমার ভালোবাসা এবং আবেগ এই আদর্শের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ এবং এটি একটি পরীক্ষাও।‘

৫. হেইজি নাকামুরা (Heiji Nakamura), সহযোগী অধ্যাপক, টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ ফরেন স্টাডিজ
৫০ থেকে ৭০-এর দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে গবেষণা করতেন। ২ বছর দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন Rise and growth of Indian nationalism। তখনই তার টেকিওর বন্ধুরা পরামর্শ দেন শুধু ভারত নয়, পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা সম্বন্ধেও তাকে জানতে হবে। তিনি সে জন্য সচেষ্ট হন। ১৯৭০ সালে পূর্ব পকিস্তানে আসেন, পুরনো বইয়ের দোকান থেকে ইতিহাসের অনেক বই কিনে নিয়ে যান এবং বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারেন শুধু আয়ুবের শাসন থেকে নয়, বস্তুত উপনিবেশবাদের শোষণ থেকে মুক্তিলাভের জন্য তারা কতটা উন্মুখ হয়ে আছে। দেশে ফিরে হেইজি নাকামুরা নিজের দেশের সংবাদপত্রে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে একজন পরষ্পরবিরোধী ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং ইন্দিরা গান্ধী সম্বন্ধে বলেন, তিনি যা করেছেন তা করা ছাড়া তার আর উপায় ছিল না। কারণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ উপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
২০ মে টোকিওর ‘কান্দা বৌদ্ধ মন্দিরে’ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে সেমিনারটি আয়োজন করা হয়, তাতে হেইজি নাকামুরা ‘পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার ঐতিহাসিক পটভূমি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তখন তিনি টোকিও ইউনিভার্সিটিতে এশিয়া-আফ্রিকা লিঙ্গুয়িস্টিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ছিলেন। প্রবন্ধে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা, উদ্বাস্তু স্রোত ও মানবিক বিপর্যয়ের তথ্য তুলে ধরেন। এই সভার পর বহু অধ্যাপক ও শিক্ষার্থী বাংলার সংকট সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে আগ্রহী হন। জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সংস্থার ব্যবস্থাপনা বোর্ডের একজন নির্বাহী সদস্য হিসেবে তিনি সুয়োশি নারা এবং অন্যান্য জাপানিদের সঙ্গে শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে তহবিল সংগ্রহ ও প্রেরণের কাজে সোৎসাহে অংশগ্রহণ করেন। শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের মাধ্যমে জাপান সরকারের আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল ৫০,০০,০০০ (পঞ্চাশ লক্ষ) ইউএস ডলার।

৬. ইওয়াইচি ফুজিওয়ারা (Iwaichi Fujiwara), লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.)
২য় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় নেতা সুভাস চন্দ্র বসুর সহযোগী ছিলেন। যুদ্ধের পর জাপান গ্রাউন্ড ‘সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সে’ স্থানান্তরিত হওয়া ‘ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনী’র কয়েকজন অফিসারের মধ্যে ফুজিওয়ারা ছিলেন একজন (গোয়েন্দা কর্মকর্তা)। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ফুজিওয়ারা জাপানে একটি দল গঠন করেছিলেন যারা ওয়্যারলেস সরঞ্জাম এবং ত্রাণ সামগ্রী কেনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে জাপানে পাকিস্তান দূতাবাস থেকে পালিয়ে আসা বাংলাদেশী কূটনীতিকদের সহায়তা প্রদান করেছিলেন। ‘পাবলিক ডিপ্লোমেসি অর্গানাইজেশন’ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের ব্যানারেও তিনি সেমিনার এবং সভা আয়োজন করেছিলেন যা বাংলাদেশের পক্ষে জনমত এবং নৈতিক সমর্থন তৈরিতে সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থনের জন্য জাপান সরকারের কাছে বারবার আবেদন করেছিলেন। তিনি আগেই ধারণা দিয়েছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি সমর্থনের অভাব এবং ভারত দ্বারা বেষ্টিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সরবরাহ সীমিত থাকার কারণে এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হবে না।
