৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

ঢাকার খালে গাড়ি চলে

Published : 02 Apr 2008, 02:14 AM

Updated : 13 Sep 2022, 08:22 PM

Image
ছবি. রাশেদুজ্জামান

খাল ও বিলঝিলের একটি চমৎকার নেটওয়ার্ক ছিল আজকের এই ঢাকা শহরে । ১৭৬২-র এপ্রিলের ভূমিকম্পে খাল বিলের পানি আন্দোলিত হয়ে ঢাকাকে প্লাবিত করে ফেলে। পানি সরে গেলে 'সেই সকল উচ্চভূমিতে অনেক মরা মাছ এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়' (জেমস টেলরের বিবরণী, মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অনূদিত)। ১৮৪০ সালে টেলরের 'টপোগ্রাফি অব ঢাকা' কোলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বেড়েছে। ঈদ-সপ্তাহেও ঢাকাবাসী ভূ-কম্পন অনুভব করেছেন পর পর দুবার। আগামি শতকের কোন এক জেমস টেলর যদি ভূ-কম্পন পরবর্তী ঢাকা শহরের বিবরণ লিখেন তাতে মাছের উল্লেখ থাকার সম্ভাবনা নেই। ঢাকা শহরে আর খাল-বিল নেই। সেই বিবরণীতে থাকবে মরা মানুষ ও বিধ্বস্ত গাড়ির উপাখ্যান।

বিংশ শতকের শুরুতেই ঢাকা কালেক্টরেট থেকে কালেক্টর সাহেব নির্বিবাদে সড়ক পথে তেজগাঁয়ে পৌঁছাতে পারতেন না। জলকাদা ভেঙ্গে পৌঁছা কষ্টকর ছিলো। সে জন্য আক্ষেপ ছিল কালেক্টরের।

কেবল সেদিনের নির্মিত রাস্তা–মিরপুর রোড এবং কাজী নজরুল ইসলাম সরণী–সংযোজক পান্থপথ, মাঝখানে উত্তর-দক্ষিণে টানা গ্রিন রোড। যানজট ঠেলে এই এক দেড় কিলোমিটার রাস্তা পান্থপথ পার হতে আধঘন্টা লেগেছে। এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়েছে, কারো কারো বরং বেশিই। এই পান্থপথ যে জায়গা জুড়ে, তা ছিল বিশাল খাল। বিশেষ করে পূর্ব পান্থপথ অংশটুকু। পশ্চিমেও বর্ষা মওসুমে দুকূলপ্লাবী জলধারা দক্ষিণ দিকে কলাবাগানের একাংশ এবং উত্তরে রাজাবাজারের একাংশ ডুবিয়ে অতিকায় জলাধার তৈরি করত। দুই নৌকার ঘের জালে বিস্তৃত এলাকা নিয়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখার স্মৃতি তখনও অনেকের মন থেকে মুছে যায়নি।

সেই খাল ও জলাধার কোথায় ? এখন তা পাকা রাস্তা, দোকানপাট, অফিস, হাসপাতাল কিংবা ঘর-বাড়ি। ভূমিকম্প কখনও যদি এই এলাকাটি স্পর্শ করে (প্রার্থনা এমনটি যেন কোথাও না হয়) তাহলে একটি মরা মাছকেও কি কোথাও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ধ্বংসযজ্ঞের সমাপনে পড়ে থাকতে দেখা যাবে ? যদি পাওয়া যায় তা নির্ঘাৎ কারো একোয়েরিয়ামের মাছ।

