Published : 26 Feb 2026, 04:37 AM
‘অ্যাডভোকেসি’ এবং ‘উদ্যোক্তা’—শব্দ দুটি যেমন আলাদা, তাদের অর্থও ভিন্ন। কিন্তু এই দুই ধারণার মধ্যে সম্পর্ক কোথায়? কতটা গভীর? আদৌ কি এদের মধ্যে কার্যকর মেলবন্ধন সম্ভব? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই উঁকি দেয়। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজন থেকেই এই লেখার অবতারণা।
অ্যাডভোকেসি (পক্ষে কথা বলা) বলতে আমরা সাধারণত বুঝি—নীতি, সিদ্ধান্ত, কাঠামো বা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য প্রভাব সৃষ্টি করা। এর মূল লক্ষ্য হলো আইন ও নীতির সংস্কার, কাঠামোগত সমস্যার সমাধান এবং মানুষের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা। সংক্ষেপে, এটি মূলত জনস্বার্থ (পাবলিক গুড )ও কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কাজ করে।
অন্যদিকে উদ্যোক্তা বলতে তাদের বোঝায়, যারা বাস্তব সমস্যার সমাধানে টেকসই পণ্য বা সেবা তৈরি করেন। অ্যাডভোকেসি যদি পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করে, তবে উদ্যোক্তা সেখানে পৌঁছে দেন বাস্তব সমাধান। এদের যৌথ প্রচেষ্টা যেকোনো সংকট কাটাতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। উদ্যোক্তারা সৃজনশীলতা ও দক্ষতার মাধ্যমে শুধু সমাধানই তৈরি করেন না, বরং কর্মসংস্থান ও নতুন বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক স্থায়িত্বও নিশ্চিত করেন। মূলত সমাধান উদ্ভাবন এবং সেটিকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই উদ্যোক্তার প্রধান কাজ।
তবে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য কোথায়? এদের মিলনের কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? বাংলাদেশ বা এশিয়ার অধিকাংশ দেশের প্রেক্ষাপটে এটি বললে ভুল হবে না যে, অ্যাডভোকেসি এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রম বরাবরই ভিন্ন পথে পরিচালিত হয়ে আসছে। কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতাতেও এই বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট।
এর মূল কারণ নিহিত রয়েছে তাদের মৌলিক উদ্দেশ্যের পার্থক্যে। অ্যাডভোকেসি যেখানে কাঠামোগত পরিবর্তন বা নীতি নির্ধারণকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে একজন উদ্যোক্তার পূর্ণ মনোযোগ থাকে প্রায়োগিক সমাধান নিশ্চিত করার দিকে। লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতির এই ভিন্নতার কারণেই এই দুই ক্ষেত্রকে এক সুতোয় গাঁথা বেশ কঠিন।
অ্যাডভোকেসি ও উদ্যোক্তাকে একীভূত করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো স্বার্থসংঘাত। উদাহরণস্বরূপ, একজন কার্বন ক্রেডিট ব্যবসায়ী যদি মুনাফার স্বার্থে নীতি প্রভাবিত করেন, তবে তা জনস্বার্থ ও প্রকল্পের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এছাড়া এদের কাজের ধরনেও বিস্তর ফারাক রয়েছে; উদ্যোক্তা যেখানে দ্রুত সমাধান ও স্কেলিং চান, অ্যাডভোকেসি সেখানে দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী। বাস্তবিকভাবে, একইসঙ্গে নীতি নির্ধারণ এবং ব্যবসায়িক মডেলে সমান পারদর্শিতা অর্জন করা এক বিশাল সংকট।
আজ আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কেবল দেখছি না, বরং দৈনন্দিন জীবনে তা গভীরভাবে অনুভব করছি। এর ফলে জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। এই প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন নীতিগত পরিবর্তনের জন্য অ্যাডভোকেসি চলছে, অন্যদিকে সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোক্তা তৈরির প্রশ্নটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে প্রশ্ন হলো—পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় এই দুই ভিন্নধর্মী ক্ষেত্র কি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারবে? নাকি তাদের মৌলিক পার্থক্যই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জলবায়ুজনিত লোকসানের জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান অ্যাডভোকেসি ইস্যু। এর পাশাপাশি অনুদানভিত্তিক ও স্বচ্ছ জলবায়ু অর্থায়নের দাবি তোলা এবং উপকূলীয়, চর, পাহাড়ি ও নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর—বিশেষত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আমাদের প্রতিটি নীতি ও সমাধান হতে হবে এই প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও ঝুঁকির প্রতিফলন।
একইসঙ্গে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান—যেমন লবণসহিষ্ণু উপকূলীয় বন (ম্যানগ্রোভ) এবং অন্যান্য বনাঞ্চল সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর, জলবায়ু শিক্ষা ও তরুণদের সক্রিয় সম্পৃক্ততাও এই অ্যাডভোকেসির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মূলত, বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের ন্যায্য অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই এই কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় লোকজ জ্ঞান, স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রকৃতি-নির্ভর সমাধান এবং নীতিগত সমর্থনের সমন্বিত মডেলগুলোই সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এর বাস্তব উদাহরণ হলো কমিউনিটি-বেইজড অ্যাডাপ্টেশন (সিবিএ), ভাসমান কৃষি, লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল, জলবায়ু-সহনশীল আবাসন, সাইক্লোন শেল্টার, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং সোলার হোম সিস্টেমের মতো উদ্যোগগুলো।
ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয়, চর ও পাহাড়ি এলাকার নারী ও শিশুদের জন্য টেকসই সমাধান এখন সময়ের দাবি। ফিলিপাইনের বন্যা-সহনশীল কৃষির মতো সফল মডেলের আদলে বাংলাদেশেও ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে কিছু কাজ হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ মূলত এনজিও-নির্ভর ও অলাভজনক হওয়ায় আমাদের অ্যাডভোকেসি কেবল ক্ষতিপূরণের দাবির মধ্যেই আটকে আছে—যা দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য একটি বড় সংকট।
তবে অনুদান-নির্ভরতার বাইরে গিয়ে সমাধানকেন্দ্রিক ও আয়-উৎপাদনকারী উদ্যোক্তা মডেল নিয়ে আমাদের মনোযোগ এখনও সামান্য। অথচ ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স’ অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই ভয়াবহ বাস্তবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সৃজনশীল ও টেকসই ব্যবসায়িক সমাধানের বিশাল সুযোগ। আমাদের আদিবাসী জ্ঞান, সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে আমরা কেন নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে পারছি না? এর ফলে আমরা বড় বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলোও হারাচ্ছি।
বিনিয়োগ মানেই ঋণের বোঝা, এমন সেকেলে ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। বিনিয়োগ নেওয়া মানে নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা, যা বাংলাদেশের মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বারবার করে দেখিয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষার ক্ষেত্রেও আমাদের এই মানসিকতার পরিবর্তন আজ জরুরি। কেবল সাহায্যপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে সমাধানের মডেল নিয়ে দাঁড়ানোই এখন সময়ের দাবি।
জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য, পোশাক, যাতায়াত, ভোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান—সবকিছুতে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা জরুরি। এখানে ঐতিহ্য ধরে রেখে তরুণদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনার সমন্বয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তবে উদ্যোক্তা মডেল যখন কেবল মুনাফা বা প্রসারের দিকে ঝোঁকে, তখন কিছু গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো সামাজিক ও পরিবেশগত লক্ষ্যের চেয়ে আর্থিক লাভকে বড় করে দেখা। অনেক সময় উদ্যোক্তারা প্রকৃত সমাধানের বদলে নিজেদের উদ্যোগকে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যাভাবে পরিবেশবান্ধব হিসেবে প্রচার করেন, যা বিশ্বজুড়ে ‘গ্রিনওয়াশিং’ নামে পরিচিত। এছাড়া, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাব জনস্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই জলবায়ু উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
অ্যাডভোকেসি ও উদ্যোক্তা মূলত একে অপরের পরিপূরক; যেখানে একজন নীতিনির্ধারণ করে, অন্যজন দেয় বাস্তব সমাধান। যেমন প্রভা অরোরা ‘সবুজ সাথী’ উদ্যোগটি পাট ও কাগজের ব্যাগের মতো পরিবেশবান্ধব পণ্যের মাধ্যমে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের সার্থক বিকল্প তৈরি করছে। এটি সমাজে জিরো ওয়েস্ট ও সার্কুলার ইকোনমির চর্চাকে ত্বরান্বিত করছে। একইভাবে, প্রতিষ্ঠানটি ইউনেসকো-ইউএনইপি স্বীকৃত প্রোগ্রামের আওতায় ‘ইকো স্কুলস’ বা ‘ইয়াং রিপোর্টার্স ফর দ্য এনভায়রনমেন্ট’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু শিক্ষা ও যুব নেতৃত্ব তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তবে উদ্যোক্তার উদ্যোগে যদি প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করা না হয়, তবে ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর ঝুঁকি থেকেই যায়। এক্ষেত্রে ভারত ও থাইল্যান্ডের ‘সার্কুলার ইকোনমি’ভিত্তিক উদ্যোগগুলো এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; যা প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়ে স্থানীয়দের জন্য আয়ের উৎস তৈরি করেছে। এই ধরনের সফল মডেলেই অ্যাডভোকেসি ও উদ্যোক্তা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে।
অ্যাডভোকেসি ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমের পথ ভিন্ন হলেও এদের মূল শক্তি নিহিত রয়েছে সমন্বিত প্রচেষ্টায়। অ্যাডভোকেসি যেখানে উপাত্ত ও জনমত নির্ভর, উদ্যোক্তা সেখানে প্রভাব ও লক্ষ্য-তাড়িত। এদের সমন্বয়ে জন্ম নেবে টেকসই সমাধান। কিম্বারল্যান্ড বা ডেনমার্কের সফল উদাহরণগুলো আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সেই সক্ষমতা আছে এমন সব উদ্ভাবনী মডেল তৈরির, যা অভিযোজন ও প্রশমন—উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বকে চমকে দিতে পারে। এই পথেই উন্মোচিত হবে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার এবং বাংলাদেশ কেবল জলবায়ুর ভুক্তভোগী দেশ নয়, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সমাধানের এক অনুকরণীয় নেতৃত্বে পরিণত হবে।