এক পর্যায়ে মুজিবনগর সরকার জাপানের বাঙালিদের কাছে টেলিগ্রাম পাঠায় যে সৈন্য পরিবহনের জন্য পাকিস্তান সরকার জাপান থেকে জাহাজ কিনতে যাচ্ছে। খবরটি ফুজিওয়ারাকে অবহিত করা হয়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট জাপানি মন্ত্রণালয় এবং জাহাজ নির্মাণ কোম্পানিগুলির সঙ্গে আলোচনা করে তা বন্ধ করেন; পাকিস্তান কোস্টার, ট্যাঙ্কার এবং স্পিডবোট কিনতে ব্যর্থ হয়। আরেকটি ঘটনা। মুজিবনগর সরকার চট্টগ্রাম এবং চালনা বন্দরের সামুদ্রিক মানচিত্র এবং বন্দরে নোঙর করার জন্য জাহাজের আগমন/প্রস্থানের সময়সূচি চেয়ে পাঠায়। ফুজিওয়ারা ‘জাপানি মেরিটাইম সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্স’ থেকে বন্দরদ্বয়ের বিস্তারিত বাথিস্কোপিক মানচিত্র সহ ৩-৪টি অ্যাডমিরালটি চার্ট জোগাড় করে দেন। জাহাজের আগমন/প্রস্থানের সময়সূচী সাপ্তাহিক জাপানি ভাষায় ‘শিপিং নিউজ’ থেকে সংগ্রহ করার বুদ্ধি বাৎলে দেন। ফলে ১৯৭১ সালে এই বন্দরগুলির অব্যাহত ব্যবহারকে নষ্ট করার জন্য নৌ কমান্ডো অভিযান পরিচালনা এবং অনেক শত্রু-জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। ফুজিওয়ারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নীরব সংগঠক, মানবিক কমান্ডার ও আন্তর্জাতিক বিবেকের একজন দীপশিখা। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাপানি শুভেচ্ছা মিশনের নেতা ছিলেন।

৭. কেন আরিমিৎসু (Ken Arimitsu), সমাজকর্মী
মুক্তিযুদ্ধের সময় কেন আরিমিৎসু জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। মুক্তিযুদ্ধের একটি আলোকচিত্র তার নজরে আসে। উহ্! মানুষের মৃতদেহ একটা কুকুর ভক্ষণ করছে। ভয়ানক ছিল ছবিটা, তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত সেই সময়ে বেশিরভাগ জাপানি মানুষ বাংলাদেশ বিষয়টি সম্পর্কে এতটা অবগত ছিল না’। তিনি বেশ কয়েকটি সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, অবশেষে ‘বাংলাদেশ সলিডারিটি ফ্রন্টে’র গঠন প্রক্রিয়া চলার সময়ই তিনি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং এর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি টোকিও গ্রুপে যোগ দিয়েছিলেন এবং আরো গ্রুপ ওসাকা এবং কিয়োটোতেও সংগঠিত হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। তিনি ও তার দল প্রায় প্রতি রবিবার গিনজা, সিনজুকু, ইকেবুকুরো এলাকায় মিলিত হতেন; সেখানে একদিন আসেন রিওইচি তোমিজুকা নামক একজন আলোকচিত্রী, যিনি বাংলাদেশ থেকে ছবি তুলে এনেছিলেন। তহবিল সংগ্রহের জন্য সচেতনতামূলক সেমিনার, সিম্পেজিয়াম আয়োজনে তারা সেইসব ছবি প্রদর্শন করতেন। তাদের দলের সদস্যরা পাকিস্তান দূতাবাসের বাঙালি কর্মীদের এবং টোকিওতে অবস্থিত বাঙালি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সমর্থন করেছিলেন যারা পাকিস্তানের জাতীয়তার নিন্দা করেছিলেন। তিনি 'Lets act as brothers and sisters of the People of East Bengal' নামে আরেকটি সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি জাপানের ছাত্র সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন করার আহ্বান জানান। পাকিস্তানের একটি জাহাজে কর্মরত ২০-৩০ জন বাঙালি কোবে সমুদ্রবন্দরে জাহাজ থেকে নামার চেষ্টা করেছিল, কোবের সলিডারিটি ফ্রন্টের সদস্যদের সহযোগিতায় তারা জাহাজ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং স্বাধীনতার পর তারা দেশেও ফিরে যেতে পেরেছিল।

৮. তোমিও মিজোকামি (Tomio Mizokami), অধ্যাপক, সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ, ওসাকা