বুড়িগঙ্গার নৌকা বাইচের কথা বাদ থাক- ঢাকার মানুষের অন্যতম একটি বিনোদন ছিল ধোলাই খালের নৌকা বাইচ। ধোলাই খালের দুপাড়ে সমৃদ্ধ লোকালয়। নাজির হোসেনের কিংবদন্তির ঢাকা-য় নৌকা বাইচের সামাজিক ও সংস্কৃতিক চিত্র উঠে এসেছে। একটি চিত্র এমন: বাড়িঘেঁষা ধোলাই খালে বাইচ শুরু হয়ে গেছে। নতুন বউ একদিকে ডাল পাক করছে আবার চোখ তুলে বাইচও দেখছে। চোখে পড়ল তার ভাসুরের নৌকাটিই এগিয়ে আছে। আনন্দে উল্লসিত বউ তখন ডাল ঘুটছে আর বলে যাচ্ছে 'ভাশুরের নাও, ভাশুরের নাও'। উত্তেজিত বউ ঘুটনিতে জোরে চাপ দিতেই মাটির হাঁড়ির তলা ভেঙ্গে সব ডাল চুলায় পড়ে যায়। ধোলাই খালে পাল তোলা নৌকা চলছে তা যারা দেখেছেন, তারা প্রয়াত। তবে সেই ফটোগ্রাফও অনেকেই দেখেছেন। ঢাকার অদূরে শুভাঢ্যা খাল ক'দিন আগেও বাণিজ্যিক নৌবহরের অন্যতম রুট ছিল। শুভাঢ্যা খালে নৌকা চলে না, ভরাট হয়ে গেছে, দখল হয়ে যাচ্ছে। সচিত্র বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে এই খালের দুরবস্থার (যুগান্তর ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১০)।

একটি ছোট খালের নাম পরিবাগ খাল। ঢাকা শহরের একেবারে হৃদপিন্ডের এই খালটি কোথায় ? খালের উপর পাকা রাস্তা। রাস্তার উপর গাড়ি চলে। রাস্তার নিচে সিমেন্ট বাঁধাই বৃত্তাকার পাইপ, খালের কাজ কি আর পাইপ করতে পারে ?

১.৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ধানমন্ডি খালের উপর পান্থপথ। আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেট থেকে ধানমন্ডি খাল পর্যন্ত ০.৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ পরিবাগ খাল ; ইন্দিরা রোড থেকে ধানমন্ডি খাল পর্যন্ত ০.৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাজাবাজার খাল। কিন্তু সেই খালে জলধারা নেই। কোথাও কোথাও ড্রেইনের চিহ্ন থাকতে পারে– এই যা। সে সব খালের উপর গাড়ি চলে।

সেগুন বাগিচা খালের কী হাল ? ঢাকা শহরের বড় খালগুলোর অন্যতম এই খালটির স্থান বিশেষে কোন অস্তিত্বই নেই। ষাট ফুট প্রশস্ত শ্যামপুর-কদমতলি খালের চিহ্ন কোথাও নেই। খালের জায়গায় এখন পাকা রাস্তা ও বানিজ্যিক স্থাপনা। গোপিবাগ খালটি এখন কোথায় ? ২৩০ ফুট প্রশস্ত এই খালের নাম পাওয়া যাবে গবেষকের খাতায়। গোপিবাগ থেকে বাংলাদেশে ব্যাঙ্ক হয়ে আরামবাগ খালে পড়া পৌনে এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি একটি রাস্তার নিচে চাপা পড়ে গেছে। আরামবাগ খাল তেমন প্রশস্ত ছিল না কিন্তু নিষ্কাশনের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাল ছিল। আরামবাগ খালের উপর পাকা রাস্তা। রায়ের বাজার খাল কোথাও কোথাও ৫০ ফুট প্রশস্ত, কাটাসুর খাল থেকে বেরিয়ে আসা ২.১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটিও এখন কেবলই স্মৃতি। খালের উপর রাস্তা। ঘোপদক্ষিণ খাল–শীতলক্ষ্যা থেকে উঠে আসা এই খালের কোন অস্তিত্ব নেই। মিরপুর মাজার সড়কের ঢাল থেকে শুরু করে ঢাকা-আরিচা সড়ক পর্যন্ত দীর্ঘ গাবতলি খালের একটি বড় অংশের উপর দিয়ে এখন ট্রাক, বাস চলাচল করে বাকী অংশ ভরাট হয়ে মিলিয়ে গেছে স্থলভাগের সাথে। তুরাগ নদী থেকে উঠে আসা রামচন্দ্রপুর খাল ১৫ থেকে ১৬০ ফুট প্রশস্ত এবং ২.৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ – এরও উল্লেখযোগ্য অংশ চলে গেছে রাস্তার দখলে। কালুনগর ও সুলতাননগর হয়ে কামরাঙ্গিরচর বেরিবাধ পর্যন্ত দীর্ঘ হাজারিবাগ খালের অর্ধেকটা এখন রাস্তা।