তোমিও মিজোকামি তখন বয়সে তরুণ। বাংলাদেশ সলিডারিটি ফ্রন্ট (বিএসএফ)-এ তিনি দুর্দান্ত সক্রিয়। লেখালেখিতে সিদ্ধহস্ত। জাপানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ‘মাইনিচি শিম্বুন’ (জাপানি) পত্রিকার সম্পাদকের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়, যার প্রতিক্রিয়ায় তোমিও মিজোকামি উক্ত পত্রিকাতেই একটি প্রবন্ধ লেখেন। সাক্ষাৎকারে পূর্ববঙ্গে গণহত্যা সংঘটনের বিষয়টি পাকিস্তানি দূতাবাস অবহিত নয় বলার জন্য তিনি রাষ্ট্রদূতের কঠোর সমালোচনা করেন। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আরো বলেন যে পূর্ব বাংলায় যা ঘটছে তা একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় যা পাকিস্তানিরা নিজেরাই সর্বোত্তমভাবে নিষ্পত্তি করবে; তিনি ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগও করেন। জবাবে মিজোকামি লেখেন, ‘পূর্ববঙ্গে যে গণহত্যা চলছে তা অসংখ্য স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক দ্বারা সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনও ধারণা আমাদের নেই। কিন্তু যেহেতু বর্তমান বিষয়টি মানবতাবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই আমরা চুপ করে থাকতে পারি না। রাষ্ট্রদূত, আপনি আপনার সরকারের সেনাবাহিনী দ্বারা পূর্ববঙ্গে সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেননি। এটি নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। গত বছর যখন পূর্ব বাংলা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছিল, তখন আপনার সরকার বিদেশী সাহায্য চাইতে সময় নষ্ট করেনি। তখন কি আপনি বিদেশী হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই কারণে যে ঘূর্ণিঝড়টি একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল?’ একদিকে এরকম যুক্তিনির্ভর রচনা এবং বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিজ দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন, আবার তহবিল সংগ্রহেও তৎপরতা চালান।
বাংলা ভাষা রপ্ত করেছিলেন। ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পুরস্কার গ্রহণের পর অধ্যাপক তোমিও মিজোকামি সাবলীল বাংলায় বক্তব্য রাখেন। তিনি বাংলাদেশকে তার ‘শত্রুদের’ কবল থেকে মুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের দেশপ্রেম অনুসরণীয়। আপনারা যেভাবে দেশ এবং ভাষাকে ভালোবাসেন তার জন্য বিশ্ব আপনাদের অনুসরণ করে। আপনাদের আতিথেয়তায় আমি অভিভূত। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার যাত্রায় সর্বোচ্চ অবদান রেখেছেন’। বক্তৃতা শেষ করেন ‘জয়বাংলা’ দিয়ে। অডিটোরিয়াম করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
উপরোক্ত জাপানিদের ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে অংশীদারিত্বের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে জাপানে এক সরকারি সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০২৩ সালের ২৭শে এপ্রিল আরো ৪ জন জাপানিকে টোকিওর আকাসাকা প্যালেসে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করেন:

৯. তাদাতেরু কোনোয়ে (Tadateru Konoe), রেড ক্রস কর্মকর্তা, সমাজসেবী
জন্মের সময় নাম ছিল মোরিতেরু হোসোকাওয়া, পিতৃপুরুষরা জাপানি সম্রাট পরিবারের সদস্য ছিলেন। নিঃসন্তান মামার মৃত্যুর পর নানার উত্তরাধিকারী হিসেবে তাদাতেরু কোনোয়ে নাম গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে রেড ক্রসের পক্ষ থেকে তার ভূমিকার জন্য এ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। বর্তমানে তিনি জাপান রেড ক্রস সোসাইটির প্রেসিডেন্ট এমিরেটাস। পূর্বে তিনি ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (২০০৯-২০১৩)।

১০. পেমা গ্যালপো (Pema Gyalpo), তিব্বতী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অধ্যাপক, ইনন্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল জাপানজি স্টাপিজ, তাকুশোকু বিশ্ববিদ্যালয়, টোকিও
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনমত গঠন এবং শরণার্থী ও দুঃস্থদের সহায়তার জন্য তহবিল সংগ্রহে তার গৌরবময় অবদান ছিল। ১৯৬৫ সাল থেকে জাপানি নাগরিক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল মহান একজন কর্মী ছিলেন। পেমা গ্যালপো ১৯৫৩ সালে তিব্বতের খামে জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমানে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের একটি অংশ। তিনি ১৯৫৯ সালে ভারতে নির্বাসিত হন এবং ১৯৬৫ সালে জাপানে আসেন। এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর, তিনি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য পরম পবিত্র দালাই লামার প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জাপানের এই সম্মানিত নাগরিক অনেক প্রতিকূলতার মুখে অদম্য সাহস প্রদর্শন করেছিলেন এবং বাংলাদেশের মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।
১১. হিদেও তাকানো (Hideo Takano), রাজনীতিবিদ (মরণোত্তর)
হিদেও তাকানো জাপানের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিক এবং শান্তিকর্মী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সাহায্য করার কাজে নিবেদিত বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। জাপানি বামপন্থী ও প্রগতিশীল মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

১২. তাইজো ইচিনোসে (Taizo Ichinose) (মরণোত্তর), সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী
নিহন বিশ্ববিদ্যালয়, আর্ট কলেজ থেকে ফটোগ্রাফিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী তাইজো ইচিনোসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করেন, প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেন। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সময়ে আসতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আসেন যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে, ১৯৭২ সালের শুরু দিকে। বাংলাদেশে তিনি সদ্য জিম্মিদশা থেকে মুক্তিপাওয়া মানুষ এবং অনাহারের দ্বারপ্রান্তে থাকা অনেক শিশুর দুর্বিসহ জীবন প্রত্যক্ষ করেন। এই সময়েই তিনি একটি শান্তিপূর্ণ, দূরবর্তী বিদেশী দেশে যা দেখেছিলেন এবং বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান উপলব্ধি করেছিলেন এবং নিজের দুই পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার, নিজের চোখে দেখার এবং নিজের অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধ তাদেরও টেনে নিয়ে আসার ক্ষমতা নিয়ে আসে, যারা যুদ্ধ করছে না এবং তাদের দুর্দশার গভীরে ঠেলে দেয়।‘ পরবর্তী দুই বছর ধরে তিনি কাম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্রে তার জীবন-হুমকিপূর্ণ রিপোর্টিং মিশন শুরু করেছিলেন। কাম্বোডিয়ায় তখন মার্কিন-সমর্থিত সরকার এবং খেমার রুজের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। ক্যামেরাই হয় তার হাতিয়ার। ‘দ্য এন্ড অফ দ্য ভিয়েতনাম ওয়ার’ এবং ‘হোয়েন প্রিজনার্স অ্যাক্সচেঞ্জ পিস বিকমস আ রিয়েলিটি’ সহ তার ছবিগুলি একাধিক জাপানি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে কাম্বোডিয়ায় তিনি চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান, তখন মাত্র ২৬ বছরে পা দিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে তাইজোর বাবা-মা কম্বোডিয়ায় গিয়ে তার মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হন। ছেলের আলোকচিত্র এবং চিঠি সম্বলিত একটি আত্মজীবনী লেখেন মা। তাতে বাংলাদেশে তোলা বেশ কয়েকটি ছবিও আছে, যেগুলো ১৯৭২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তোলা। একটি ছবিতে দেখা যায়- রংপুরের বধ্যভূমি থেকে উদ্ধারকৃত মাথার খুলি ও অন্যান্য হাড়গোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিহ্বল মানুষের দল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছবিগুলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাছে সমর্পন করেন তার পরিবার। তাকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন জাপানি পরিচালক তাকাকো নাকাজিমা।