ধোলাই খালের দু'টি অংশ। একটি অংশ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে সূত্রাপুর গেন্ডারিয়া, ওয়ারি হয়ে দয়াগঞ্জ বাজার মোট ৫.১০ কিলোমিটার, দ্বিতীয় অংশ দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু থেকে ধোলাই খালের আগের অংশের সাথে মিশেছে–এই অংশ ১.৯৭ কিলোমিটার। নৌকা বাইচ আর খালের নৌকার এই খালও এখন স্মৃতি হয়ে টিকে আছে। উভয় দিকে বৃহদাংশ হচ্ছে বক্স কালভার্ট ও রাস্তা, দু'প্রান্তে পয়োঃনিষ্কাশনের জন্য খালের দুটো খোলা মুখ। এই খালকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার আর সুযোগ নেই।

ঢাকার আরও কয়েকটি খালের নাম উল্লেখ করছিঃ কল্যাণপুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, বাউনিয়া খাল, আবদুল্লাপুর খাল, দিগুন খাল, দিয়াবাড়ি খাল, বাইশটেকি খাল, হাউজিংয়ের খাল, গুলশান-বনানী খাল, মহাখালি খাল, বেগুনবাড়ি খাল, বেগুনবাড়ি-মেরাদিয়া-গজারিয়া খাল, শাহজাহানপুর খাল, খিলগাঁও-বাসাবো খাল, জিরানী খাল, মান্ডা খাল, দক্ষিণগাঁও-নন্দিপাড়া খাল, নন্দিপাড়া ত্রিমোহিনী খাল, নাসিরাবাদ-নন্দিপাড়া খাল, সুতিভোলা খাল, ডুমনি খাল ও বোয়ালিয়া খাল।

এটাও অনস্বীকার্য মানুষের প্রয়োজনেই রাস্তা করতে হয়েছে। রাস্তা তারপরও অপর্যাপ্ত। আধুনিক নগরীতে যেখানে শতকরা পঁচিশভাগ পরিসর রাস্তার জন্য থাকার কথা সেখানে আমরা ছেড়েছি কেবল ছয় থেকে সাত ভাগ। তার উপর অপরিকল্পিত সড়ক ও নগরায়নের কারণে আমরা যানজটের করুনার উপর নির্ভরশীল হয়ে আছি।
যে খালের পুরোটা কিংবা আংশিক ভরাট করে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, প্রকৃতি হিসেবে সেই খালও সময়মত মানুষের উপর প্রতিশোধ নিয়ে চলেছে।

সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এমনকি মতিঝিল এবং আবদুল গনি রোডের গাড়ির চাকা আর ঘোরে না। ঢাকার রাস্তায় নৌকা নামে। প্রকৃতির এই প্রতিশোধকেও খাট করে দেখার সুযোগ নেই। ঢাকার খাল নৌকা বাইচে ভাশুরের নৌকাকে এগিয়ে থাকতে দেখে আর কোন গৃহবধু কি চেঁচিয়ে উঠবে 'ভাশুরের নাও, ভাশুরের নাও! ? বরং অপরিকল্পিত নগরে গাড়ি চাপা পড়ে নিহত ব্যক্তিটিকে দেখে আর্তচিৎকার করে উঠতে পারে 'ভাশুরের লাশ, ভাশুরের লাশ !'