এই ১২জন জাপানির কাজ আলাদা হলেও তারা ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। সাংবাদিকরা সত্য প্রচার করতেন, মানবিক কর্মীরা ত্রাণ পাঠাতেন, রাজনীতিবিদরা সরকারে চাপ তৈরি করতেন, আর সংগঠকরা রাস্তায় জনশক্তিকে উদ্ধুদ্ধ করতেন। তাদের যূথবদ্ধ প্রচেষ্টা জাতীয় চেতনাকে এতটা নাড়িয়ে দিয়েছিল যে স্কুলের বাচ্চারা তাদের দুপুরের খাবারের টাকা জমিয়ে দান করেছিল। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জাপান সফরে এসে সেই শিশুদের সহ মুক্তিযুদ্ধের মৈত্রী কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
জাপানিদের এই নিঃস্বার্থ ত্যাগের পেছনে ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক ও মানবিক প্রেরণা। জাপান ২য় বিশ্বযুদ্ধে ভয়াবহ ধ্বংসের শিকার হয়েছিল। হিরোশিমা-নাগাসাকির দগ্ধ স্মৃতি জাপানি জাতিকে যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী করে তুলেছিল। তারা বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশায় নিজেদের যুদ্ধবিধ্বস্থ অতীত দেখতে পেয়েছিলেন। তাদের সমর্থন ছিল গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। তারা প্রমাণ করেছিলেন যে গণতন্ত্রের পক্ষে ও গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক দেশের নয়, সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাই শুধু আমাদের জাতীয় স্বাধিকার অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি একটি বিশ্বজনীন, মানবিক সংহতিরও মহাকাব্য। আর জাপানি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এই মহাকাব্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছেন এই ১২ বন্ধু এবং অনুল্লিখিত আরো কয়েকজন জাপানি। তাদেরকে দেওয়া মৈত্রী সম্মাননা তাই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননা নয়; এটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত কৃতজ্ঞতার আলোকমালা।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা এবং মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রাপ্তদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ সম্বলিত পুস্তিকা; প্রকাশনা: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; প্রকাশকাল: ২০১২-১৩।
২. Japan’s Contribution in the Independence of Bangladesh; লেখক: শেখ আহমেদ জালাল; প্রকাশনা: হাক্কানী পাবলিশার্স; প্রকাশকাল: ২০০২।
৩. Japan and the Emergence of Bangladesh; লেখক: সুকুমার বিশ্বাস; প্রকাশনা: আগামী প্রকাশনী; প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮।
৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র; সম্পাদনা: হাসান হাফিজুর রহমান; প্রকাশনা: তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার; ২য় পুনর্মুদ্রণ প্রকাশকাল: জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬/জুন ২০০৯; ১৫শ খণ্ড; ড. অজয় রায়ের সাক্ষাৎকার; পৃষ্ঠা ৩৩২)।
৫. যিনি বিজয় দেখেছেন (নাওয়াকি উসুইয়ের আলোকচিত্র প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত পুস্তিকা); প্রকাশনা: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর; প্রকাশকাল: আগস্ট ২০০৭
৬. জাপানি আলোকচিত্রী ইচিনোসে তাইজোর বাংলাদেশ; উসুই সানকে খুঁজে পাওয়া; লেখক: মনজুরুল হক; প্রকাশনা: দৈনিক প্রথম আলো; প্রকাশকাল: যথাক্রমে ১৬ই ডিসেম্বর ২০০৩ ও ২৬শে জুলাই ২০০৭।
৭. মুক্তিযুদ্ধ বার্তা; প্রকাশনা: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর